সবার জন্য নয়
(সম্পর্ক ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা |
২৫ অক্টোবর ২০২৬
একটা সময় আসে, যখন মানুষ আর কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে চায় না, নিজের কষ্টের ব্যাখ্যাও দিতে চায় না। যে কথাগুলো একসময় বোঝানোর জন্য বারবার বলত, সেগুলোও বলা বন্ধ করে দেয়। বাইরে থেকে মনে হয়, মানুষটা বদলে গেছে। আগের মতো মিশছে না, ফোন করছে না, বিপদে-আপদে ছুটে যাচ্ছে না। অথচ কেউ খেয়াল করে না, এই দূরত্ব তৈরি হওয়ার পেছনে কতবার তার নিজের মনকে বুঝিয়ে রাখতে হয়েছে।
সব দূরত্ব অভিমান থেকে তৈরি হয় না। কিছু দূরত্ব তৈরি হয় নিজের শান্তিটুকু বাঁচিয়ে রাখার জন্য।
আমাদের একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে। কাউকে ভালোবাসলে তার জন্য সময় দিতে হবে, বিপদে পাশে দাঁড়াতে হবে, তার কথা শুনতে হবে—এসব আমরা স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিই। কিন্তু সেই মানুষটির আচরণ আমাদের কতটা ক্লান্ত করছে, তার কাছে নিজের অনুভূতির কতটা মূল্য আছে, কিংবা সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখতে গিয়ে আমরা নিজের কতটা ক্ষতি করছি, সেসব প্রশ্ন তুলতে দ্বিধা করি।
মনে হয়, নিজের কষ্টের কথা বললে বুঝি স্বার্থপর হয়ে যাব। একটু দূরে সরে গেলে মানুষটা ভাববে, আমরা বদলে গেছি। নিজের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিলে হয়তো কেউ অভিযোগ করবে, আগের মতো আর আপন নেই।
এই ভয় থেকেই অনেকে এমন সব সম্পর্ক টেনে নিয়ে যায়, যেখানে ভালোবাসার চেয়ে দায়বদ্ধতার চাপ বেশি, আন্তরিকতার চেয়ে প্রত্যাশা বেশি, আর স্বস্তির চেয়ে অস্বস্তি বেশি।
অথচ সম্পর্কের অর্থ তো নিজের সবটুকু নিঃশেষ করে অন্যকে খুশি রাখা নয়।
ধরা যাক, একজন মানুষ পরিবারের সবার প্রয়োজনে ছুটে যায়। কারও অসুস্থতা, কারও আর্থিক সমস্যা, কারও বিপদের খবর—সবকিছুতেই তার উপস্থিতি নিশ্চিত। রাত হোক কিংবা ব্যস্ত দিন, সে চেষ্টা করে পাশে থাকতে। কিন্তু একদিন তার নিজের বিপদ আসে। তখন পরিচিত মানুষগুলোর ব্যস্ততা বেড়ে যায়, ফোন ধরার সময় কমে আসে, আর সাহায্যের কথা উঠলে নানা ব্যাখ্যা সামনে চলে আসে।
সে হয়তো কারও কাছে প্রতিদান চায়নি। শুধু ভেবেছিল, কোনো একদিন তারও যদি কাউকে দরকার হয়, অন্তত একজন মানুষ পাশে এসে দাঁড়াবে।
সেদিন হয়তো সে বড় কোনো অভিযোগ করবে না। কাউকে অপমানও করবে না। শুধু পরেরবার কারও ফোন এলে আগের মতো সব কাজ ফেলে ছুটে যাওয়ার আগে একটু থামবে। নিজের অবস্থাটাও ভাববে। এই থেমে যাওয়াটাই তার বদলে যাওয়ার শুরু হতে পারে।
মানুষ সব সময় অন্যের আচরণ দেখে সম্পর্কের মূল্য বুঝতে শেখে না। কখনো নিজের ক্লান্তি তাকে শেখায়, কোথায় থামতে হবে।
সবাইকে সময় দেওয়া যায়, কিন্তু সবার হাতে নিজের শান্তির দায় তুলে দেওয়া যায় না।
নিজের সীমারেখা তৈরি করা মানে কাউকে অবহেলা করা নয়। সব ফোনের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দিতে না পারা মানে কাউকে ভালো না বাসা নয়। মানুষের নিজেরও কাজ আছে, ক্লান্তি আছে, এমন কিছু কষ্ট আছে, যা সব সময় অন্যের সামনে প্রকাশ করা সম্ভব হয় না।
যে মানুষ সব সময় অন্যের জন্য সহজলভ্য থাকে, তারও একদিন বিশ্রাম দরকার হয়। সব সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে নিজের সমস্যাগুলো বছরের পর বছর পিছিয়ে দেওয়া কোনো মহৎ গুণ নয়। নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করাও একধরনের সততা।
তবে সম্পর্কের দূরত্ব তৈরির আগে একটা বিষয় বোঝা জরুরি। সবাই যে প্রতিকূল সময়ে পাশে থাকতে পারবে, এমন নয়। কেউ নিজের অসুস্থতা, আর্থিক সংকট কিংবা পারিবারিক দায়িত্বের কারণে সাহায্য করতে পারে না। একটি ব্যর্থতা কিংবা একটি অনুপস্থিতি দিয়ে মানুষের পুরো চরিত্র বিচার করা ঠিক নয়।
