দায়িত্বের নিচে চাপা মানুষ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । ১৬ মে, ২০২৬
রায়হানের বয়স মাত্র ২৮ বছর।
বুয়েট থেকে পাস করার পর তার স্বপ্ন ছিল ঢাকায় একটা ভালো চাকরি করবে, নিজের মতো একটা জীবন গড়বে। কিন্তু এখন সে গ্রামের বাজারে তিনটা টিউশনি করে। বিকেলে ফার্মেসিতে বসে হিসাব লেখে। কারণ প্রতি সপ্তাহে তার বাবার ডায়ালাইসিস করাতে হয়।
মাঝে মাঝে রাতে সে মোবাইলের ক্যালকুলেটর খুলে বসে।
একদিকে হাসপাতালের বিল। অন্যদিকে ছোট বোনের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফি। তারপর নিজের বিকাশ অ্যাকাউন্টে তাকায়। সংখ্যাটা এত ছোট হয় যে স্ক্রিনটা পর্যন্ত অপমানজনক লাগে।
তবু আশেপাশের মানুষ তাকে দায়িত্ববান ছেলে বলে।
এই জায়গাটাই ভয়ংকর।
আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছে, যাদের দায়িত্ববোধ আছে, কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করার মতো ক্ষমতা নেই। তারা খারাপ মানুষ না। অলসও না। বরং সমস্যাটা উল্টো। তারা এত বেশি দায়িত্ব নিতে শেখে যে একসময় নিজের ভেতরটাই ভেঙে যায়।
বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজে এই সংকট খুব নীরবে কাজ করে। এখানে বড় ছেলে মানেই পরিবারের “ব্যাকআপ জেনারেটর”। বাবা অসুস্থ হলে সে সামলাবে। ছোট ভাই বেকার হলে সে দেখবে। বাসার ভাড়া বাকি পড়লে তাকেই ফোন যাবে। মজার বিষয় হলো, এই দায়িত্বগুলো কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে দেয় না। এগুলো বাতাসের মতো। জন্মের পর থেকেই মানুষ এগুলোর ভেতরে বড় হয়।
আমার পরিচিত এক বড় চাচা আছেন। প্রতি কোরবানির আগে ফোন করে বলেন,
“এবার গরুটা তুমিই দিও।”
কিন্তু আমি কখনো শুনিনি তিনি কাউকে ফোন করে বলছেন,
“তোমার চাকরির জন্য আমি একজনের সাথে কথা বলেছি।”
এটাই আমাদের সমাজের এক অদ্ভুত নৈতিকতা।
দায়িত্ব সবাই দিতে চায়। ক্ষমতা খুব কম মানুষ ভাগ করে।
এই কারণেই অনেক তরুণ আজকাল বয়সের চেয়ে ক্লান্ত বেশি দেখায়। তাদের মুখে দাড়ি ওঠার আগেই সংসারের হিসাব শিখতে হয়। তারা প্রেমের চেয়ে হাসপাতালের সিরিয়াল বেশি বোঝে। জীবনের সবচেয়ে শক্ত সময়টা তারা কাটায় টিকে থাকার চিন্তায়।
তারপরও সমাজ তাদের অলস বলে।
সমস্যাটা শুধু পরিবারে না। শিক্ষা ব্যবস্থাতেও আছে। আমরা ছোটবেলা থেকে শুনি—দায়িত্ববান হও, পরিবারের পাশে দাঁড়াও, দেশের জন্য কাজ করো। কিন্তু কেউ শেখায় না কীভাবে অর্থনৈতিকভাবে শক্ত হতে হয়। কীভাবে মানসিক চাপ সামলাতে হয়। কীভাবে “না” বলতে হয়।
ফলে আমরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা নৈতিকভাবে সচেতন কিন্তু বাস্তব জীবনে অপ্রস্তুত।
এই অপ্রস্তুত মানুষগুলো বাইরে থেকে স্বাভাবিক দেখায়। কিন্তু রাতের বেলা তাদের ভেতরটা অন্যরকম হয়।
