কৃতজ্ঞতার শিকল
(পারিবারিক নৈতিকতা)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
২২ অক্টোবর ২০২৬
খাওয়ার টেবিলে ছোট ভাই নিজের বিয়ের কথা তুলেছিল। বড় ভাই ভাতের প্লেট থেকে মুখ না তুলেই বললেন, “তুই আজ যেখানে দাঁড়িয়ে আছিস, সেটা কার জন্য ভুলে গেছিস?”
ছোট ভাই চুপ করে গেল। মা তরকারির বাটি এগিয়ে দিলেন। বাবা পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলেন। কয়েক মিনিট পর সবাই আবার স্বাভাবিক গলায় কথা বলল। শুধু বিয়ের প্রসঙ্গটা আর উঠল না।
এমন দৃশ্য অনেক পরিবারেই দেখা যায়। পুরোনো কোনো উপকারের কথা তুলে বর্তমানের একটা সিদ্ধান্ত থামিয়ে দেওয়া হয়। যিনি সাহায্য করেছেন, তাঁর অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সেই অবদানের কারণে অন্যের জীবনের সিদ্ধান্তও কি তাঁর হাতে চলে যাবে?
পরিবারে কেউ বিপদে টাকা দিয়েছেন, পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন, অসুস্থতায় পাশে দাঁড়িয়েছেন। এসব মানুষ সহজে ভুলে যায় না। কিন্তু সমস্যা হয় যখন প্রতিটি মতবিরোধে সেই পুরোনো হিসাব খুলে বসা হয়।
“তোর জন্য আমি কত কিছু করেছি!”
কথাটা কখনো অভিমানের প্রকাশ। আবার কখনো অন্যের মুখ বন্ধ করার উপায়। পার্থক্যটা বোঝা যায় কথাটি কখন বলা হচ্ছে, তা দেখলে।
কেউ নিজের কষ্টের কথা জানাতেই পারেন। কিন্তু যখনই পরিবারের কেউ নিজের পছন্দমতো সিদ্ধান্ত নিতে যান, তখনই অতীতের সাহায্য সামনে আনা হলে প্রশ্ন জাগে—সাহায্যটা কি নিঃস্বার্থ ছিল, নাকি তার সঙ্গে কিছু না-বলা শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছিল?
হয়তো কোনো চুক্তি ছিল না। তবু সাহায্য পাওয়া মানুষটি বুঝে যান, নিজের ইচ্ছায় চলতে গেলেই একদিন তাঁকে অকৃতজ্ঞ বলা হবে।
যে ঋণ কখনো শোধ হয় না
ধরা যাক, বড় বোন নিজের সঞ্চয় ভেঙে ছোট ভাইকে পড়িয়েছেন। ভাই চাকরি পেয়েছে, সংসার করছে। বোনের ত্যাগ ভুলে যাওয়া তার উচিত নয়। কিন্তু তাই বলে ভাইয়ের সংসারের প্রতিটি সিদ্ধান্তে বোনের অনুমতি লাগবে কেন?
বোনের বিপদে ভাইয়ের পাশে দাঁড়ানো উচিত। সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করাও উচিত। কিন্তু সেই সাহায্যের কথা তুলে ভাইয়ের ব্যক্তিগত জীবনে বারবার হস্তক্ষেপ করলে সম্পর্কটা আর আগের জায়গায় থাকে না।
কিছু পরিবারে উপকারের হিসাব এমনভাবে রাখা হয়, যেন টাকা ফেরত দিলেও দেনা শেষ হয় না। আজ বিয়ের সিদ্ধান্তে আপত্তি, কাল সন্তানের পড়াশোনা নিয়ে নির্দেশ, পরশু নিজের উপার্জন কোথায় খরচ হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন।
প্রতিবার একই কথা—কে কাকে একদিন সাহায্য করেছিলেন।
যে মানুষটি একদিন পরিবারের ভরসা ছিলেন, তিনিই ধীরে ধীরে সবার সিদ্ধান্তের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন। তাঁর সামনে কেউ আর সহজে নিজের মত বলতে পারেন না। কারণ মতের অমিল হলেই পুরোনো ত্যাগের কথা উঠবে।
প্রতিবাদ করলেই অকৃতজ্ঞ?
