কণ্ঠ যখন অপরাধ
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষনধর্মী | ডিসেম্বর ২০, ২০২৫
একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন—একজন মানুষ মরলে কি তার কণ্ঠও মরে যায়, নাকি তখনই শুরু হয় তার সবচেয়ে উচ্চস্বরে কথা বলা?
ওসমান হাদী আর এই পৃথিবীতে নেই। এই বাক্যটা সহজ, কিন্তু এর ওজন ভয়ানক। কারণ তিনি শুধু একজন ব্যক্তি ছিলেন না—তিনি ছিলেন একটি অবস্থান।
তিনি ছিলেন এমন এক কণ্ঠ, যেটা চুপ করানো মানেই ছিল বাকস্বাধীনতাকে চোখে চোখ রেখে অস্বীকার করা। আজ একটি প্রাণ ঝরে গেছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি বুঝেছি, সেই ঝরে পড়া প্রাণের দায় আমাদের সবার?
ইতিহাসে শহীদের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু সবাই ইতিহাসে জায়গা পায় না। জায়গা পায় তারা, যারা মৃত্যুর আগে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়—নিরাপত্তা না সত্য। ওসমান হাদী সেই সিদ্ধান্তটাই নিয়েছিলেন।
তিনি জানতেন, কথা বলার মূল্য দিতে হয়। তবু তিনি চুপ করেননি। এখানেই তিনি আলাদা। এখানেই তিনি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিলেন ক্ষমতার জন্য।
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব আর বাকস্বাধীনতা—এই দুই শব্দ আমরা প্রায়ই একসাথে উচ্চারণ করি, কিন্তু তাদের মূল্য দিতে চাই না।
আমরা চাই স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু কেউ যেন তার জন্য মরতে না হয়। এটা শিশুতোষ কল্পনা। বাস্তবতা হলো—যে সমাজে কথা বলার অধিকার আছে, সেখানে কেউ না কেউ সেই অধিকারের মূল্য রক্তে দেয়। ওসমান হাদী সেই কঠিন সত্যের নাম।
আজ অনেকেই বলছে,
“আরেকটা কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেল।”
এই বাক্যে একটা ভয়ংকর স্বস্তি লুকানো আছে।
যেন কণ্ঠ স্তব্ধ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু স্বাভাবিক হওয়া উচিত ছিল উল্টোটা—একটি কণ্ঠ স্তব্ধ হওয়া মানে রাষ্ট্রের বিবেক কেঁপে ওঠা।
প্রশ্ন উঠা উচিত ছিল—কেন তাকে মরতে হলো?
তার আত্মত্যাগ আমাদের সামনে আয়না ধরে। সেই আয়নায় আমরা দেখি আমাদের নীরবতা। আমরা দেখি কীভাবে আমরা নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে সাহসীদের মৃত্যু দেখি, তারপর দুই মিনিট নীরবতা পালন করে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাই। কিন্তু ইতিহাস নীরবতা গুনে না। ইতিহাস গুনে কে কোথায় দাঁড়িয়েছিল।
একটা কণ্ঠ যখন থেমে যায়, তখন আসলে দুটি সম্ভাবনা তৈরি হয়।
এক—ভয় জিতে যায়।
দুই—সেই কণ্ঠ হাজার কণ্ঠে ভাগ হয়ে যায়।
কোনটা হবে, সেটা নির্ভর করে আমাদের ওপর। ওসমান হাদীর আত্মত্যাগ যদি আমাদের আরও চুপ করিয়ে দেয়, তাহলে তার মৃত্যু ব্যর্থ হবে। আর যদি তার মৃত্যু আমাদের কথা বলতে বাধ্য করে, তাহলে তিনি হারেননি।
এখানে একটা অস্বস্তিকর সত্য বলা দরকার—শহীদ বানানো সহজ, উত্তরাধিকার হওয়া কঠিন।
আমরা ফুল দেই, পোস্ট লিখি, শোক জানাই। কিন্তু তার মতো ঝুঁকি নিতে রাজি হই না। আমরা চাই তার সাহসের গল্প থাকবে, কিন্তু তার সাহসের দায়িত্ব নিতে চাই না। এটাই সমাজের সবচেয়ে বড় ভণ্ডামি।
ওসমান হাদী কোনো অতিমানব ছিলেন না। তিনি ভয় পেতেন, দ্বিধায় পড়তেন, পরিবারের কথা ভাবতেন—এই কারণেই তার ত্যাগ এত ভারী। কারণ তিনি জানতেন, হারানোর মতো তারও অনেক কিছু আছে। তবু তিনি বেছে নিয়েছিলেন কথা বলা। এই পছন্দটাই তাকে ইতিহাসে ঠাঁই দিয়েছে।
আজ রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বন্দুক নয়, স্লোগান নয়—একজন সচেতন নাগরিক। যে প্রশ্ন করে। যে মানতে অস্বীকার করে। যে বলে, “না, এটা ঠিক নয়।” ওসমান হাদী ঠিক এই জায়গাতেই দাঁড়িয়েছিলেন।
তাই তাকে থামানো জরুরি মনে হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের নিয়ম একটাই—মানুষকে থামানো যায়, সত্যকে নয়।
আজ যদি আমরা তার নাম উচ্চারণ করি, তাহলে শুধু আবেগে নয়, দায়িত্ব নিয়ে করতে হবে। তার নাম মানে একটি চুক্তি—যে চুক্তিতে লেখা আছে, অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা চলবে না। তার নাম মানে এই অঙ্গীকার—আর কোনো কণ্ঠ স্তব্ধ হলে আমরা শুধু শোক করব না, প্রশ্নও করব।
একটি প্রাণ ঝরে গেছে। কিন্তু যদি সেই ঝরে পড়া প্রাণ আমাদের ঘুম ভাঙাতে না পারে, তাহলে দোষ কার?
ওসমান হাদী আমাদের জন্য মরেননি, তিনি আমাদের জাগানোর চেষ্টা করেছেন। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের—আমরা জাগব, নাকি আবার ঘুমিয়ে পড়ব?
আপনি যদি মনে করেন, এই আত্মত্যাগ শুধু শোকের নয়, দায়িত্বের—তাহলে এখনই শেয়ার করুন, কথা বলুন, নীরবতা ভাঙুন।
#ওসমান_হাদী
#একটি_কণ্ঠ_একটি_রাষ্ট্র
#বাকস্বাধীনতা
#সার্বভৌমত্ব
#নীরবতা_অপরাধ
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।