বিপদের দিনে কারা আপন
(আত্মীয়তা, সম্পর্ক ও মানবিকতা)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ২৩ অক্টোবর ২০২৬
বাবার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাড়িতে আত্মীয়দের ভিড় জমে গেল। কেউ এসে কাঁধে হাত রাখলেন, কেউ পুরোনো স্মৃতির কথা বলতে বলতে চোখ মুছলেন। রান্নাঘরে চায়ের কাপের পর কাপ তৈরি হচ্ছিল। উঠানে বসে অনেকে বাবার ভালো দিকগুলো মনে করছিলেন।
কিন্তু কয়েক মাস আগে যখন বাবাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য রাতের বেলা একটা গাড়ি জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়েছিল, তখন ফোন করেও দু-একজনের সাড়া পাওয়া যায়নি। একজন বলেছিলেন, তিনি বাড়ির বাইরে। আরেকজন ফোন ধরেননি। শেষ পর্যন্ত পাশের বাড়ির লোকটি নিজের গাড়ি নিয়ে এসেছিলেন।
সেদিনের কথা ছেলেটার মনে ছিল। তবু বাবার মৃত্যুর দিন কাউকে কিছু বলেনি। শুধু লক্ষ করেছিল, যারা সেদিন পাশে ছিলেন না, তাঁদের কয়েকজন আজ শোকের সময় সবচেয়ে বেশি কথা বলছেন।
এমন দৃশ্য অনেক পরিবারেই দেখা যায়। বিয়ে হলে আত্মীয়দের আনাগোনা বাড়ে, বাড়িতে কোনো মৃত্যু হলে অনেকে ছুটে আসেন। সামাজিক রীতি, সম্পর্কের টান, শোক প্রকাশ—এসবের নিজস্ব গুরুত্ব আছে। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। জীবনের আনন্দ ও শোকের আনুষ্ঠানিক মুহূর্তগুলোতে যারা হাজির হন, তাঁরা কি জীবনের কঠিন সময়েও পাশে থাকেন?
আত্মীয়তার সম্পর্ক জন্মসূত্রে তৈরি হয়। কিন্তু সেই সম্পর্কের ভেতরে বিশ্বাস তৈরি করতে হয় আচরণ দিয়ে।
অনেক পরিবারে আত্মীয়তার যোগাযোগ টিকে থাকে সামাজিক প্রয়োজনের কারণে। বিয়েতে গেলে বিয়ের দাওয়াত ফেরত দিতে হয়, কারও মৃত্যুতে গেলে অন্যরাও আসবেন—এমন প্রত্যাশা থাকে। কে এলেন, কে এলেন না, কে কত টাকা দিলেন, কে কতক্ষণ থাকলেন—এসবের হিসাবও চলে। অথচ পরিবারের একজন মানুষ দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকলে তাঁর খোঁজ নেওয়ার কথা অনেকের মনে পড়ে না।
এখানে একটা অস্বস্তিকর সত্য আছে। কখনো কখনো সম্পর্কের আনুষ্ঠানিকতা আমাদের কাছে সম্পর্কের দায়িত্বের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সব আত্মীয় যে এমন, তা নয়। কেউ নিজের সামর্থ্যের সীমা পেরিয়েও সাহায্য করেন। কেউ টাকা দিতে না পারলেও হাসপাতালে সঙ্গে যান, চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে সাহায্য করেন, কিংবা অসুস্থ মানুষের পাশে বসে পরিবারের অন্য সদস্যকে একটু বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ করে দেন। কেউ হয়তো রান্না করে খাবার পাঠিয়ে দেন, কারণ জানেন, অসুস্থ মানুষকে সামলাতে গিয়ে বাড়ির লোকের ঠিকমতো খাওয়াও হয় না। আবার কেউ প্রতিদিন ফোন করে বড় কোনো সমাধান দিতে চান না; শুধু জানতে চান, “আজ শরীরটা কেমন? কোনো দরকার হলে বলো।”
এই মানুষগুলো সব সময় সমস্যার সমাধান করতে পারেন না। কিন্তু বিপদে থাকা মানুষটিকে একা ফেলে দেন না। তাঁদের কাছে সাহায্য মানে শুধু টাকা দেওয়া নয়; অন্যের অসুবিধাকে নিজের কাছে গুরুত্ব দেওয়া। কখনো একটি কাজ ভাগ করে নেওয়া, কখনো প্রয়োজনের সময় পাশে থাকা, কখনো সাহায্য করতে না পারলেও আন্তরিকভাবে নিজের সীমাবদ্ধতা জানানো—এসবের মধ্য দিয়েই আত্মীয়তার অর্থ তৈরি হয়।
