মানুষ সবসময় ভালো কাজটা করে যখন কেউ দেখছে — কিন্তু সত্যিকারের মহত্ত্ব তখনই ঘটে যখন কেউ দেখে না।
গোপনে ভালো থাকার শক্তি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ২৮ নভেম্বর ২০২৫
আজ সকালে ফজর পড়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।
ঠান্ডা হাওয়া লাগছিল গায়ে।
কেউ দেখছে না, কেউ জানে না, কোনো ক্যামেরা নেই, কোনো স্টোরি দেওয়ার দরকার নেই।
তবু নামাজ পড়েছি।
মনে হচ্ছিল — এটাই হয়তো গোপন দানের সবচেয়ে ছোট্ট রূপ।
কেউ প্রশংসা করবে না, তবু করছি।
শুধু আল্লাহ দেখছেন — এটাই যথেষ্ট।
গতকাল রাতে এক বন্ধু ফোন করেছিল।
অনেক রাতে।
বলল — “ভাই, একটু টাকা লাগবে… খুব বিপদে।”
আমার নিজের অবস্থাও তখন সুবিধার ছিল না।
তবু বিকাশে যা ছিল পাঠিয়ে দিলাম।
তার নম্বরটা সেভ করা ছিল না — পাঠানোর পর ডিলিট করে দিলাম।
আজ সকালেই মনে হলো —
এই ছোট্ট কাজটাই বহুদিন পর আমাকে সত্যিকারের মানুষ মনে করিয়েছে।
কেউ জানে না।
শুধু আমি আর আল্লাহ। এটুকুই যথেষ্ট।
বাবা বলতেন —
“যেদিন তুমি কাউকে সাহায্য করবে আর মনে হবে সেটা পোস্ট করলে মানুষ প্রশংসা করবে — সেদিন বুঝে নিও তুমি সাহায্য করোনি… তুমি শুধু শো করেছ।”
সেই বাক্যটা এখনো মাথায় বাজে।
তাই যখনই কিছু দেই — চুপচাপ দেই।
কেউকে বলি না।
মাঝে মাঝে নিজের সাথেও লুকোচুরি করি —
যেন অহংকারটা মাথা তুলতে না পারে।
আজকের যুগে শক্তির সংজ্ঞা পাল্টে গেছে।
বড় গাড়ি।
ব্যাংক ব্যালেন্স।
ফলোয়ার সংখ্যা।
কিন্তু আমার কাছে শক্তি এখন অন্য কিছু।
রাত ৩টায় কেউ বিপদে ফোন দিলে —
বলতে পারা “বল, কী লাগবে?”
এবং
সকালে কেউ জিজ্ঞেস করলে — বলতে পারা “কিছুই হয়নি, ঘুমিয়ে ছিলাম।”
এই লুকিয়ে ভালো হওয়া…
এই লুকিয়ে ভালো থাকা…
এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় জিহাদ।
ছোটবেলায় দেখতাম — আম্মু রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে রান্নাঘরে যেতেন।
জানতাম — পাশের বাড়ির অসুস্থ বুড়ি খালাম্মার জন্য রান্না করছেন।
একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম,
“তুমি কাউকে বলো না কেন?”
আম্মু হেসে বলেছিলেন —
“যেটা শুধু আল্লাহ আর আমি জানি — সেটাই সবচেয়ে দামি।”
কলেজে পড়ার সময় ক্যান্টিনে এক ছেলেকে দেখতাম।
ছেঁড়া জামা পরে ক্লাসে আসতো।
একদিন খাবার কেনার মতো টাকা ছিল না তার।
আমার পকেটে তখন মাত্র পঞ্চাশ টাকা।
পুরোটা দিয়ে বলেছিলাম — “আজকে তুই খা।”
সে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল।
আমি চলে এসেছিলাম।
সে আমাকে মনে রাখুক বা না রাখুক —
আমি সেই অনুভূতিটা এখনো মনে রেখেছি।
সেই পঞ্চাশ টাকা —
আমার জীবনের সবচেয়ে মহান বিনিয়োগ।
মানুষ ভাবে — দান করতে হলে লাখ টাকা লাগে।
না।
দান করতে হলে সৎ নিয়ত লাগে।
আর সাহস লাগে — কাউকে না জানিয়ে ভালো করার সাহস।
রমজানে চাচা প্রতিদিন কোথাও না কোথাও ইফতার পাঠাতেন।
মারা যাওয়ার পর একজন এসে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন —
“আপনার চাচা আমাদের বাড়িতে দশ বছর ধরে ইফতার পাঠাতেন… আমরা কোনোদিন জানতেও পারিনি কে পাঠায়।”
সেদিন বুঝেছিলাম —
গোপন দান শুধু দানের কাজ না — এটা চরিত্রের আগুনে পুড়ে তৈরি শক্তি।
আজ একটি কাজ করো —
যেটা কেউ কোনোদিন জানবে না।
কাউকে দোয়া করো — নাম ছাড়াই।
কাউকে সাহায্য করো — পরিচয় ছাড়াই।
কাউকে ক্ষমা করো — ঘোষণা ছাড়াই।
কাউকে হাসাও — প্রতিদান ছাড়াই।
তারপর দেখো —
তোমার ভেতরে যে শান্তি নেমে আসবে,
তা কোনো স্টেজে দাঁড়িয়ে হাজার লোকের করতালির থেকেও বেশি মূল্যবান।
আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে সেই শক্তি দেন —
যে শক্তি কেউ দেখে না, কিন্তু আল্লাহ দেখেন।
আর সেটাই যথেষ্ট।
আমিন।
আজকের রাত — কাউকে না জানিয়ে কিছু ভালো কাজ করো।
আল্লাহ দেখুক, মানুষ নয় — এটুকুই যথেষ্ট।
#গোপনদান #মানবতা #ইলম #ইমান #ভালোবাসা #সদকা #ইসলামিকরিমাইন্ডার #রুহানিয়াত #হৃদয়েরশান্তি #আল্লাহরজন্য
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।