সরলতার শক্তি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | মার্চ ২৫, ২০২৬
প্রথমবার আমি দুর্গা পড়ি ২০০৭ সালে, বর্ষার ছুটিতে।
পাতা ৮৭—দুর্গা ট্রেনের পেছনে ছুটছে। তারপর হঠাৎ থেমে দাঁড়ায়। ট্রেনটা চোখের আড়ালে চলে যায়, কিন্তু সে আর ফেরে না।
কেন ফেরে না—তখন বুঝিনি। শুধু মনে হয়েছিল, সে যেন যেতে দিতে চায় না।
সাধারণ একটা দৃশ্য। কিন্তু আমার মনে থেকে গেছে।
দুর্গাকে প্রথমে একটা চঞ্চল গ্রামের মেয়ে মনে হয়। দৌড়ায়, বকুনি খায়। কিন্তু একটু খেয়াল করলে বোঝা যায়—তার ভেতরে একটা টান আছে। সে সবকিছু দেখতে চায়, ছুঁতে চায়, নিজের করে নিতে চায়।
ইন্দির ঠাকরুনের সঙ্গে তার সম্পর্কটা আলাদা। বাড়ির অন্যরা যেখানে বিরক্ত হয়, দুর্গা সেখানে বসে গল্প করে, খাবার ভাগ করে নেয়।
অপুর সঙ্গে সে শুধু বোন না—পথ দেখায়, আবার পথ ভুলিয়েও দেয়। অপুর পৃথিবীটা খুলে যায়, কিন্তু সেই দরজাটা প্রথমে ঠেলে দেয় দুর্গাই।
দুর্গা ভালো মেয়ে—এই কথাটা পুরো ঠিক না।
সে অন্যের গাছ থেকে আম পেড়ে খায়, ধরা পড়লে অস্বীকার করে। কখনো জেদ করে, কখনো মিথ্যা বলে। হয়তো এই জন্যই তার মৃত্যুটা বেশি লাগে—ভালো মানুষের না, অসম্পূর্ণ একজন মানুষের মৃত্যু।
তার মৃত্যুটা হঠাৎ আসে। কোনো প্রস্তুতি নেই। গল্প এগিয়ে যায়, কিন্তু কোথাও একটা ফাঁকা থেকে যায়। মনে হয়, যেটা সবচেয়ে বেশি বাঁচতে চেয়েছিল—সেটাই আগে থেমে গেল।
কিছুদিন আগে নিশ্চিন্দিপুর গিয়েছিলাম। মাঠটা এখনও আছে। কিন্তু ট্রেনের লাইন বদলে গেছে।
যেদিকে দুর্গা তাকিয়েছিল, এখন সেদিকে আর ট্রেন যায় না।
আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু কোনো ট্রেন এল না।
আমার ছোট বোন একবার আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “ট্রেন কোথায় যায়?”
আমি উত্তর দিতে পারিনি। এখনো পারি না।
দুর্গা নেই।
তবু মাঝে মাঝে ট্রেন গেলে মনে হয়—সে হয়তো এখনো দাঁড়িয়ে আছে, তাকিয়ে আছে।
#পথের_পাঁচালী #দুর্গা #বাংলা_সাহিত্য #চরিত্র_বিশ্লেষণ #মননের_ছোঁয়া
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।