পকেটে বিশ টাকা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক | ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সকালে এক কাপ চা খেয়ে মানুষটি কাজে বের হয়েছিল। দুপুরে খাওয়ার সুযোগ হয়নি। সন্ধ্যায় পকেটে হাত দিয়ে দেখল, আছে মাত্র বিশ টাকা।
ঘরে ফিরলে সন্তান খাবার চাইবে।
কয়েক দিন ধরে কাজ নেই। বাজারে চাল-ডালের দাম বেড়েছে। ধার করার মতো মানুষও আর নেই।
এই অবস্থায় তাকে যদি বলা হয়, “সৎ থাকো”, কথাটা সে হয়তো শুনবে। কিন্তু তার মাথায় তখন নীতিকথা ঘুরবে না।
একটাই প্রশ্ন থাকবে—
আজ রাতে ঘরে চুলা জ্বলবে তো?
এখানেই আসে কথাটি—পেটের ক্ষুধা কি সত্যিই সকল পাপের উৎস?
আক্ষরিক অর্থে নয়।
মানুষ শুধু ক্ষুধার কারণে অন্যায় করে না। যার ঘরে খাবারের অভাব নেই, সেও লোভের কাছে হেরে যেতে পারে। প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি থাকার পরও কেউ আরও টাকা, আরও সম্পদ, আরও ক্ষমতা চাইতে পারে। অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য সব সময় খালি পেট লাগে না।
কিন্তু ক্ষুধারও একটা ক্ষমতা আছে।
দীর্ঘদিনের অভাব মানুষের পৃথিবীটাকে ছোট করে ফেলে। আগামী পাঁচ বছর কী হবে, সেই চিন্তার জায়গায় তখন আজকের বাজার, আজকের ভাড়া আর আজকের ওষুধ এসে বসে।
একজন বাবা যখন জানেন, ঘরে সন্তানের জন্য রাতের খাবার নেই, তখন তার সামনে শুধু অর্থের সংকট থাকে না। থাকে নিজের কাছে নিজেকে ঠিক রাখার একটা কঠিন পরীক্ষা।
সে কি নিয়ম মেনে অপেক্ষা করবে?
নাকি এমন কোনো পথ বেছে নেবে, যেটাকে সে নিজেই একদিন অন্যায় বলেছিল?
আমরা চুরি করা মানুষটিকে খুব সহজেই চোর বলে দিই। কিন্তু তার আগের রাতগুলো সম্পর্কে জানতে চাই না।
হয়তো তিন দিন ধরে তার কাজ নেই। মেয়ের স্কুলের বেতন তিন মাস বাকি, ওদিকে মায়ের ওষুধের পাতাটাও কালই শেষ হয়েছে। বাড়িওয়ালা ভাড়ার জন্য দরজায় দাঁড়িয়ে আছে।
এসব কোনো অপরাধকে বৈধ করে না। কিন্তু অপরাধের পেছনের মানুষটাকে দেখতে সাহায্য করে।
অভাব মানুষকে প্রতিদিন এমন কিছু হিসাবের সামনে দাঁড় করায়, যেগুলোর উত্তর দূর থেকে দেওয়া খুব সহজ।
আজ ভাত কিনবে, নাকি ওষুধ?
সন্তানের খাতা কিনবে, নাকি নিজের খাবার?
বাসাভাড়া দেবে, নাকি মায়ের চিকিৎসা?
যে মানুষ প্রতিদিন এমন হিসাব করে বাঁচে, তার কাছে “সৎ থাকো” কথাটার অর্থ আমাদের মতো এক থাকে না।
এখানেই সমাজের কথাটাও আসে।
আমরা একজন মানুষকে ভালো থাকতে বলি। কিন্তু সে ভালো থাকার মতো কোনো পথ পেয়েছিল কি না, সেই প্রশ্ন করি না।
কাজের সুযোগ ছিল?
ন্যায্য মজুরি পেয়েছিল?
অসুস্থ হলে চিকিৎসা করার সামর্থ্য ছিল?
দুর্দিনে পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর না জেনে শুধু অপরাধের মুহূর্তটাকে দেখলে মানুষটাকে বোঝা যায় না।
ক্ষুধার্ত মানুষকে নীতিকথা শোনানো সহজ। তার ঘরে একবেলা খাবার পৌঁছে দেওয়া কঠিন।
তবে এখানেই আরেকটি সত্য আছে—সব ক্ষুধার্ত মানুষ অন্যায় করে না।
কেউ নিজের ক্ষুধা চেপে সন্তানের জন্য খাবার নিয়ে বাড়ি ফেরে। কেউ অভাবের মধ্যেও অন্যের টাকা ফিরিয়ে দেয়। কেউ নিজের কষ্টের কথা ভুলে অসুস্থ প্রতিবেশীর দরজায় দাঁড়ায়।
অর্থাৎ ক্ষুধা মানুষকে দুর্বল করতে পারে, কিন্তু মনুষ্যত্ব কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা তার সব সময় থাকে না।
আর পেটের ক্ষুধার চেয়েও অদ্ভুত একটি ক্ষুধা আছে—আরও পাওয়ার ক্ষুধা।
যার ঘরে খাবার আছে, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপদ, জীবনে অভাব নেই; তবু তার চাওয়া শেষ হয় না। একটার পর একটা সম্পদ, ক্ষমতা, প্রভাব—সবকিছু পাওয়ার পরও মনে হয়, আরও চাই।
একজন দরিদ্র মানুষের ক্ষুধা তাকে এক মুঠো ভাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
আর একজন লোভী মানুষের ক্ষুধা তাকে অন্যের পুরো থালাটাই কেড়ে নিতে শেখাতে পারে।
দুটো ক্ষুধা এক নয়।
একটি বেঁচে থাকার তাগিদ। অন্যটি সীমাহীন পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
তাই পেটের ক্ষুধাকে সকল পাপের উৎস বলা হয়তো পুরো সত্য নয়। কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষের সামনে নৈতিকতার পরীক্ষা যে অনেক কঠিন হয়ে যায়, সেটা অস্বীকার করারও উপায় নেই।
সেদিন সন্ধ্যার সেই মানুষটির পকেটে ছিল মাত্র বিশ টাকা।
আমরা হয়তো তার পরের সিদ্ধান্তটা দেখব।
চুরি করল কি না, সেটাও দেখব।
কিন্তু তার আগে আরেকবার ভাবা দরকার—
ওই বিশ টাকার মানুষটির সামনে বাঁচার আর কোনো দরজা খোলা ছিল কি?
হয়তো মানুষের মনুষ্যত্বের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটা সেখানেই।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।