সমস্যা তখনই, যখন অনুপস্থিতি অভ্যাসে পরিণত হয়, যখন আপনার প্রয়োজনকে বারবার তুচ্ছ করা হয়, অথচ নিজের প্রয়োজনে আপনাকে সব সময় হাজির থাকতে বলা হয়। যখন আপনার ‘না’ বলার অধিকার নেই, কিন্তু অন্যের প্রতিটি অজুহাত মেনে নেওয়ার প্রত্যাশা আছে। যখন আপনার আন্তরিকতাকে ভালোবাসা হিসেবে নয়, ব্যবহার করার সুযোগ হিসেবে দেখা হয়।
এমন সম্পর্কের মধ্যে নিজের অবস্থান নিয়ে ভাবা দরকার।
কেউ আপনার ভালোবাসা গ্রহণ করলেই সে আপনার অনুভূতির মূল্য দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার কেউ আপনার কাছ থেকে দূরে থাকলেই সে আপনাকে অবহেলা করছে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। মানুষের সম্পর্ক বুঝতে হলে কথার পাশাপাশি আচরণ দেখতে হয়। বিশেষ করে সেই আচরণ, যা কোনো সুবিধা পাওয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয়।
আপনি অসুস্থ হলে কে খবর নেয়, আপনার সাফল্যে কে আন্তরিকভাবে খুশি হয়, আপনার ব্যর্থতার সময় কে আপনাকে ছোট না করে পাশে থাকে, আপনার মতের অমিল হলেও কে সম্মান বজায় রাখে—এসব ছোট ছোট ঘটনা সম্পর্কের প্রকৃত চেহারা অনেকটাই স্পষ্ট করে দেয়।
আরেকটি বিষয় প্রায়ই চোখ এড়িয়ে যায়। যারা সত্যিই আপনাকে মূল্য দেয়, তাদের জন্য এগিয়ে যাওয়ার অর্থ শুধু তাদের সঙ্গে ভালো সময় কাটানো নয়। তাদের সঙ্গে সম্পর্কের যত্ন নেওয়াও জরুরি। কারণ, নিজের শান্তি রক্ষা করতে গিয়ে যদি সবাইকে সন্দেহ করতে শুরু করি, তবে একসময় আন্তরিক মানুষগুলোকেও দূরে সরিয়ে দিতে পারি।
কেউ একদিন আপনার কথা শুনতে পারেনি বলে তাকে চিরদিনের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করার দরকার নেই। ভুল বোঝাবুঝি হলে কথা বলা যায়, কষ্ট পেলে নিজের অবস্থান জানানো যায়, সম্পর্কের মধ্যে সমস্যা তৈরি হলে তা মেরামতের চেষ্টাও করা যায়। কিন্তু এই চেষ্টা যদি একতরফা হয়ে যায়, যদি প্রতিবার আপনাকেই এগিয়ে যেতে হয়, নিজের কষ্ট গিলে ফেলতে হয়, তাহলে একসময় থামার অধিকারটুকুও নিজের জন্য রাখতে হবে।
সব সম্পর্ক ধরে রাখার দায় একা একজনের নয়।
জীবনের একটা পর্যায়ে এসে মানুষ বুঝতে পারে, তার চারপাশে কতজন আছে, সেটিই আসল কথা নয়। বরং কার সামনে সে নির্ভয়ে নিজের কথা বলতে পারে, কার কাছে দুর্বল হলে ছোট হতে হয় না, কার সঙ্গে নীরব থাকলেও অস্বস্তি তৈরি হয় না—এসবের মূল্য অনেক বেশি।
এমন মানুষের সংখ্যা কম হলেও ক্ষতি নেই। কারণ, দশজনের ভিড়ে থেকেও একা লাগতে পারে। আবার একজনের পাশে বসেও মনে হতে পারে, পৃথিবীতে অন্তত একজন আছে, যার কাছে নিজেকে প্রমাণ করতে হয় না।
নিজের শান্তি রক্ষা করা মানে পৃথিবী থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া নয়। বরং কার জন্য কতটা সময়, শ্রম ও আবেগ ব্যয় করবেন, সেই সিদ্ধান্ত সচেতনভাবে নেওয়া। নিজের ভালো মনটাকে আগলে রাখা মানে ভালোবাসা বন্ধ করে দেওয়া নয়; এমন জায়গায় ভালোবাসা ঢেলে না দেওয়া, যেখানে তার কোনো মর্যাদা নেই।
যারা সত্যিই আপনাকে মূল্য দেয়, তাদের পাশে থাকুন। তাদের জন্য সময় বের করুন, তাদের কথা শুনুন, প্রয়োজন হলে নিজের ভুল স্বীকার করুন। কিন্তু কারও স্বীকৃতি পাওয়ার আশায় নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দেবেন না। যে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে প্রতিদিন নিজেকেই অস্বীকার করতে হয়, সেখানে অন্তত একবার নিজের কাছে ফিরে আসা দরকার।
একদিন হয়তো আপনি আর আগের মতো সবার ডাকে ছুটে যাবেন না। সবাইকে নিজের সময়ের হিসাবও দেবেন না। কেউ আপনার এই পরিবর্তন বুঝবে, কেউ ভুল বুঝবে। তাদের প্রত্যেককে বোঝানোর দায় আপনার নয়।
কারণ, ভালো মানুষ হওয়ার অর্থ এই নয় যে আপনার জীবনে যে কেউ ইচ্ছেমতো প্রবেশ করবে, আপনার সময় ব্যবহার করবে, আপনার অনুভূতিকে আঘাত করবে, তারপরও আগের মতো সব সুবিধা পাবে।
নিজের মনটা ভালো রাখুন। সবাইকে আপন করে নেওয়ার চেয়ে, যারা আপনাকে সত্যিই আপন ভাবে, তাদের চিনতে শেখা বেশি জরুরি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।