রাত ২টায় ফার্মেসির সামনে দাঁড়িয়ে যখন কেউ মায়ের প্রেসক্রিপশনের দাম হিসাব করে, তখন দায়িত্ব শব্দটা খুব মহৎ লাগে না। তখন মনে হয় এটা একধরনের শাস্তি। এমন শাস্তি, যেটা থেকে পালালেও অপরাধবোধ হয়, আবার বহন করলেও মানুষ ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যায়।
আমি নিজেও এই ফাঁদের বাইরে না।
একসময় মনে হতো, সবাইকে সাহায্য করতে পারা মানেই ভালো মানুষ হওয়া। পরে বুঝলাম, নিজের ক্ষমতার বাইরে গিয়ে দায়িত্ব নিতে নিতে মানুষ একসময় ভিতর থেকে ফাঁপা হয়ে যায়। তখন সে কাউকেই ঠিকভাবে বাঁচাতে পারে না। নিজেকেও না।
আমাদের সমাজ একটা বিপজ্জনক ভুল করে।
এখানে দায়িত্বকে চরিত্রের মাপকাঠি ধরা হয়, কিন্তু ক্ষমতাকে ধরা হয় ভাগ্যের বিষয় হিসেবে। ফলে কেউ ক্লান্ত হলে আমরা বলি, “তুমি আরও চেষ্টা করো।” কিন্তু খুব কম মানুষ জিজ্ঞেস করে, “তোমার কাঁধে এত ওজন কে চাপিয়েছে?”
এই প্রশ্নটা জরুরি।
রায়হান এখন একটা অভ্যাস করেছে।
কেউ দায়িত্বের কথা বললে সে আগে তিনটা প্রশ্ন করে।
প্রথম প্রশ্ন — এটা পালন করার বাস্তব সামর্থ্য কি আমার আছে?
দ্বিতীয় প্রশ্ন — আমি না বললে কি সত্যিই সবকিছু ভেঙে পড়বে?
তৃতীয় প্রশ্ন — এই বোঝাটা আমি একা টানছি, নাকি কেউ পাশে আছে?
আগে সে এসব ভাবত না।
যে যা বলত, চুপচাপ কাঁধে তুলে নিত। পরে বুঝেছে, সব দায়িত্ব নৈতিক দায়িত্ব না। কিছু দায়িত্ব শুধু মানুষের প্রত্যাশা। কিছু দায়িত্ব আবেগের চাপ। আর কিছু দায়িত্ব আসে এই কারণে যে তুমি “না” বলতে শেখোনি।
আরেকটা বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা না। আমাদের সমাজ বিশেষ করে পুরুষদের শেখায়—চুপচাপ সহ্য করো। ফলে অনেকেই ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়লেও মুখে হাসি ধরে রাখে। এই নীরব অভিনয় একসময় মানুষকে মানসিকভাবে অসাড় করে দেয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই ক্লান্ত মানুষগুলোকে সমাজ আবার উদাহরণ হিসেবেও ব্যবহার করে। বলা হয়, “ওকে দেখো, কত দায়িত্বশীল!” কিন্তু কেউ দেখে না, লোকটা শেষ কবে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে।
রায়হানরা এখনো টিউশনি করে।
রাত ২টার পরও তারা হাসপাতালের বিল হিসাব করে।
বড় চাচারা এখনো ফোন করে বলে,
“এবার গরুটা তুমিই দিও।”
আমরা তখন তাদের “দায়িত্বশীল ছেলে” বলে প্রশংসা করি।
কিন্তু খুব কম মানুষ জিজ্ঞেস করি — ছেলেটা শেষ কবে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে।
আমরা আসলে কেমন সমাজ বানাচ্ছি?
মানুষের সমাজ?
নাকি ক্লান্ত মানুষদের একটা বিশাল ব্যাকআপ জেনারেটরের গোডাউন?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।