চাপা পড়ে গেছে আত্মসম্মান
লেখকঃ মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
লেখার ধরণঃ বিশ্লেষণধর্মী
তারিখঃ ২১ অক্টোবর ২০২৫
অভাব—শব্দটা ছোট, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এমন এক নীরব অন্ধকার, এর ভেতরে কত অদৃশ্য কঙ্কাল লুকিয়ে আছে, তা কেবল সেই মানুষই জানে যে প্রতিদিন বাজারের দামে নিজেকে বিক্রি করে টিকে থাকতে চায়।
অভাব মানুষকে শুধু দরিদ্র করে না; তা ধীরে ধীরে ভেতরের মানুষটাকেই গিলে ফেলে। যখন ক্ষুধা এবং ওষুধের হিসাব একসাথে মেলে না, তখন আত্মসম্মান নামের সেই শেষ অবলম্বনও নীরবে মরে যেতে থাকে।
একসময় যে মানুষ আত্মমর্যাদা নিয়ে চলত, এখন সে মাথা নিচু করে সাহায্য চায়। কারণ অভাব আর অসুস্থতা তাকে এমন এক প্রাচীরে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে বাঁচার জন্য তাকে নিজের আত্মসম্মানকে প্রতিদিন একটু একটু করে মরতে দেখতে হয়।
মানুষ তখন বোঝে—ক্ষুধা শুধু পেটের নয়, ক্ষুধা একটা সামাজিক দারিদ্র্যের নামও।
অভাব কাউকে হত্যা করে না একদিনে; সে প্রতিদিন একটু একটু করে মানুষকে ভাঙে। আজ একবেলা না খেয়ে থাকা, কাল কাউকে ধার চাওয়া, পরশু নিজের চোখে নিজের লজ্জা ধরা—এইভাবেই ধীরে ধীরে মর্যাদা হারায়, আত্মসম্মান নিঃশেষ হয়।
যে মানুষ গতকাল নিজের ঘামের গন্ধে নিজের সম্মান চিনত, আজ সে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে বাঁচে, অন্যের অনুমতিতে শ্বাস নেয়।
কেউ সাহায্য করলে সে কৃতজ্ঞ হয়, কিন্তু ভেতরে এক ধরণের অজানা অপরাধবোধ কাজ করে। মনে হয়, আমি কি নিজেকে বিক্রি করে ফেললাম?
এই প্রশ্নটাই তাকে নিঃশেষ করে ফেলে। তার চোখে তখন এক ধরনের নিঃশব্দ লজ্জা, যা কোনো শব্দে প্রকাশ করা যায় না। আত্মসম্মান—যা একদিন তার অহংকার ছিল—আজ তা তার দুর্বলতা।
অভাবেই আত্মসম্মানের মৃত্যু ঘটে নীরবে—যেন কারও হৃদয়ে অচেনা এক কবর খুঁড়ে রাখা হয়, যার নাম ‘আমি’।
অসুস্থতা তখন আসে সেই কবরের পাশে দ্বিতীয় ফুল হয়ে—যেখানে শরীর দুর্বল হয়, মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, আর মানুষ হারিয়ে ফেলে নিজের নিয়ন্ত্রণ।
অসুস্থ মানুষ এক সময় বুঝে যায়—স্বাধীনতা কেবল সুস্থ শরীরের মানুষের অধিকার।
যে মানুষ একসময় নিজের হাতে অন্যকে সাহায্য করত, আজ সে নিজেই অন্যের অনুগ্রহের অপেক্ষায় বসে থাকে।
কেউ সাহায্য করে, কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয়।
কিন্তু প্রতিবার সাহায্য চাইবার ভেতরেই একটা ছোট্ট মৃত্যু ঘটে—নিজের ভেতরের সেই অহংকার, সেই আত্মবিশ্বাস, সেই “আমি পারব” বলার শক্তি।
অসুস্থতা—অভাবের থেকেও গভীর, আরও ব্যক্তিগত এক যন্ত্রণা। যে শরীর একসময় জীবনের প্রতিটি লড়াইয়ে ছিল সাহসের প্রতীক,
সেই শরীরই একদিন বিশ্বাসঘাতক হয়ে ওঠে।
মানুষ তখন অন্যের দিকে হাত বাড়ায়, সাহায্য চায়—অল্প ওষুধের জন্য, একটু যত্নের জন্য, কখনো শুধু একফোঁটা সহানুভূতির জন্য।
কিন্তু প্রতিটি সাহায্য প্রার্থনা, প্রতিটি “অনুগ্রহ করে” বলা বাক্যের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে একটুখানি মৃত্যু—নিজেকে ছোট মনে হওয়ার মৃত্যু, নিজের মর্যাদা হারানোর মৃত্যু।
সমাজের দৃষ্টিতেও অভাবগ্রস্ত মানুষদের মুখে একধরনের অদৃশ্য দাগ পড়ে যায়। আমরা তাদের দিকে তাকিয়ে বলি—“বেচারা”—কিন্তু আমরা ভুলে যাই, এই “বেচারা”র জায়গায় আমরাও একদিন থাকতে পারি।
কারণ অভাব কখনো দরজায় কড়া নাড়ে না, সে হঠাৎ ঢুকে পড়ে আমাদের জীবনের ভেতর, সম্মানকে ধুলায় মিশিয়ে দেয়।
তবু মানুষ লড়ে যায়। নিজের মর্যাদার ছাইয়ের ভেতর থেকে খুঁজে নেয় টিকে থাকার একটুকরো আগুন।
কেউ আবার ভেঙে পড়ে, নিজেকে ভুলে যায়, মেনে নেয় যে আত্মসম্মান শুধু ভাগ্যবানদের জন্য তৈরি এক বিলাসিতা। অথচ এটাই সত্য নয়।
যে মানুষ কখনো সম্পূর্ণভাবে মরে না, যতক্ষণ তার আত্মসম্মানের একটুকরো আলো টিকে থাকে।
তাই দরিদ্রতা বা অসুস্থতা যতই গভীর হোক, আমাদের উচিত নয় কাউকে “অসহায়” হিসেবে দেখা।
বরং তার সংগ্রামকে দেখা উচিত এক অনন্য সম্মানের দৃষ্টিতে। কারণ অভাব তার শরীর ভেঙেছে, কিন্তু আত্মসম্মানের সেই অদৃশ্য আগুন—যেটা মানুষকে মানুষ রাখে—তা এখনও নিভে যায়নি।
এই পৃথিবী যতদিন টাকার পরিমাণে মর্যাদা মাপবে, ততদিনই অসুস্থ আর অভাবগ্রস্ত মানুষদের মুখে লেগে থাকবে সেই নীরব লজ্জা।
কিন্তু সমাজের প্রকৃত উন্নতি তখনই হবে, যেদিন আমরা শিখব—মানুষের মূল্য তার আয় নয়, তার আত্মসম্মান।
#অভাব #আত্মসম্মান #মানবিকসংগ্রাম #সমাজ #জীবনবোধ #বাংলালেখা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।