বাল্যবিবাহ বন্ধ হবে কীভাবে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
নৌকাঘাটে ভিড়তেই কান্নার শব্দটা কানে এলো।
নৌকার পাটাতনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে তাকালাম। দুই বেণি করা চুল, লাল-সবুজ ফিতা দিয়ে বাঁধা। পিঠে স্কুলব্যাগ। দুই হাতে সেটাকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরে আছে, যেন ওটাই তার শেষ আশ্রয়।
হঠাৎ মেয়েটা চিৎকার করে উঠল, “আমি যাব না।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কোথায়?”
পাশ থেকে একজন খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “শ্বশুরবাড়িতে।”
এই একটি বাক্যের মধ্যেই বাল্যবিবাহের সবচেয়ে বড় সমস্যাটা আছে।
মেয়েটি যেতে চায় না। অথচ তাকে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। পরিবার জানে। আত্মীয়স্বজন জানে। পাত্রপক্ষ জানে। হয়তো কাজীও জানেন। যার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত হচ্ছে, তার কথাটাই সবচেয়ে কম শোনা হচ্ছে।
তাহলে প্রশ্ন হলো, বাল্যবিবাহ বন্ধ হবে কীভাবে?
শুধু আইন কঠোর করলেই?
আমার উত্তর, আইন অবশ্যই কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু শুধু আইন যথেষ্ট নয়। কারণ বাল্যবিবাহ কেবল আইনের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, দারিদ্র্য, সামাজিক চাপ এবং স্থানীয় পর্যায়ের একটি পুরো ব্যবস্থা।
আমার এক চাচাকে বহুবার জনসমক্ষে দাঁড়িয়ে ধূমপান করতে দেখেছি। কখনো কখনো পুলিশের কাছ থেকেও আগুন চেয়ে সিগারেট ধরিয়েছেন। কিন্তু নিজের সন্তানের পাশে বসে তাকে ধূমপান করতে কখনো দেখিনি।
কেন?
পুলিশ সেখানে ছিল না। জরিমানার ভয়ও ছিল না। কিন্তু সন্তানের ক্ষতি করার ভয় ছিল।
এই পার্থক্যটা গুরুত্বপূর্ণ।
আইন মানুষকে শাস্তির ভয় দেখায়। সচেতনতা তাকে ভুল কাজটি করার আগেই থামাতে পারে। কিন্তু সচেতনতা বলতে আমরা প্রায়ই পোস্টার, সভা, মাইকিং আর বক্তৃতাকে বুঝি। অথচ বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে দরকার এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে বিয়ে দেওয়ার আগেই কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়।
মেয়েটির বয়স কত?
তার জন্মনিবন্ধন আছে কি?
সে এখনো স্কুলে পড়ে কি না?
সে বিয়েতে রাজি কি না?
পরিবার ও পাত্রপক্ষ কি জানে, অপ্রাপ্তবয়স্কের বিয়ে আইনত অপরাধ?
এই প্রশ্নগুলো যদি শুধু কাগজে না থেকে বাস্তবে যাচাই করা যায়, তাহলে অনেক বিয়ে আয়োজনের আগেই থামানো সম্ভব।
বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ রয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে বাল্যবিবাহ নিরোধ বিধিমালা, ২০১৮। অর্থাৎ আইনি কাঠামোর অভাব নেই। সমস্যা হচ্ছে, আইন অনেক সময় বিয়ের খবর পাওয়ার পর সক্রিয় হয়। অথচ ব্যবস্থা এমন হওয়া দরকার, যাতে বিয়ের আয়োজনের আগেই ঝুঁকিটা ধরা পড়ে।
এখানে কাজীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বিয়ের নিবন্ধনের আগে বয়স যাচাইকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখলে চলবে না। জন্মনিবন্ধনসহ বয়সের প্রমাণ আরও কঠোরভাবে যাচাই করতে হবে। কেউ জেনে-শুনে আইন লঙ্ঘনের সহযোগী হলে তার জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ একটি বাল্যবিবাহে শুধু বাবা-মা জড়িত থাকেন না। আত্মীয়স্বজন, ঘটক, কাজী, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, কখনো জনপ্রতিনিধিও নানা পর্যায়ে যুক্ত থাকেন।
তাই দায়টাও শুধু পরিবারের ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো স্কুল।
একটি মেয়ে হঠাৎ স্কুলে আসা বন্ধ করলে শিক্ষক যদি শুধু ধরে নেন যে সে অসুস্থ, তাহলে একটি সুযোগ নষ্ট হয়ে যায়। স্কুলের শিক্ষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে ঝুঁকিতে থাকা মেয়েদের আগে শনাক্ত করা সম্ভব।
কারণ বাল্যবিবাহের খবর সাধারণত বিয়ের দিন তৈরি হয় না। তার অনেক আগে লক্ষণ দেখা যায়।
মেয়ে স্কুলে যাচ্ছে না। পরিবার হঠাৎ পাত্র খুঁজছে। জন্মনিবন্ধনের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আত্মীয়রা বলছে, “মেয়েকে আর কত পড়াবে?”
