লুপ্ত মানবতা, স্তব্ধ বিবেক
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । ২৪ মে, ২০২৬
রাস্তার পাশে একজন মানুষ পড়ে আছে।
চারপাশে মানুষ জড়ো হয়েছে। কেউ ভিডিও করছে। কেউ লাইভ দিচ্ছে। কেউ বলছে, “কি হইছে?”
কিন্তু খুব কম মানুষ সামনে এগিয়ে গিয়ে মানুষটাকে ধরছে।
এই সময়টাকে আমরা আধুনিক বলি।
প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাওয়া সময়।
কিন্তু একটা প্রশ্ন বারবার সামনে আসে।
আমরা কি সত্যিই মানুষ হিসেবে এগোচ্ছি?
আজকাল মানুষ কাঁদে কম, রেকর্ড করে বেশি।
সহানুভূতির চেয়ে কনটেন্টের মূল্য বেড়ে গেছে।
কারও বিপদ এখন অনেকের কাছে “ভাইরাল” হওয়ার সুযোগ।
একটা দুর্ঘটনা, একটা কান্না, একটা অসহায় মুখ।
সবকিছু যেন ধীরে ধীরে মানুষের অনুভূতি থেকে সরে গিয়ে স্ক্রিনের উপাদান হয়ে যাচ্ছে।
ভয়ংকর হলো, আমরা অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি।
একসময় অন্যায়ের খবর শুনলে মানুষ ভেতর থেকে কেঁপে উঠত।
এখন আমরা স্ক্রল করে চলে যাই।
কারণ প্রতিদিন এত ঘটনা দেখি যে অনুভূতিগুলো ক্লান্ত হয়ে গেছে।
খবর আসে। কিছুক্ষণ আলোচনা হয়। তারপর নতুন আরেকটা ঘটনা পুরোনোটাকে চাপা দেয়।
এভাবেই বিবেক ধীরে ধীরে শব্দ হারায়।
আজকাল মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আগে হিসাব করে।
“ঝামেলা হবে না তো?”
“আমার ক্ষতি হবে না তো?”
“আমি একা দাঁড়িয়ে কী করব?”
এই প্রশ্নগুলো অযৌক্তিক না।
বাস্তবতা কঠিন।
কিন্তু সমস্যা হলো, যখন সবাই একইভাবে চুপ থাকে, তখন অন্যায় আরও শক্তিশালী হয়ে যায়।
একটা সমাজ কখনো একদিনে নিষ্ঠুর হয় না।
ধীরে ধীরে হয়।
প্রথমে মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ কমায়।
তারপর সহানুভূতি কমে।
তারপর মানুষ কষ্ট দেখেও অভ্যস্ত হয়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত মানুষ মানুষকে আর মানুষ হিসেবে দেখে না।
দেখে একটা ঘটনা হিসেবে।
আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষ মৃত্যুর খবরেও ইমোজি খোঁজে।
কেউ কষ্টের কথা বললে অনেকেই সমাধান দেওয়ার আগে বিচার শুরু করে।
কারও ব্যর্থতা এখন সহানুভূতির না, ট্রলের বিষয়।
সবকিছু মিলিয়ে একটা অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হচ্ছে।
আমরা হয়তো আগের চেয়ে বেশি সংযুক্ত।
কিন্তু আগের চেয়ে বেশি একা।
আগের চেয়ে বেশি অনলাইনে।
কিন্তু আগের চেয়ে কম মানবিক।
সব দোষ প্রযুক্তির না।
সমস্যা মানুষের ব্যবহারেও।
কারণ প্রযুক্তি শুধু আমাদের ভেতরের দিকটাই বড় করে সামনে আনে।
কারও ভেতরে সহানুভূতি থাকলে সে সাহায্য করে।
কারও ভেতরে নিষ্ঠুরতা থাকলে সে সেটাকেই ছড়িয়ে দেয়।
সবচেয়ে বেশি চিন্তার জায়গা হলো নতুন প্রজন্ম কী দেখছে।
একটা শিশু যখন দেখে মানুষ বিপদে পড়লে সাহায্যের আগে ভিডিও করা হয়, তখন সে সেটাকেই স্বাভাবিক ভাবতে শেখে।
যখন দেখে অনলাইনে কাউকে অপমান করে মানুষ আনন্দ পায়, তখন তার ভেতরেও ধীরে ধীরে সংবেদনশীলতা কমতে থাকে।
সমাজ শুধু বই পড়ে শেখে না।
সমাজ শেখে মানুষ দেখে।
তবু সব শেষ হয়ে যায়নি।
এখনও পৃথিবীতে ভালো মানুষ আছে।
এখনও কেউ রক্ত দেয়।
কেউ অচেনা মানুষকে হাসপাতালে নেয়।
কেউ নিজের কষ্টের মাঝেও অন্যকে সাহায্য করে।
এই মানুষগুলোর কারণেই পৃথিবী পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যায় না।
মানবতা বড় কোনো বক্তৃতা না।
এটা ছোট ছোট কাজের ভেতরে থাকে।
কাউকে অপমান না করা।
অসহায় কাউকে সাহায্য করা।
কারও কষ্টকে উপহাস না করা।
অন্যায়ের সামনে অন্তত চুপ না থাকা।
বিবেক কখনো একদিনে মরে না।
প্রতিবার অন্যায় দেখে চুপ থাকলে একটু একটু করে স্তব্ধ হয়।
আবার প্রতিবার মানবিক কিছু করলে সেটাই একটু একটু করে জেগেও ওঠে।
সমস্যা হলো, আমরা এখন মানবিক হওয়াকে দুর্বলতা ভাবতে শুরু করেছি।
কঠিন হওয়াকে শক্তি মনে করছি।
কিন্তু বাস্তবে সবচেয়ে শক্ত মানুষ সেই, যে নিষ্ঠুর সময়েও মানবিক থাকতে পারে।
কারণ পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখে ক্ষমতা না।
টিকিয়ে রাখে মানুষের প্রতি মানুষের দায়বোধ।
একদিন হয়তো আমরা আরও উন্নত হব।
আরও আধুনিক হব।
আরও দ্রুত হব।
কিন্তু যদি মানবতা হারিয়ে ফেলি, তাহলে এত উন্নতির পরও ভেতরে ভেতরে আমরা শূন্যই থেকে যাব।
শেষ পর্যন্ত মানুষকে মানুষ বানায় তার বিবেক।
বিবেক স্তব্ধ হলে ক্ষতি প্রযুক্তির না।
সভ্যতার।
#লুপ্ত_মানবতা
#স্তব্ধ_বিবেক
#সমাজ
#মানবিকতা
#বাংলালেখা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।