ত্যাগের নামে হারিয়ে যাওয়া মানুষ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । ১৬ মে, ২০২৬
নাদিয়ার বয়স ত্রিশ।
ঢাকা মেডিকেলে পড়ার স্বপ্ন ছিল তার। কলেজে থাকাকালে শিক্ষকরা বলতেন, মেয়েটার হাত খুব ভালো, ডাক্তার হলে অনেক দূর যাবে। কিন্তু বাবার হঠাৎ স্ট্রোকের পর সবকিছু বদলে যায়। ছোট দুই ভাইয়ের পড়াশোনা, সংসারের বাজার, মায়ের ওষুধ—সব ধীরে ধীরে তার কাঁধে এসে পড়ে।
আজ নাদিয়া একটা কোচিং সেন্টারে পড়ায়।
মাঝে মাঝে পুরোনো মেডিকেল বইগুলো বের করে। পাতাগুলো উল্টায়। আবার আলমারিতে রেখে দেয়।
মানুষ তাকে খুব সম্মান করে।
বলে, “মেয়েটা অনেক সেক্রিফাইস করেছে।”
কিন্তু খুব কম মানুষ জিজ্ঞেস করে—
সে আসলে কী হারিয়েছে।
আমাদের সমাজে “ত্যাগ” শব্দটার একটা অদ্ভুত গৌরব আছে। এখানে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দেওয়াকে পরিণত মানসিকতা হিসেবে দেখা হয়। বিশেষ করে মেয়েদের শেখানো হয়—সহ্য করো, মানিয়ে নাও, সংসার বাঁচাও। ফলে ছোটবেলা থেকেই মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে, ভালো মানুষ হতে হলে নিজের চাওয়াগুলো মেরে ফেলতে হবে।
এই চাপটা কেউ সরাসরি দেয় না।
এটা বাতাসের মতো। জন্মের পর থেকেই গায়ে লেগে থাকে।
সমস্যা হলো, আমরা “সেক্রিফাইস” আর “কম্প্রোমাইজ” — এই দুইটাকে এক জিনিস মনে করি। অথচ বাস্তবে এরা সম্পূর্ণ আলাদা।
সেক্রিফাইস মানে অনেক সময় নিজের একটা অংশ কেটে অন্যকে দিয়ে দেওয়া।
আর কম্প্রোমাইজ মানে মাঝখানে একটা জায়গা বের করা, যেখানে দুই পক্ষই কিছুটা বাঁচে।
এই পার্থক্যটা না বুঝলে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের জীবন থেকেই উধাও হয়ে যায়।
একজন বাবা হয়তো ছেলের পড়াশোনার জন্য নিজের শখ বাদ দিলেন। এটা ত্যাগ।
কিন্তু একজন স্ত্রী যদি বছরের পর বছর নিজের মতামত চাপা দিয়ে শুধু সংসার টিকিয়ে রাখেন, সেটা সবসময় মহৎ সমঝোতা না। অনেক সময় সেটা নিঃশব্দ আত্মবিলোপ।
বাইরে থেকে তখন সম্পর্কটা শান্ত দেখায়।
ভেতরে ভেতরে মানুষটা ফাঁকা হয়ে যায়।
কারণ সুস্থ কম্প্রোমাইজে দুই পক্ষই কিছুটা ছাড় দেয়। কিন্তু বাস্তবে বেশিরভাগ পরিবারে একজন শুধু দিয়েই যায়, আরেকজন শুধু নিয়েই যায়। তখন সেটাকে আর সমঝোতা বলা যায় না। সেটা ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা।
যে শুধু দেয়, সে একসময় নিজের সত্তাটাই হারিয়ে ফেলে।
এই কারণেই “ত্যাগী মানুষ”দের কাছ থেকে অনেক সময় অদ্ভুত ক্লান্তি বের হয়। তাদের চোখে একধরনের নীরব অভিমান থাকে। কারণ তারা অন্যদের জন্য এত বেশি জায়গা ছেড়ে দিয়েছে যে নিজের জন্য আর কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই।
সমাজ অবশ্য এই ক্ষতগুলো দেখতে পছন্দ করে না।
সমাজ শুধু ত্যাগের গল্প শুনতে ভালোবাসে।
একজন ছেলে নিজের পড়াশোনা বাদ দিয়ে সংসার চালালে তাকে দায়িত্ববান বলা হয়।
একজন মেয়ে নিজের ক্যারিয়ার ছেড়ে দিলে তাকে আদর্শ মেয়ে বলা হয়।
কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করে না—
মানুষটা শেষ কবে নিজের জন্য কিছু করেছে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গাটা অন্যখানে।
সব ত্যাগ স্বেচ্ছায় হয় না।
অনেক ত্যাগ করানো হয় অপরাধবোধ দিয়ে।
“তুমি না করলে কে করবে?”