এই লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।
আর খবর পাওয়ার পর কী করতে হবে, সেটাও মানুষকে জানতে হবে।
জাতীয় হেল্পলাইন ৩৩৩-এ বাল্যবিবাহের অভিযোগ করা যায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই সেবার মাধ্যমে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের ঘটনাও ঘটেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯-এর মাধ্যমেও বাল্যবিবাহ বন্ধে সহায়তা নেওয়া যায়।
অর্থাৎ সমস্যা শুধু এই নয় যে মানুষ সচেতন নয়। অনেক সময় মানুষ জানেই না, বিপদের মুহূর্তে কোথায় ফোন করবে।
একটি গ্রামের মানুষ যদি জানেন, “আজ রাতে মেয়েটার বিয়ে। বয়স হয়নি। ৩৩৩ বা ১০৯-এ ফোন করা যায়”—তাহলে আইন কাগজের বাইরে এসে বাস্তব জীবনে পৌঁছায়।
তবে এখানেও কাজ শেষ নয়।
একটি পরিবারকে শুধু ভয় দেখিয়ে মেয়ের বিয়ে কয়েক বছর পিছিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু পরিবার যদি মনে করে মেয়ের জীবনের নিরাপদ ভবিষ্যতের একমাত্র পথ বিয়ে, তাহলে সমস্যাটা থেকেই যায়।
তাই মেয়েকে স্কুলে রাখার সঙ্গে পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, উপবৃত্তি, সামাজিক সহায়তা এবং মেয়েটির নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকেও যুক্ত করতে হবে।
দরিদ্র পরিবারের কাছে যদি মেয়ের পড়াশোনা মানে বাড়তি খরচ হয় আর বিয়ে মানে একটি দায়িত্ব কমে যাওয়া, তাহলে শুধু বক্তৃতা দিয়ে সেই হিসাব বদলানো কঠিন।
সুতরাং বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা দরকার।
আইন প্রয়োগ করতে হবে। বয়স যাচাই কার্যকর করতে হবে। কাজীদের জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। স্কুল থেকে ঝরে পড়া মেয়েদের বিষয়ে দ্রুত খোঁজ নিতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় করতে হবে। বিপদের মুহূর্তে ৩৩৩ ও ১০৯-এর মতো সেবা সম্পর্কে মানুষকে জানাতে হবে। একই সঙ্গে পরিবারকে এমন সহায়তা দিতে হবে, যাতে মেয়েকে স্কুলে রাখা বিয়ের চেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত না হয়ে দাঁড়ায়।
সবশেষে ফিরে আসি নৌকাঘাটের সেই মেয়েটার কাছে।
সে বলেছিল, “আমি যাব না।”
কিন্তু তার যাওয়ার সিদ্ধান্ত তখন প্রায় হয়েই গেছে।
বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে তাই শুধু মেয়েটিকে বোঝানো নয়, তার যাওয়ার আগেই তাকে থামানোর মতো ব্যবস্থা দরকার। স্কুলে তার অনুপস্থিতি নজরে আসবে, বয়স যাচাই হবে, পরিবার পাত্র ঠিক করলে কেউ খবর দেবে, প্রয়োজন হলে ৩৩৩ বা ১০৯-এ ফোন যাবে, স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত পৌঁছাবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু একটি বিয়ে হচ্ছে কি না, তা নয়।
প্রশ্ন হলো, একটি মেয়ের “আমি যাব না” কথাটা শোনার মতো ব্যবস্থা আমাদের আছে কি না।
নৌকাঘাটের সেই মেয়েটা আবার বলল, “আমি যাব না।”
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।