বড় ভাইয়ের সিদ্ধান্তের সঙ্গে ছোট ভাইয়ের মতের মিল না-ও হতে পারে। বাবার পরামর্শ সন্তানের পছন্দ না-ও হতে পারে। এতে সম্পর্কের অবমাননা হয় না।
কিন্তু কিছু পরিবারে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই পুরোনো ত্যাগের কথা সামনে আসে। আত্মীয়দের কাছে অভিযোগ করা হয়, বিয়ের পর মানুষটা বদলে গেছে, এখন আর কাউকে মানে না।
তখন নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দেওয়ার বদলে মানুষটিকে প্রমাণ করতে হয় যে সে অকৃতজ্ঞ নয়।
এখানেই অন্যায়টা ঘটে।
যিনি সাহায্য করেছেন, তাঁর প্রতি সম্মান থাকা দরকার। কিন্তু তাঁর কোনো সিদ্ধান্ত ভুল হলে সেটি বলার অধিকারও পরিবারের অন্য সদস্যদের থাকতে হবে। বড় ভাই, বাবা কিংবা পরিবারের উপার্জনক্ষম কেউই সব সময় সঠিক হতে পারেন না।
পরিবারের সবাই চুপ থাকলেই যে তাঁরা একমত, তা-ও নয়। কেউ সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়ে চুপ থাকেন, কেউ পুরোনো সাহায্যের কথা মনে করে প্রতিবাদ করতে পারেন না। বাইরে থেকে সংসার স্বাভাবিক দেখায়। ভেতরে একজন মানুষ নিজের ইচ্ছাগুলো একে একে সরিয়ে রাখেন।
ত্যাগের আড়ালে কর্তৃত্ব
সব উপকারের উদ্দেশ্য এক নয়। কেউ ভালোবেসে সাহায্য করেন, কেউ দায়িত্ববোধ থেকে। আবার কেউ সাহায্য করার মধ্য দিয়ে পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে থাকতে চান।
নিজের ত্যাগের স্বীকৃতি চাওয়া অন্যায় নয়। কিন্তু সেই স্বীকৃতির বিনিময়ে অন্যের স্বাধীনতা দাবি করা অন্যায়।
যে বাবা সন্তানের পড়াশোনার খরচ দিয়েছেন, তিনি সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরামর্শ দিতে পারেন। কিন্তু সন্তান কোথায় চাকরি করবে, কাকে বিয়ে করবে, কীভাবে সংসার চালাবে—সবকিছু তাঁর ইচ্ছামতো হতে হবে, এমন নয়।
একইভাবে, বড় ভাই পরিবারের জন্য বাড়ি করেছেন বলে সেই বাড়ির অন্য সদস্যদের মতামত মূল্যহীন হয়ে যায় না।
একটা প্রশ্ন থেকেই যায়—সাহায্য করার সময় কি মানুষটিকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করা হয়েছিল, নাকি ভবিষ্যতে তাঁর সিদ্ধান্তের ওপর অধিকার তৈরি করা হয়েছিল?
সব ক্ষেত্রে উত্তর এক হবে না। কিন্তু উপকারের কথা তুলে যখন কাউকে বারবার নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেতে বাধ্য করা হয়, তখন সেই সম্পর্কের হিসাবটা নতুন করে দেখা দরকার।
পরিবারের জন্য কেউ অনেক করেছেন—এই সত্য অস্বীকার করার দরকার নেই। তাঁর কষ্টকে ছোট করাও উচিত নয়। কিন্তু তাঁর অবদান স্বীকার করেও অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যায়। কৃতজ্ঞ থাকা যায়, তবু নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকা যায়।
সবচেয়ে দুঃখের বিষয়, পুরোনো উপকারের কথা মনে করিয়ে যিনি সবাইকে চুপ করিয়ে দেন, তিনি হয়তো একসময় খেয়ালই করেন না, তাঁর সামনে পরিবারের মানুষগুলো কেন আর মন খুলে কথা বলেন না।
তিনি ভাবেন, সবাই তাঁকে সম্মান করে। তাঁর কথা শোনে, খোঁজ নেয়, প্রয়োজন হলে পাশে দাঁড়ায়।
সবাই পাশে থাকে। শুধু কেউ আর নিজের মনের কথাটা বলে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।