শব্দের পেছনে নয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ১৭ অক্টোবর ২০২৬
জীবনটা তাদের উত্তর দিতে দিতে কাটিয়ে দেওয়ার মতো ছোট নয়।
একটা রিকশা বারবার ঘণ্টা দিচ্ছিল।
সামনে গাড়ির জট। রাস্তা খালি হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। তবু রিকশাওয়ালা ঘণ্টা দিয়েই যাচ্ছিল। পাশের গাড়ির চালক একবার আয়নায় তাকালেন। তারপর আর তাকালেন না। নিজের গতিতে গাড়ি চালিয়ে গেলেন।
ঘণ্টা বাজতেই থাকল।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর সেই শব্দ আর আলাদা করে কানে লাগছিল না।
মানুষের কথাও অনেকটা এমন।
কেউ একটা কথা বলল। প্রথমে খুব লাগল। মনে হলো, এর একটা জবাব দিতেই হবে। কীভাবে বলল, কেন বলল, আমাকে ছোট করতে চাইল কি না—সবকিছু মাথার মধ্যে ঘুরতে লাগল।
অথচ যে মানুষটা কথাটা বলেছিল, সে হয়তো পাঁচ মিনিট পরেই সেটা ভুলে গেছে।
ভুলিনি শুধু আমি।
আমি তার কথাটা নিজের সঙ্গে নিয়ে ঘুরেছি।
জীবনে একটা সময় এসে বুঝেছি, সব কথার উত্তর দিতে নেই। বরং কোন কথার উত্তর দেব না, সেটা বুঝতে পারাটাও এক ধরনের পরিণত হওয়া।
তবে তার মানে এই নয় যে সব সমালোচনা উপেক্ষা করতে হবে।
কেউ যদি আমার ভুল ধরিয়ে দেয়, সেটা শুনতে হবে। অস্বস্তি হলেও শুনতে হবে। নিজের ভুলের সামনে দাঁড়ানোর সাহস না থাকলে আত্মসম্মান আর অহংকারের মধ্যে পার্থক্য থাকে না।
কিন্তু কেউ যদি শুধু আমাকে অপমান করার জন্য কথা বলে, তার প্রতিটি শব্দের জবাব দেওয়া আমার দায়িত্ব নয়।
সমালোচনা আমাকে বদলাতে পারে।
অপমান শুধু আমাকে ব্যস্ত রাখতে পারে।
এই পার্থক্যটা বুঝতে শিখতে অনেক সময় লাগে।
ধরুন, একজন মানুষ অনেক বছর চাকরি করার পর নিজের ছোট একটা ব্যবসা শুরু করল। শুরুতে ভালো যাচ্ছে না। পরিচিত একজন হেসে বলল, “বলেছিলাম না, এসব তোমার জন্য নয়?”
এখন সে চাইলে সারাদিন সেই কথাটা নিয়ে ভাবতে পারে। তাকে বোঝাতে পারে কেন ব্যবসা শুরু করেছে। নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে দশটা যুক্তি দিতে পারে।
অথবা সন্ধ্যায় দোকানের শাটার নামিয়ে বাড়ি ফিরে মেয়ের পাশে বসতে পারে।
জীবন তাকে প্রতিদিন এমন দুটো পথের সামনে দাঁড় করায়।
একটা পথে আছে জবাব।
অন্য পথে আছে নিজের জীবন।
আমি ধীরে ধীরে দ্বিতীয় পথটা বেছে নিতে শিখেছি।
কারণ জীবনটা কাউকে বোঝানোর প্রকল্প নয়।
যে আমাকে ভুল বুঝেছে, তাকে সবসময় বুঝিয়ে তুলতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কেউ আমার নীরবতাকে অহংকার ভাবতে পারে। আমার দূরত্বকে অবহেলা বলতে পারে। আমার সিদ্ধান্তকে ভুল মনে করতে পারে।
সব ধারণা ঠিক করার দায়িত্ব আমার নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টা আরও স্পষ্ট।
একটা লেখা দিলাম। কেউ পছন্দ করল না। মন্তব্য করল। উত্তর দিলাম। সে আবার লিখল। আমিও লিখলাম। কিছুক্ষণ পর দেখি, যে বিষয় নিয়ে লেখা হয়েছিল, সেটাই হারিয়ে গেছে। পড়ে আছে শুধু কে কাকে কী বলল, সেই হিসাব।
শেষ পর্যন্ত দুজনেরই সময় গেল।
জিতলাম কে?
কেউ না।
জীবনে এমন অনেক তর্ক আছে, যেখানে শেষ কথাটা বলতে পারলেও আসলে কিছু পাওয়া যায় না।
কিছু কথাকে সেখানেই রেখে সামনে হাঁটতে হয়।
নীরবতা সবসময় দুর্বলতা নয়। অনেক সময় নীরবতা মানে, আমি ঠিক করে ফেলেছি কোথায় আমার সময় খরচ করব।
অপমানের একটা স্বভাব আছে। সেটা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর চায়। মনে হয়, কিছু একটা বলতেই হবে। তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে যে আমি দুর্বল নই।
কিন্তু যে মানুষ নিজের অবস্থান জানে, তাকে প্রত্যেকের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শক্তি প্রমাণ করতে হয় না।
আমার কাছে জীবনের সবচেয়ে দামি জিনিস হলো মনোযোগ।
আমি কোথায় সেটা দেব, আর কোথা থেকে সরিয়ে নেব, এই সিদ্ধান্তটাই অনেক সময় আমার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
কারণ আমি একই সময়ে সামনে তাকিয়ে পেছনের শব্দ শুনতে পারি, কিন্তু দুদিকে হাঁটতে পারি না।
তাই কেউ ডাকলে সবসময় ফিরতে নেই।
কেউ ভুল বুঝলে সবসময় বোঝাতে নেই।
কেউ ছোট করলে সবসময় নিজেকে বড় প্রমাণ করতে নেই।
কখনো চুপ করে নিজের কাজটা করে যাওয়াই যথেষ্ট।
রাস্তায় ঘণ্টা বাজবে। কেউ ডাকবে, কেউ হাসবে, কেউ বলবে, “এ পথে যেও না।”
শুনব। ভেবে দেখব। তারপর সিদ্ধান্তটা নিজের নেব।
কারণ শেষ পর্যন্ত আমার জীবনটা আমাকেই বাঁচতে হবে।
সব শব্দের দিকে ফিরে তাকানোর দরকার নেই।
কিছু শব্দ শুধু শব্দ।
জীবনটা তাদের উত্তর দিতে দিতে কাটিয়ে দেওয়ার মতো ছোট নয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।