মধ্যবিত্তের নতুন হিসাব
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । এপ্রিল ৩০, ২০২৬
“চেষ্টা করেছিলাম ধরে রাখতে, পারলাম না।”
অফিসের এক সহকর্মী বলছিলেন। ছেলেকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। কথাটা বলার সময় তিনি হাসছিলেন, কিন্তু সেই হাসিতে স্বস্তি ছিল না—বরং একটা অস্বীকারের চেষ্টা ছিল।
এই একটি বাক্যই অনেক কিছু বলে দেয়। “মধ্যবিত্তরা আজ অস্তিত্ব সংকটে”—এই কথাটা তাই এখন স্লোগান নয়, প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা। কোনো নাটকীয় ভাঙন নেই; বরং ধীরে ধীরে ভেতরটা বদলে যায়। বাইরে সব ঠিক, ভেতরে হিসাব মেলে না।
বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত এক অদ্ভুত জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। তারা দরিদ্র নয়, তাই সহায়তার তালিকায় পড়ে না। আবার ধনীও নয়, তাই বাজারের ধাক্কা সামলানোর মতো শক্তি নেই। ফলে রাষ্ট্র ও বাজার—দুই দিকের চাপ একসঙ্গে এসে পড়ে। এই চাপ কেবল টাকার অঙ্কে ধরা যায় না; এটি সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব ফেলে—কী রাখা হবে, কী ছেড়ে দেওয়া হবে।
সবচেয়ে আগে ধরা পড়ে বাজারে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে নিত্যপণ্যের দাম বদলে যায়, এবং সেই বদলটা এখন প্রায় স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কিন্তু সংখ্যাগুলো দেখলে স্বাভাবিক বলা কঠিন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১১ শতাংশের আশেপাশে ঘুরছে, অথচ বেশিরভাগ চাকরিজীবীর বেতন বৃদ্ধির হার তার কাছাকাছি পৌঁছায় না।
সমস্যা শুধু দাম বাড়া না; সমস্যা হলো, এই বাড়ার পেছনে দায়টা কোথায়—সেটা স্পষ্ট নয়। বাজার যেন নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নেয়।
এই জায়গায় পুরো বাজারকে ছেড়ে দিলে ফল কী হয়, তা এখন বোঝা যাচ্ছে। দাম দ্রুত বাড়ে, কমতে সময় নেয়। তাই ন্যূনতম পর্যায়ে কার্যকর মূল্য-পর্যবেক্ষণ দরকার। সরবরাহ শৃঙ্খলের কোন স্তরে অতিরিক্ত মুনাফা যোগ হচ্ছে, সেটি চিহ্নিত করা গেলে অন্তত দায় নির্ধারণ সম্ভব।
তবে এর একটি সীমা আছে। ভর্তুকি দিলে তাৎক্ষণিক স্বস্তি আসে, কিন্তু সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়। বাজেটের ওপর চাপ বাড়লে অন্য খাতে তার প্রভাব পড়ে। ফলে সার্বিক ভর্তুকির বদলে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা—যেখানে সত্যিকারের চাপ আছে—সেটাই বেশি কার্যকর হতে পারে।
বাসস্থানের প্রসঙ্গে এলে সংকটটা আরও স্পষ্ট হয়। ঢাকার বেশিরভাগ এলাকায় ভাড়া এমন হারে বেড়েছে, যা আয়ের সঙ্গে তাল মেলায় না। বাড্ডা বা মিরপুরে দুই রুমের একটি ফ্ল্যাটের ভাড়া এখন ২৫–৩০ হাজার টাকার কাছাকাছি—যেখানে কয়েক বছর আগেও সেটি ছিল অনেক কম।
এই পরিস্থিতিতে সমাধান শুধু নতুন বাড়ি তৈরি নয়। ভাড়ার সঙ্গে আয়ের একটি যুক্তিসঙ্গত সম্পর্ক স্থাপন করা দরকার, যাতে হঠাৎ করে ভাড়া বৃদ্ধি একজন ভাড়াটিয়াকে বিপর্যস্ত না করে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি আবাসন ঋণের শর্ত সহজ হলে কিছু পরিবার ভাড়া নির্ভরতা থেকে বের হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। শহরের বাইরে বসতি গড়ার পরিকল্পনাও আছে, কিন্তু সেখানে কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ না থাকলে সেটি টেকসই হয় না।
