ডিভোর্স আদালতে শুরু হয় না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ৩০ জুন, ২০২৬
ডিভোর্সের সংখ্যা বাড়ছে। এটা এখন আর নতুন কোনো খবর নয়। আশপাশেই দেখি, কয়েক বছর আগেও যাদের দেখে মনে হতো বেশ সুখী, হঠাৎ শুনি তারা আলাদা হয়ে গেছে। তখন নানা রকম ব্যাখ্যা আসে। কেউ আইনকে দোষ দেন, কেউ বলেন এখনকার মানুষ আর মানিয়ে নিতে চায় না।
কিন্তু আমার মনে হয়, ডিভোর্সের শুরু আদালতে হয় না। শুরু হয় অনেক আগে। যখন একই ঘরে থেকেও দুজন মানুষ ধীরে ধীরে একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকে।
বেশিরভাগ সম্পর্ক একদিনে ভাঙে না। রাতে ছোট্ট একটা বিষয় নিয়ে ঝগড়া হলো। রাগের মাথায় একজন বলল, "থাক, আর কথা বলতে হবে না।" অন্যজনও চুপ করে গেল। তখন মনে হলো, সকালে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু হলো না। একদিনের নীরবতা দুই দিনে গেল, তারপর এক সপ্তাহে। একসময় কথা হয়, কিন্তু শুধু সংসারের দরকারি বিষয় নিয়ে।
"বাজার থেকে কী আনবে?"
"বিদ্যুতের বিল দিয়েছ?"
সম্পর্কটা তখনও থাকে। কিন্তু ভেতরটা আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে যায়।
আমরা পড়াশোনা করি, কাজ শিখি, টাকা উপার্জন করতে শিখি।
কিন্তু সম্পর্ক কীভাবে ধরে রাখতে হয়, সেটা খুব কম মানুষই শেখে।
মতের অমিল হলে কীভাবে কথা বলতে হয়,
রাগের সময় কোন কথাটা না বলাই ভালো,
কখন নিজের জেদটা একটু নামিয়ে রাখা দরকার—এসব কেউ শেখায় না।
অথচ সংসারে এগুলোরই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
আরেকটা বিষয় খুব চোখে পড়ে।
অনেক সময় আমরা সম্পর্ক বাঁচানোর চেয়ে নিজের অবস্থানটা ঠিক প্রমাণ করতে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কে আগে ফোন করবে,
কে আগে ক্ষমা চাইবে,
কে আগে নরম হবে—এসব হিসাব করতে করতেই দূরত্ব বেড়ে যায়।
অথচ সংসার কোনো প্রতিযোগিতা নয়। এখানে একজনকে হারিয়ে অন্যজনের জয় বেশিদিন টেকে না।
সম্পর্ক সব সময় বড় কোনো ভুলে ভাঙে না।
ভাঙে ছোট ছোট অবহেলায়। একজন হয়তো দিনের শেষে শুধু দশ মিনিট কথা বলতে চেয়েছিল। অন্যজন ভাবল, "আজ না, কাল বলব।" সেই "কাল" অনেক সময় আর আসে না।
সম্মানের বিষয়টাও ঠিক তেমন। ভালোবাসা কমবেশি হতে পারে, মতের অমিলও থাকবে।
কিন্তু একজন মানুষ যদি বারবার অনুভব করেন,
তার কথা, তার অনুভূতি বা তার উপস্থিতির কোনো মূল্য নেই, তাহলে সেই সম্পর্ক বেশিদিন টেকে না। মানুষ শুধু ভালোবাসা চায় না, গুরুত্বও চায়।
তাহলে কী বদলানো দরকার?
আমার মনে হয়,
আইন নয়, আগে বদলানো দরকার আমাদের সম্পর্ক দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।
ঝগড়া হবেই।
মতের অমিলও থাকবে।
কিন্তু রাগের মুহূর্তে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার নেই। অনেক সময় একটু থেমে যাওয়াও সমাধানের অংশ হতে পারে।
দিনে দশ মিনিট শুধু একে অপরের জন্য রাখাও কঠিন কিছু নয়।
রাতে ভাতের প্লেট নিয়ে বসে টিভিটা বন্ধ করে শুধু জিজ্ঞেস করা, "আজ তোমার দিনটা কেমন গেল?" অনেক সময় এই সাধারণ প্রশ্নটাই আবার দুজন মানুষকে একে অপরের কাছে ফিরিয়ে আনে।
ক্ষমা চাইতে সবারই কষ্ট হয়।
কিন্তু অন্তত অন্য মানুষটার কথা মন দিয়ে শোনা যায়। অনেক সময় মানুষ সমাধানের আগে এটুকুই চায়—কেউ তার কথা বিচার না করে শুনুক।
বিয়ের আগেও বাস্তব বিষয় নিয়ে কথা বলা জরুরি। শুধু ভালোবাসা দিয়ে সংসার চলে না।
অর্থের দায়িত্ব, পরিবারের প্রত্যাশা, মতের অমিল হলে কীভাবে সামলানো হবে—এসব নিয়েও কথা হওয়া দরকার।
পরিবারেরও বড় ভূমিকা আছে।
রাগের মুহূর্তে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার বদলে যদি তারা বলে, "আজ কোনো সিদ্ধান্ত নিও না।
কাল সকালে ঠান্ডা মাথায় বসে কথা বলো।"
অনেক সময় সেই এক রাতই নতুন করে ভাবার সুযোগ এনে দেয়।
অবশ্যই, এটা সেই সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যেখানে দুজনের নিরাপত্তা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ আছে।
তবে একটা বিষয় পরিষ্কার করে বলা দরকার।
সব সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য নয়।
যেখানে মারধর, মানসিক নির্যাতন, প্রতারণা বা নিরাপত্তাহীনতা আছে, সেখানে ডিভোর্স অনেক সময় সঠিক এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত।
কোনো মানুষকে কষ্টের সম্পর্কে আটকে থাকার পরামর্শ দেওয়া যায় না।
কিন্তু যে সম্পর্কগুলো শুধু অহংকার, নীরবতা, ছোট ছোট অবহেলা আর যোগাযোগের অভাবে ভেঙে যাচ্ছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে হয়তো এখনো দেরি হয়ে যায়নি।
কারণ অনেক সময় একটা সম্পর্ক বাঁচাতে বড় কোনো অলৌকিক ঘটনার দরকার হয় না। দরকার হয় শুধু একজনের বলা একটি বাক্য—
"চলো, আজ তর্ক না করি। আগে বসে কথা বলি।"
আপনার কি মনে হয়, বেশিরভাগ সম্পর্ক ভালোবাসা শেষ হয়ে যাওয়ায় ভাঙে, নাকি কথা বলা বন্ধ হয়ে যাওয়ায়? মন্তব্যে আপনার মতামত জানান।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।