আমার কে আছে?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অবসর নেওয়ার পর প্রথম কয়েকদিন করিম সাহেবের বেশ ভালোই লেগেছিল।
সকালে ঘুম থেকে ওঠার তাড়া নেই। অফিসে দেরি হবে না। ইস্ত্রি করা শার্ট খুঁজতে হবে না। নাশতা শেষ করে ফাইল হাতে ছুটতে হবে না।
এত বছর ধরে যে জীবনটা ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে বাঁধা ছিল, এবার সেটাকে নিজের মতো করে কাটাবেন—এমনই ভেবেছিলেন তিনি।
কিন্তু এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই সকালগুলো অদ্ভুত লম্বা হয়ে গেল।
ঘড়িতে সাড়ে আটটা।
নাশতা শেষ।
চা শেষ।
পত্রিকার প্রথম পাতাটাও পড়া হয়ে গেছে।
তবু দিন শুরু হচ্ছে না।
আগে এই সময়টায় তিনি অফিসের পথে থাকতেন। রাস্তার মোড়ের চায়ের দোকানের লোকটা দূর থেকে বলত, “স্যার, আজও দেরি?”
অফিসে ঢুকলে পিয়ন সালাম দিত।
দুপুরে কেউ এসে বলত, “স্যার, ফাইলটা একবার দেখবেন?”
কেউ দরজায় দাঁড়িয়ে থাকত।
কেউ ফোন করত।
সন্ধ্যায় বের হওয়ার সময় সহকর্মীরা বলত, “কাল দেখা হবে।”
ছোট ছোট কথাগুলো তখন বিরক্তিকর লাগত।
এখন সেগুলোর কথাই মনে পড়ে।
অবসরের পর মানুষ যে শুধু কাজ হারায়, করিম সাহেব সেটা ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করলেন।
কাজের সঙ্গে সঙ্গে একটা পরিচয়ও চলে যায়।
আগে তিনি ছিলেন—করিম সাহেব, হিসাব বিভাগের ম্যানেজার।
এখন তিনি শুধু করিম সাহেব।
পেনশনের টাকা ঠিকমতো আসে। ব্যাংকে সঞ্চয় আছে। নিজের ফ্ল্যাট আছে। ছেলেমেয়েরা প্রতিষ্ঠিত।
অভাব নেই।
শুধু এমন একটা অভাব আছে, যার কোনো হিসাব ব্যাংকের খাতায় পাওয়া যায় না।
কথা বলার মানুষ কমে গেছে।
ছেলে সুমন বিদেশে থাকে। মেয়েটা নিজের সংসারে ব্যস্ত। স্ত্রী মারা গেছেন চার বছর আগে।
প্রথম প্রথম সুমন প্রায় প্রতিদিন ফোন করত।
“বাবা, খেয়েছ?”
“হ্যাঁ।”
“ওষুধ খেয়েছ?”
“হ্যাঁ।”
“কিছু লাগবে?”
“না, কিছু লাগবে না।”
তারপর ফোন কেটে যেত।
করিম সাহেব জানতেন, ছেলের সময় কম।
তিনি কখনো অভিযোগ করেননি।
বন্ধুদের বলতেন, “ছেলেটা অনেক ব্যস্ত। ভালোই করছে।”
একদিন দুপুরে পুরোনো আলমারি খুলতে গিয়ে তিনি অফিসের একটা পরিচয়পত্র পেলেন।
ছবিটা বহু বছরের পুরোনো।
চুল কালো।
চোখে একরকম তেজ।
কার্ডের নিচে লেখা—
করিম উদ্দিন
ব্যবস্থাপক
তিনি অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর নিজেই হেসে ফেললেন।
“এই লোকটা কোথায় গেল?”
ঘরে কেউ ছিল না।
তবু কথাটা বলে ফেললেন।
সন্ধ্যায় পাশের বাসার সাত বছরের ছেলে রাফি দরজায় এসে দাঁড়াল।
“চাচা, আপনার কাছে দাবার বোর্ড আছে?”
করিম সাহেব বললেন, “আছে তো।”
“খেলবেন?”
“আমি কিন্তু তোমাকে হারিয়ে দেব।”
রাফি হেসে বলল, “দেখা যাবে।”
সেদিন প্রায় দেড় ঘণ্টা তারা দাবা খেলল।
রাফি হেরে গিয়ে ঘুঁটিগুলো আবার সাজাতে সাজাতে বলল,
“কাল আবার আসব।”
করিম সাহেব বললেন,
“আয়।”
রাফি চলে যাওয়ার পর ঘরটা আবার চুপ হয়ে গেল।
তবে সেদিনের নীরবতাটা অন্যরকম ছিল।
পরদিন রাফি আবার এল।
তারপর প্রায় প্রতিদিন।
কখনো দাবা।
কখনো গল্প।
কখনো শুধু বসে থাকা।
একদিন রাফি হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
“চাচা, আপনি সারাদিন বাসায় একা থাকেন?”
করিম সাহেব একটু থেমে বললেন,
“হ্যাঁ।”
“আপনার ভয় লাগে না?”