শিক্ষা এখনো মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। কিন্তু এই বিনিয়োগের চাপও কম নয়। স্কুল ফি, কোচিং, অতিরিক্ত কার্যক্রম—সব মিলিয়ে একটি সন্তানের পেছনে যে ব্যয় দাঁড়ায়, তা অনেক পরিবারের জন্য ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। তবুও এই খরচ কমাতে তারা অনিচ্ছুক, কারণ এটাকেই তারা ভবিষ্যতের নিরাপত্তা হিসেবে দেখে।
এখানেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠে আসে—শিক্ষা কি আগের মতোই কাজ দিচ্ছে? ডিগ্রি বাড়ছে, কিন্তু সেই ডিগ্রির সরাসরি ব্যবহার সব সময় নিশ্চিত হচ্ছে না। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থায় দক্ষতা ও প্রয়োগযোগ্যতার দিকে জোর না দিলে এই বিনিয়োগের ফল অনিশ্চিত থেকে যাবে।
চাকরির বাজারেও একই ধরনের অমিল দেখা যায়। শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী কাজের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। সমস্যাটা সংখ্যার চেয়ে মিলের—যে দক্ষতা তৈরি হচ্ছে, বাজার কি সেটাই চায়?
ছোট ও মাঝারি উদ্যোগগুলো এই জায়গায় ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। কাগজে এসএমই ঋণের সুদের হার এক অঙ্কে থাকলেও, প্রসেসিং ফি, জামানত ও অঘোষিত খরচ মিলিয়ে তা অনেক সময়ই কার্যত দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। ফলে সুযোগ থাকলেও তা সবার জন্য ব্যবহারযোগ্য হয় না।
করব্যবস্থা নিয়ে মধ্যবিত্তের অস্বস্তিও ক্রমেই বাড়ছে। নিয়ম মেনে কর দেওয়ার পরও তারা মনে করে, চাপটা তাদের ওপরই বেশি পড়ে। আয়ের সীমা ও বাস্তব খরচের মধ্যে ফারাক থাকলে এই অনুভূতি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসাভাড়ার মতো মৌলিক খরচে কর-সুবিধা দিলে এই চাপ কিছুটা কমতে পারে।
সব মিলিয়ে একটি চক্র তৈরি হয়—আয়, ব্যয়, ঋণ একে অন্যকে টেনে ধরে। মাসের শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে অনেকেই আপস করেন। কিছু পরিকল্পনা পিছিয়ে যায়, কিছু ইচ্ছা চুপচাপ বাদ পড়ে। এই পরিবর্তনগুলো একদিনে চোখে পড়ে না, কিন্তু ধীরে ধীরে জীবনের গতি নির্ধারণ করে।
সবচেয়ে বড় কথা, এই সংকট খুব কমই প্রকাশ পায়। এটি রাস্তায় নামে না, শিরোনাম হয় না। বরং এটি ধরা পড়ে ছোট ছোট সিদ্ধান্তে—একটি কোচিং বন্ধ করে দেওয়া, কোথাও না ঘুরতে যাওয়া, কিংবা হঠাৎ করে খরচ কমিয়ে ফেলা।
মধ্যবিত্তরা টিকে থাকে। কিন্তু সেই টিকে থাকার ভেতরেই বদলে যায়। স্বপ্ন ছোট হয়, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস কমে যায়। তারা স্থিতিশীল থাকে, কিন্তু এগোয় কি না—সেই প্রশ্নটা থেকেই যায়।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টা একটাই: আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলছি, যেখানে একজন মানুষ শুধু টিকে থাকবে, নাকি কিছুটা স্বস্তি নিয়ে বাঁচতেও পারবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যদি আমরা দেরি করে ফেলি, তাহলে উত্তরটা হয়তো আর আমাদের হাতে থাকবে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।