এই বাক্যটা শুনতে খুব সাধারণ। কিন্তু এই বাক্যই অসংখ্য মানুষকে ধীরে ধীরে ফাঁপা করে দেয়। কারণ যারা সবসময় ভাবে “আমাকে ছাড়া চলবে না”, তারাই পৃথিবীর সবচেয়ে ক্লান্ত মানুষ।
আমি ব্যক্তিগতভাবে একটা জিনিস খুব লক্ষ্য করেছি।
যারা সবসময় বলে, “আমি সবার জন্য এত কিছু করলাম,” তাদের ভেতরে প্রায়ই অদৃশ্য ক্ষোভ জমে থাকে। কারণ মানুষ ত্যাগ করতে পারে, কিন্তু চিরকাল অদৃশ্য থাকতে পারে না। একসময় তারও ইচ্ছে হয় কেউ তাকে বুঝুক, তার হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলোর কথাও মনে রাখুক।
সমস্যা আরও গভীর হয় যখন মানুষ সাহায্য চাইতে ভয় পায়।
বিশেষ করে পুরুষদের শেখানো হয়—চুপচাপ সহ্য করো। মেয়েদের শেখানো হয়—মানিয়ে নাও। ফলে মানুষ ভেতরে ভেঙে পড়লেও মুখে হাসি ধরে রাখে।
এই নীরব অভিনয় একসময় মানুষকে মানসিকভাবে অসাড় করে দেয়।
সে বেঁচে থাকে, কিন্তু অনুভব করা বন্ধ করে দেয়।
নাদিয়া এখন একটা অভ্যাস করেছে।
কেউ তার ওপর নতুন দায়িত্ব চাপাতে চাইলে সে আগে তিনটা প্রশ্ন করে।
প্রথম প্রশ্ন — এটা পালন করার বাস্তব সামর্থ্য কি আমার আছে?
দ্বিতীয় প্রশ্ন — আমি না বললে কি সত্যিই সবকিছু ভেঙে পড়বে?
তৃতীয় প্রশ্ন — এই বোঝাটা আমি একা টানছি, নাকি কেউ পাশে আছে?
আগে সে এসব ভাবত না।
যে যা বলত, চুপচাপ কাঁধে তুলে নিত। পরে বুঝেছে, সব দায়িত্ব নৈতিক দায়িত্ব না। কিছু দায়িত্ব শুধু মানুষের প্রত্যাশা। কিছু দায়িত্ব আবেগের ব্ল্যাকমেইল।
আর কিছু দায়িত্ব আসে এই কারণে যে তুমি “না” বলতে শেখোনি।
“না” বলা স্বার্থপরতা না।
“না” বলা মানে নিজের অস্তিত্বকে স্বীকার করা।
কারণ ত্যাগ তখনই সুন্দর, যখন সেটার ভেতরে স্বাধীনতা থাকে। যখন তুমি চাইলেই না করতে পারতে, তবু করেছ। কিন্তু যখন “না করার” কোনো সুযোগই নেই, তখন সেটা ত্যাগ না। সেটা বাধ্যতা।
বাধ্যতাকে মহৎ বলে চালিয়ে দেওয়া বিপজ্জনক।
নাদিয়া এখনো কোচিংয়ে পড়ায়।
মাঝে মাঝে ছাত্রীদের একটা কথা বলে—
“সংসার বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও, দায়িত্ব পালন করো। কিন্তু নিজের স্বপ্নটা পুরোপুরি মেরে ফেলো না।”
কথাটা বলার সময় তার মুখে হাসি থাকে।
কিন্তু চোখের ভেতরে অন্যরকম কিছু দেখা যায়।
হয়তো মানুষ ঠিক তখনই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায়, যখন সে অন্যদের জীবন বাঁচাতে বাঁচাতে নিজের জীবনটাই চুপচাপ হারিয়ে ফেলে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।