কর্মসংস্কৃতি কি তরুণদের স্বাধীনতা খাচ্ছে?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ২২ নভেম্বর ২০২৫
আমার এক বন্ধু গত সপ্তাহে রাত দুটোয় হোয়াটসঅ্যাপে লিখল, “ভাই, আমি আর পারছি না।”
সে ঢাকার একটি নামকরা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করে। বেতন ভালো, পদোন্নতি হচ্ছে, কিন্তু তার চোখের নিচে কালি আর ঘুমের ওষুধের প্যাকেট বাড়ছে। তার কথাগুলো শুনে মনে হলো, আমরা যে ‘সাফল্যের’ সিঁড়ি বেয়ে উঠছি, সেটা আসলে একটা চলন্ত বালির গর্ত। যত উঠি, তত ডুবি।
আজকের তরুণ প্রজন্ম এক অদৃশ্য যুদ্ধে লড়ছে। এই যুদ্ধে গুলি নেই, বোমা নেই; আছে কেবল অফিসের নোটিফিকেশন, স্ল্যাকের লাল বৃত্ত আর “আর্জেন্ট” লেখা ইমেইল। আমরা ভাবি, আরেকটু কাজ করলে, আরেকটা প্রমোশন পেলে, আরেকটা ফ্ল্যাট কিনলে শান্তি আসবে। কিন্তু আসলে আমরা যা হারাচ্ছি তা হলো—নিজেকে।
১) সময়ের নতুন সংজ্ঞা: সবসময় ‘অন’
একসময় চাকরি মানে ছিল সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা। এখন চাকরি মানে ২৪/৭। মোবাইল বন্ধ করলেও মন বন্ধ হয় না। ২০২৪-এর একটি গ্লোবাল সার্ভে বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার ৬৮% তরুণ কর্মী কাজের বাইরেও নিয়মিত ইমেইল চেক করেন। ফলে গড় ঘুম নেমেছে ৬ ঘণ্টার নিচে। আমরা আর বেঁচে থাকি না, চালিয়ে যাই।
২) প্রোডাক্টিভিটির নামে শোষণ
কোম্পানি বলে, “আমরা ঘন্টা গুনি না, আউটপুট দেখি।” কথাটা সুন্দর। বাস্তবে তার মানে—যতক্ষণ না কাজ শেষ, তত Legendaryছুটি নেই। ঢাকার কর্পোরেট তরুণদের ৫৭% সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন। বিনিময়ে পান না বাড়তি বেতন, পান শুধু বার্নআউট।
৩) সামাজিক চাপের তিন মুখ
প্রথম মুখ: পরিবার—“বয়স হচ্ছে, বিয়ে কর, বাড়ি কর।”
দ্বিতীয় মুখ: সমাজ—ফেসবুকে বন্ধুর দুবাইয়ের ছবির সঙ্গে নিজেকে মেলাতে হবে।
তৃতীয় মুখ: নিজের মন—“এখন না ছুটলে কখনো পারব না।”
এই তিন চাপে তরুণরা নিজের ইচ্ছাকে চাপা দিয়ে শুধু ছোটে। ফলে বিয়ে হয় না, সন্তান নিতেও ভয়—কারণ সময় নেই।
৪) যে সৃজনশীলতা নীরবে মরে যাচ্ছে
যারা লেখে, আঁকে, গান করে, তারা বলে—“আগে রাতে দশ লাইন লিখতাম, এখন দশটা শব্দও আসে না।” মন এত ক্লান্ত যে সৃজনশীলতার জায়গা থাকে না। বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের ৪৩% বলেছেন, কর্পোরেট চাপের জন্য তারা নিজেদের স্টার্টআপ আইডিয়া বাস্তবায়ন করতে পারেননি। আমরা হারাচ্ছি একটা প্রজন্মের সম্ভাবনা।
৫) বাঁচার জন্য কিছু কঠিন কিন্তু জরুরি পদক্ষেপ
- কোম্পানিগুলোকে “রাইট টু ডিসকানেক্ট” আইন মানতে বাধ্য করতে হবে (ফ্রান্স-স্পেনে আছে, আমাদেরও দরকার)
- রাত ৯টার পর কোনো “আর্জেন্ট” মেসেজ নয়—এটা নিয়ম করতে হবে
- তরুণদের শেখাতে হবে “না” বলা গুণ
- পরিবারকে বোঝাতে হবে—সন্তানের ব্যাংক ব্যালেন্সের চেয়ে তার হাসিটা বড়
- আর নিজেকে মনে করিয়ে দিতে হবে—জীবন কোনো প্রজেক্ট ডেডলাইন নয়, এটা একবারই আসে।
আমরা যদি এখনো না জাগি, কয়েক বছর পর একটা প্রজন্ম পাব যারা অনেক কিছু অর্জন করেছে, কিন্তু বাঁচতে ভুলে গেছে। হাতে থাকবে বড় ফ্ল্যাটের চাবি, কিন্তু দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে কারো সঙ্গে কথা বলার মানুষ থাকবে না।
প্রশ্নটা তাই আজ এখানে রেখে যাই—
আমরা কি এমন সাফল্য চাই, যার বিনিময়ে আমাদের তরুণরা নিজেদের হারিয়ে ফেলবে?
তোমারও কি একই অবস্থা? কমেন্টে লিখে জানাও।
#তরুণদেরচাপ #কর্মসংস্কৃতি #বার্নআউটবাংলাদেশ #জীবননাকিচাকরি #মানসিকস্বাস্থ্য #ওয়ার্কলাইফব্যালেন্স #বাঁচতেচাই #রাইটটুডিসকানেক্ট
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।