অনুভূতিহীনতার যুগ
(সামাজিক ইমোশনাল ইন্ডিফারেন্সের নীরব মহামারী)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণেধর্মী ⋄ ১৮ নভেম্বর ২০২৫
আমার কখনো কখনো মনে হয় না—সবকিছু আগের মতো নেই?
মানুষের মুখগুলো একরকম জমাট।
কেউ কাঁদলেও কেউ থামে না,কেউ পড়ে গেলে চারপাশের মানুষগুলো কেবল হাঁটতে থাকে,
কেউ ভেঙে পড়লে পাশে দাঁড়ানো তো দূরের কথা,
একবার তাকিয়েও দেখে না।
মনে হয় সবার চোখে অদৃশ্য একটা পর্দা টানানো—
বাইরের পৃথিবীটা তারা ঠিকই দেখে,কিন্তু কারো ভেতরের যন্ত্রণার খবর রাখে না।
এইটাই এখনকার সবচেয়ে নীরব, অথচ গভীর সংকট—অন্যের কষ্টে আমরা আর সাড়া দিই না,
এটাই আসলে অনুভূতিহীনতার যুগ।
স্বাভাবিক থাকার মুখোশঃ
আগে কেউ অসহায় হলে লোকজন পাশে দাঁড়াত।
এখন সবাই শিখে গেছে, “না, হস্তক্ষেপ করব না।”
সেফ জোনে থাকাটাই যেন নতুন ভদ্রতা।
কিন্তু ব্যথা তো কখনোই একা আসে না।
আমরা যখন পাশ কাটিয়ে যাই,
সামাজিক বন্ধন একটু একটু করে ভেঙে পড়ে।
প্রতিক্রিয়া না দেওয়া—নিজেকে বাঁচানোর দেয়ালঃ
আজকের মানুষ এত চাপের মধ্যে—অর্থ, মানসিক টানাপোড়েন, সম্পর্কের জট—এত কিছু সামলে অন্যের কষ্ট নিয়ে ভাবার সময় নেই।
সবচেয়ে সহজ রাস্তা?
দূরে থাকা, এড়িয়ে যাওয়া। এই এড়িয়ে যাওয়ার মধ্যেই জন্ম নেয় ঠাণ্ডা এক নিষ্ঠুরতা।
স্ক্রল-প্রজন্মের অনুভূতি ক্ষয়ঃ
প্রতিদিন পর্দায় এত কষ্ট দেখি—বাস্তবের কষ্ট আর আলাদা লাগে না।
কেউ ভেঙে পড়লে মনে হয়,“এ তো রোজই দেখি।”
ডিজিটাল যুগ আমাদের সহানুভূতি খরচ করে শেষ করে দিচ্ছে।
বাস্তব জীবনে তাই আর কিছু বাকি থাকে না।
ছোট ব্যথার শ্রোতা না থাকলে বড় ব্যথা পচে যায়ঃ
বাবা অফিস শেষে চুপচাপ ভেঙে পড়েন—শুনার কেউ নেই। মা দুশ্চিন্তায় চোখ আড়াল করেন—কারও কাছে সময় নেই। কিশোর ভেতরে চিৎকার করে—কারও নজরে পড়ে না। যে সমাজ ছোট কষ্টকে পাত্তা দেয় না,বড় কষ্ট চিনতে শেখেই না।
ব্যস্ত সমাজে মানবিকতাই এখন বিলাসিতাঃ
মানুষ দৌড়াচ্ছে—সময় নেই, মন নেই, শক্তি নেই।
সবাই শুধু টিকে থাকার লড়াইয়ে,অন্যের পাশে দাঁড়ানোকে মনে করে ‘অতিরিক্ত ঝামেলা’।
মানবিকতা আসলে কোনোদিন বিলাসিতা ছিল না—
আমরাই সেটাকে বিলাসিতা বানিয়ে ফেলেছি।
সহানুভূতি কমলেই জন্ম নেয় নীরব হিংস্রতাঃ
অন্যের কান্নায় নড়ে না যে সমাজ,শেষে নিজের কান্নার জন্যও কাউকে পায় না। ইমোশনাল ইন্ডিফারেন্স শুরু হয় ক্লান্তি দিয়ে,শেষ হয় মানবিকতার শূন্যতায়।
অন্তরে জন্ম নেয় এক ধরনের নীরব হিংস্রতা— নিজেকেই ক্ষতবিক্ষত করে।
যার কষ্ট কেউ দেখে না, সে নিজেকেও গুরুত্ব দিতে শেখে নাঃ
ব্যথা তখনই সত্যি মনে হয়,যখন কেউ সেটা স্বীকার করে।
কেউ না করলে?
ব্যথা জমে যায়, চাপা পড়ে,এক সময় রূপ বদলে গভীর এক মানসিক অবসাদে রূপ নেয়—যার কোনও সঠিক নাম থাকে না।
আমরা কি সত্যিই অনুভূতিহীন?
মানুষ অনুভূতিহীন হয় না,মানুষ ভয় পায় অনুভূতি প্রকাশ করতে।
ভয়—বোঝাবে কে? সময় কার? ধৈর্য কার?
আমরা অনুভূতি হারাইনি,শুধু সাহসটা হারিয়েছি—
অন্যের দিকে হাত বাড়ানোর সাহস।
অন্যের কষ্ট দেখেও নির্লিপ্ত থাকা কোনো শক্তি নয়।
এটা আসলে ক্লান্তির এক ধরনের নিস্তব্ধতা।
যেখানে প্রতিক্রিয়া নেই,সেখানে মানবিকতাও থাকে না।
আমরা এমন এক সময়ে বন্দি,যেখানে মানুষ নিজের ভাঙন সামলাতে সামলাতে অন্যের ভাঙনের দিকে তাকানোর শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে।
এটাই—অনুভূতিহীনতার যুগ।
#ইমোশনাল_ইন্ডিফারেন্স #সমাজের_সংকট
#অনুভূতির_মহামারী #সামাজিক_অবসাদ
#মানবিকতার_ক্ষয় #সহানুভূতির_সংকট
#EmpathyCrisis #SocialBurnout
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।