করিম সাহেব হাসলেন।
“ভয় লাগে না।”
কথাটা পুরো সত্যি ছিল না।
একদিন সুমন ফোন করে বলল,
“বাবা, তোমার জন্য একটা নতুন ফোন পাঠাব। ভিডিও কলে কথা বলতে সুবিধা হবে।”
“পুরোনো ফোনটা তো চলছে।”
“ওটা অনেক পুরোনো।”
“আমার কাজ চলে যায়।”
ওপাশে একটু চুপ থেকে সুমন বলল,
“বাবা, তোমার কিছু লাগলে আমাকে বলবে।”
করিম সাহেব জানালার বাইরে তাকালেন।
“হ্যাঁ, বলব।”
তিনি বলতে চেয়েছিলেন—
“একদিন একটু সময় নিয়ে আমার সঙ্গে বসিস।”
কথাটা মুখে এল না।
বললেন,
“টাকা লাগবে না।”
ফোন রাখার পর তিনি অনেকক্ষণ মোবাইলটা হাতেই ধরে বসে রইলেন।
মানুষ বয়স হলে কী চায়?
করিম সাহেবের মনে হলো, তিনি নিজেও জানতেন না।
একসময় অনেক টাকা চেয়েছেন।
তারপর নিজের বাড়ি।
তারপর ছেলেমেয়ের ভালো ভবিষ্যৎ।
তারপর নিরাপদ জীবন।
সবই কমবেশি পেয়েছেন।
শুধু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাওয়ার ভাষাটা বদলে গেছে।
এখন আর বড় কিছু দরকার হয় না।
বাজার থেকে ফিরে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, “কী কিনলেন?”
খাওয়ার সময় কেউ যদি বলে, “আরেকটু নেবেন?”
বিকেলে কেউ যদি বলে, “চলুন, একটু হাঁটি।”
এই সামান্য কথাগুলোই কেমন বড় হয়ে যায়।
এক শুক্রবার বিকেলে সুমন ফোন করল।
“বাবা, আগামী মাসে দেশে আসছি।”
করিম সাহেবের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন করে উঠল।
“কত দিনের জন্য?”
“দশ দিনের মতো।”
“ভালো।”
দুজনেই চুপ করে রইল।
করিম সাহেব জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
“সুমন?”
“হ্যাঁ, বাবা?”
“দেশে এলে একদিন কোথাও যাবি আমার সঙ্গে?”
ওপাশে একটু নীরবতা।
তারপর সুমন বলল,
“অবশ্যই যাব।”
করিম সাহেব হেসে ফেললেন।
“দূরে যেতে হবে না। আমাদের পুরোনো চায়ের দোকানটায় যাবি। মনে আছে?”
সুমনও হেসে বলল,
“মনে আছে।”
“ওখানে এখনও সেই লোকটা আছে কি না কে জানে।”
“থাকলে ভালোই হবে।”
“হুম।”
আবার একটু নীরবতা।
তারপর সুমন বলল,
“বাবা?”
“হ্যাঁ?”
“তুমি ভালো আছ তো?”
করিম সাহেব জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
“হ্যাঁ রে। ভালো আছি।”
ফোনটা রাখার পর তিনি বুঝলেন, কথাটা পুরো সত্যি নয়।
কিন্তু মিথ্যাও নয়।
বাইরে তখন বিকেল নামছে।
রাস্তার ওপর কয়েকজন ছেলে খেলছে।
দূর থেকে রাফির গলা ভেসে এল—
“চাচা! দাবা খেলবেন?”
করিম সাহেব দরজা খুলে দিলেন।
“আয়।”
রাফি দৌড়ে ঢুকে পড়ল।
“আজ কিন্তু আমি জিতব।”
করিম সাহেব বললেন,
“দেখা যাবে।”
দাবার বোর্ডটা বিছিয়ে দুজন মুখোমুখি বসল।
রাফি ঘুঁটিগুলো সাজাতে সাজাতে বলল,
“চাচা, আপনার ছেলে দেশে এলে আমাকেও নিয়ে যাবেন?”
করিম সাহেব একটু থেমে বললেন,
“কোথায়?”
“ওই চায়ের দোকানে।”
করিম সাহেব হেসে বললেন,
“নিয়ে যাব।”
“কথা দিলেন?”
“কথা দিলাম।”
রাফি প্রথম চালটা দিল।
করিম সাহেব তার ঘুঁটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কেন জানি না, সেদিন অনেকদিন পর তাঁর মনে হলো—এই ঘরটা পুরো খালি নয়।
দরজার বাইরে কারও পায়ের শব্দ আছে।
ভেতরে একটা শিশুর গলা আছে।
আর বহু দূরের কোনো শহরে একজন মানুষ আছে, যে আগামী মাসে এই ঘরে ফিরে আসবে।
করিম সাহেব জানতেন না, ভবিষ্যৎ কী নিয়ে আসবে।
শুধু জানতেন, সন্ধ্যাটা আজ একা কাটবে না।
তিনি দাবার বোর্ডের দিকে ঝুঁকে বললেন,
“চাল দে।”
রাফি হেসে উঠল।
করিম সাহেবও হাসলেন।
ঘরের ভেতর সেই হাসিটা কিছুক্ষণ থেকে গেল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।