কৌতূহলের সীমা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ১০ জুন, ২০২৬
পাশের বাসার ভাবি এখনও বিয়ে করল না কেন—এই প্রশ্নটা আপনার মাথায় যতবার এসেছে, নিজের স্বপ্নের কথা ততবার ভেবেছেন?
প্রশ্নটা অস্বস্তিকর শোনাতে পারে। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, আমরা অনেক সময় নিজের জীবনের চেয়ে অন্যের জীবন নিয়েই বেশি আগ্রহী হয়ে পড়ি।
কে কোথায় গেল, কার সঙ্গে দেখা করল, কেন এখনও বিয়ে করল না, কার সংসারে সমস্যা চলছে, কার বেতন কত, কার ছেলে-মেয়ে কী করছে—এসব জানতে পারলে যেন ভেতরে ভেতরে একটা তৃপ্তি কাজ করে। বিষয়টা এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে আমরা অনেকেই এটাকে সমস্যা বলেই মনে করি না।
কিন্তু একটু ভেবে দেখলে প্রশ্ন জাগে—আমরা কেন অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এত মাথা ঘামাই?
ধরুন, আপনার এলাকায় নতুন একটা পরিবার ভাড়া এলো। কয়েক দিনের মধ্যেই আশপাশের মানুষ তাদের সম্পর্কে নানা তথ্য
জেনে ফেলতে চাইবে। কোথা থেকে এসেছে, কী কাজ করে, বাড়িতে কয়জন মানুষ, আর্থিক অবস্থা কেমন—এসব নিয়ে আগ্রহ শুরু হয়ে যায়।
পরিচিত হওয়ার জন্য কিছু প্রশ্ন করাতে সমস্যা নেই। কিন্তু অনেক সময় সেই আগ্রহ একটা সীমা ছাড়িয়ে যায়। তখন আর সেটা সৌজন্য থাকে না, ব্যক্তিগত জীবনে ঢুকে পড়ার চেষ্টা হয়ে যায়।
আমাদের সমাজে এই প্রবণতা নতুন কিছু নয়। ছোটবেলা থেকেই আমরা এমন পরিবেশে বড় হই, যেখানে অন্যের জীবন নিয়ে আলোচনা খুব সাধারণ ব্যাপার। পারিবারিক আড্ডা হোক, আত্মীয়দের মিলনমেলা হোক কিংবা পাড়ার চায়ের দোকান—কথার বিষয় হিসেবে প্রায়ই উঠে আসে অন্য কোনো মানুষ।
কে কী করল, কার কী সমস্যা, কার ছেলে বিদেশ গেল, কার মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না—এসব নিয়ে গল্পের শেষ থাকে না।
একসময় বিষয়টা এমন হয়ে যায় যে নিজের জীবন নিয়ে ভাবার চেয়ে অন্যের জীবন নিয়ে কথা বলাটা বেশি সহজ মনে হয়।
এখন আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই প্রবণতাকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে।
আগে অনেক কিছুই মানুষের ঘরের ভেতর থাকত। এখন মানুষ কোথায় খাচ্ছে, কোথায় ঘুরছে, কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে—সবকিছু খুব সহজে সবার সামনে চলে আসে।
ফলে কৌতূহলও বেড়েছে।
আজকাল দেখা যায়, অনেক মানুষ নিজের পরিচিতদের চেয়েও অপরিচিত মানুষের জীবন নিয়ে বেশি আগ্রহী। কোনো গুজব ছড়ালে মুহূর্তের মধ্যে সেটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। কার সম্পর্ক ভেঙেছে, কার সঙ্গে কার ঝামেলা, কে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এসব যেন অনেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ খবর।
সমস্যাটা অন্য জায়গায়।
যখন আমরা কারও জীবনের খুব সামান্য অংশ দেখি, তখন অনেক সময় পুরো মানুষটাকেই বিচার করে ফেলি।
একটা ছবি দেখলাম, একটা পোস্ট পড়লাম, কারও মুখে কিছু শুনলাম—ব্যস, সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেললাম। যেন মানুষটার জীবন সম্পর্কে সবকিছু জেনে গেছি।
কিন্তু বাস্তব জীবন তো এত সরল না।
প্রতিটি মানুষের জীবনের এমন কিছু অধ্যায় থাকে, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না। যে মানুষটাকে আমরা সমালোচনা করছি, সে হয়তো এমন একটা লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, যার খবর আমাদের নেই। যে মানুষটাকে নিয়ে প্রশ্ন তুলছি, তার বাস্তবতা হয়তো আমাদের কল্পনার চেয়েও কঠিন।
আর একটা বিষয় বেশ অদ্ভুত।
কিছুদিন আগে এক আত্মীয় হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার বেতন কত?”
প্রশ্নটা শুনে একটু অস্বস্তি হয়েছিল। পরে ভাবতে গিয়ে নিজেই ধরা খেলাম। খুব বেশি দিন হয়নি, আমিও অন্য একজনকে প্রায় একই ধরনের ব্যক্তিগত প্রশ্ন করেছিলাম।
আমরা অন্যের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে জানতে খুব আগ্রহী হলেও নিজের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে প্রশ্ন শুনতে পছন্দ করি না।
কেউ যদি বারবার আমাদের আয় নিয়ে জানতে চায়, পারিবারিক সমস্যা নিয়ে খোঁচাখুঁচি করে বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা চায়, তখন আমরা বিরক্ত হই।
অর্থাৎ নিজের জন্য যে ব্যক্তিগত পরিসর চাই, অন্যের জন্য সেই একই জায়গাটা দিতে আমরা অনেক সময় কৃপণতা করি।
এর প্রভাবও কম নয়।
যখন একজন মানুষ বুঝতে পারে যে তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত অন্যদের আলোচনার বিষয় হয়ে যাচ্ছে, তখন সে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে। অনেক কথা আর বলতে চায় না। মানুষকে সহজে বিশ্বাস করতে পারে না। সম্পর্কের ভেতর অদৃশ্য একটা দূরত্ব তৈরি হয়।
আমার মনে হয়, একটি সুস্থ সমাজে কৌতূহল থাকবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই কৌতূহলেরও একটা সীমা থাকা দরকার।
সব প্রশ্ন করার অধিকার আমাদের নেই। সব উত্তর জানারও দরকার নেই।
কিছু বিষয় না জিজ্ঞেস করাও ভদ্রতা। কিছু বিষয় না জানাও পরিণত মানসিকতার পরিচয়।
আমরা যদি সত্যিই আরও মানবিক হতে চাই, তাহলে অন্যের জীবনের জানালায় উঁকি দেওয়ার আগে নিজের জীবনটার দিকে একটু বেশি তাকানো দরকার।
কারণ একজন মানুষের প্রতি সম্মান দেখানো মানে শুধু তার সামনে ভদ্র আচরণ করা নয়। তার ব্যক্তিগত সীমানাকেও সম্মান করা।
সবকিছু জানতে হবে—এই ধারণাটা সব সময় ভালো নয়।
কখনও কখনও না জানাটাও সম্মানের একটি রূপ।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।