আবার সাহায্য না করার পেছনে সব সময় নিষ্ঠুরতা থাকে না। কারও নিজের সংসারে অভাব, কারও ঋণের চাপ, কারও সময় বা সামর্থ্য সীমিত। সব সমস্যার সমাধান আত্মীয়ের পক্ষে করা সম্ভবও নয়। কাউকে সাহায্য করতে না পারা আর সাহায্যের প্রয়োজনটুকু অস্বীকার করা এক বিষয় নয়।
কিন্তু আমরা অনেক সময় সেটুকুও করি না। ফোন না ধরে থাকি, পরে কথা বলব বলে ভুলে যাই, কিংবা সাহায্য চাইতে আসা মানুষটিকেই এমনভাবে কথা বলি যেন সে নিজের বিপদের জন্য নিজেই দায়ী।
ফলে মানুষ শুধু আর্থিক সংকটে পড়ে না; নিজের আত্মীয়দের কাছে ছোট হয়ে যাওয়ার কষ্টও বয়ে বেড়ায়। একসময় সে সাহায্য চাওয়া বন্ধ করে দেয়। অনুষ্ঠানে দেখা হলে হাসিমুখে কথা বলে, খোঁজখবর নেয়, প্রয়োজনে উপহারও দেয়। বাইরে থেকে সম্পর্ক স্বাভাবিক দেখায়, কিন্তু ভেতরে আগের নির্ভরতা আর থাকে না।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, এই দূরত্ব সব সময় ঝগড়া করে তৈরি হয় না। কখনো কয়েকটি না-ধরা ফোন, কখনো বারবার পিছিয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি, কখনো বিপদের সময় বলা একটি উদাসীন বাক্যই সম্পর্কের ভেতরে অদৃশ্য দেয়াল তুলে দেয়।
আত্মীয়তা মানে প্রত্যেকের সব সমস্যার দায় নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া নয়। বরং কে বিপদে আছে, কে সাহায্য চাইতে সংকোচ বোধ করছে, কে শুধু দুটো কথা বলার মানুষ খুঁজছে—সেটুকু বোঝার চেষ্টা করা। সব সময় টাকা দিয়ে সাহায্য করা সম্ভব নয়, কিন্তু সম্মান দিয়ে কথা বলা তো সম্ভব।
আর যারা বারবার বিপদের সময় একা হয়ে পড়েন, তাঁদেরও একটা কথা মনে রাখা দরকার। সম্পর্কের নামে কাউকে জোর করে আপন বানিয়ে রাখা যায় না। যাঁরা পাশে থাকেন, তাঁদের মূল্য দিতে হয়। আর যাঁরা কেবল সামাজিক আনুষ্ঠানিকতায় সম্পর্ক বজায় রাখেন, তাঁদের কাছ থেকে প্রত্যাশার সীমাটাও বুঝে নিতে হয়। এতে সম্পর্কের প্রতি ঘৃণা তৈরি করা জরুরি নয়; বরং নিজের মানসিক শান্তি রক্ষা করা যায়।
শেষ পর্যন্ত আত্মীয়তার সত্যিকারের পরীক্ষা হয় না বিয়ের দাওয়াতে কে এলেন, কিংবা মৃত্যুর দিন কে কাঁধে হাত রাখলেন, তা দিয়ে। পরীক্ষা হয় সেই দিনগুলোতে, যখন বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান নেই, কাউকে দেখানোর কিছু নেই, অথচ একজন মানুষের সত্যিই সাহায্য দরকার।
সেদিন হয়তো বড় কোনো আত্মীয় আসবেন না। দূরের কোনো পরিচিত মানুষও পাশে দাঁড়াতে পারেন। আবার যাঁকে নিজের বলে ভেবেছিলেন, তাঁর কাছ থেকেই আসতে পারে নীরবতা।
তাই সম্পর্কের মূল্য নির্ধারণের সময় শুধু রক্তের পরিচয়টুকু দেখলে চলে না। দেখতে হয়, সেই পরিচয়ের ভেতরে মানবিকতার কতটা জায়গা আছে।
বিয়ের দিনে কে পাশে বসেছিল, তা মানুষ একসময় ভুলে যেতে পারে। কিন্তু বিপদের দিনে কে ফোন ধরেছিল, কে ফিরিয়ে দিয়েছিল আর কে নিঃশব্দে পাশে দাঁড়িয়েছিল—সেই হিসাব অনেক সময় দীর্ঘদিন মনে থেকে যায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।