ইভ টিজিং: সমাজের অদৃশ্য ক্ষত-প্রবন্ধ
লেখকঃ মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ধরণঃ প্রবন্ধ (মানবিক ও দৃশ্যনির্ভর)
তারিখঃ ১৫ অক্টোবর ২০২৫
রোদ ঝলমল এক সকালে, স্কুলে যাওয়ার পথে রাস্তার মোড়ে শারমিন হেঁটে যাচ্ছিল। হঠাৎই
কিছু ছেলে তার দিকে অশ্লীল মন্তব্য করতে শুরু করে। সে চুপচাপ পথ এগোতে চায়, কিন্তু গলায় অচেনা এক রুক্ষ বাঁধা অনুভূতি। চোখে পানি জমে আসে, হৃদয় ভিজে যায়—কেবল তার নয়, এমন অসংখ্য কিশোরী প্রতিনিয়ত এই মানসিক উত্ত্যক্তির শিকার।
এমন ক্ষুদ্র ঘটনা আমাদের শেখায়—ইভ টিজিং শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়; এটি এক অদৃশ্য ক্ষত, যা মানুষের আত্মমর্যাদা, নিরাপত্তা ও মনস্তাত্ত্বিক শান্তি লঙ্ঘন করে।
ইভ টিজিং বলতে বোঝায়—নারী বা কিশোরীকে তার দৈনন্দিন চলাফেরা, পড়াশোনা বা কাজকর্মের সময় অশালীন মন্তব্য, ভয় দেখানো, বিকৃত নামে ডাকা, পথ বন্ধ করা, অপ্রয়োজনীয় শারীরিক যোগাযোগ বা হুমকি প্রদান।
শাব্দিক অর্থে, Eve মানে নারী, আর Teasing মানে উত্ত্যক্ত করা। সুতরাং, Eve Teasing হল—নারীকে উদ্দেশ্য করে যেকোনো মানসিক বা শারীরিক উত্ত্যক্তি।
কিন্তু এখানে শুধু তথ্য নয়, মানবিক দৃষ্টিকোণ অপরিহার্য। একটি মেয়ের চোখের জল, হারানো আত্মবিশ্বাস, ভয়—এসবই এর হৃদয়স্পর্শী বাস্তবতা।
বয়স ও কৌতূহল: কৈশোর থেকে যৌবনের প্রারম্ভ—এই বয়সে অনেক ছেলে আত্মসংযমহীন হয়ে ওঠে। বিপরীত লিঙ্গকে প্রভাবিত করতে চায়, কখনও কখনও তা ভুলভাবে প্রকাশ পায়।
মিডিয়ার প্রভাব: টেলিভিশন, সিনেমা, সোশ্যাল মিডিয়া—সবই ‘অতিরিক্ত খোলামেলা সম্পর্ক’কে বিনোদন হিসেবে দেখায়। ফলে তারা মনে করে এটি “মজা” বা “ছোট খেলা”।
পরিবারিক নজরদারি ও গাইডলাইনের অভাব: বাবা-মায়ের ব্যস্ততা, সন্তানের প্রতি পর্যাপ্ত মনোযোগ না থাকা—এসবই শিশু ও কিশোরদের ভুল পথে ঠেলে দেয়।
ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা কম থাকা: সামাজিক সীমাবদ্ধতা ও আত্মসংযম না থাকায় তারা সহজেই লালসা বা অপকর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক আশ্রয়: কিছু ছেলেকে রাজনৈতিক বা সামাজিক আশ্রয় পাওয়া সাহস দেয়। তারা মনে করে, কেউ তাদের আটকাতে পারবে না।
মোবাইল ও সোশ্যাল মিডিয়ার অবাধ ব্যবহার: অল্প বয়সে মোবাইল হাতে পাওয়ায় সম্পর্ক ও প্রেমকে বিনোদনের উপকরণ মনে করে।
ছেলেদের মতো মেয়েরাও কখনও কখনও সামাজিক সীমা অতিক্রম করে।
অতি আধুনিকতা ও পোশাকের প্রভাব: অত্যধিক আকর্ষণী পোশাক বা আচরণ অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়া ডেকে আনে।
নিরাপত্তা সচেতনতার অভাব: পরিবার বা স্কুল থেকে পর্যাপ্ত সামাজিক নিরাপত্তা শিক্ষা না পাওয়া।
মিডিয়ার প্রভাব: সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন কনটেন্ট অনেক মেয়েকে ভুলভাবে আকর্ষণী হওয়ার প্রলোভনে ফেলে।
সাধারণত কিশোরী ও কিশোর, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী, এমনকি তরুণী ও কর্মজীবী নারীরাও শিকার। শহর-গ্রামের পার্থক্য কমে এসেছে—ইভ টিজিং এখন সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে।
সড়কের একটি ব্যস্ত কোণে, রিনা চুপচাপ হাঁটছিল। হঠাৎই পাশের তিন-চারজন ছেলে তাকে পথ আটকিয়ে অশ্লীল মন্তব্য করতে শুরু করে। সে চুপচাপ এগোতে চায়, কিন্তু চোখে পানি, হৃদয়ে ভয়—শুধু তার নয়, এমন বহু কিশোরীর প্রতি অবিচারের ছবি।
বাংলাদেশে ইভ টিজিং দমন ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৫০৯ ধারা: নারীর মর্যাদা হানি করার উদ্দেশ্যে মন্তব্য বা আচরণ শাস্তিযোগ্য।
দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩৫৪ ধারা: নারীর শালীনতা লঙ্ঘনের প্রয়াস।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯ ধারা।
দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ২৯৪ ধারা: প্রকাশ্যে অশালীন আচরণের শাস্তি।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ৭৬ ধারা: প্রকাশ্যে উত্ত্যক্ততা প্রতিরোধ।
এটি বন্ধ সম্ভব। তবে পরিবার, সমাজ, শিক্ষা ও আইন—সবকে একযোগে কাজ করতে হবে।
যদি ছেলে-মেয়ে উভয়ই বিপরীত লিঙ্গকে মানবিক মর্যাদা দিয়ে দেখার শিক্ষা গ্রহণ করে,
যদি পরিবার ও স্কুল সতর্কতা, নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করে,
যদি মিডিয়া ও প্রযুক্তির ব্যবহার সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়— তাহলে ইভ টিজিং একদিন নিশ্চয়ই সমাজ থেকে বিলুপ্ত হবে।
যদি আমরা সবাই বিপরীত লিঙ্গকে কেবল অন্য কেউ নয়, বরং পরিবারের সদস্য মনে করি—
সেদিনই আমরা একটি নিরাপদ, মানবিক ও সম্মানজনক সমাজ গড়ে তুলতে পারব।
তথ্যসূত্রঃ
১/ইউসুফ বেস্ট, “ইভ টিজিং কেন হয়”, সামহোয়্যার ইন ব্লগ, ১৬ আগস্ট ২০১০।
২/মো. গাউছুল আজম, দৈনিক যুগান্তর, ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮।
#ইভটিজিং #SocialAwareness #StopEveTeasing #RespectWomen #HumanDignity #YouthResponsibility #BanglaLiterature #enolej_idea #MohammadZahidHossain #MoralEducation #ProtectChildren #GenderEquality #SocialResponsibility
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।