ধার করা জীবন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ২৭ অক্টোবর ২০২৬
পরিবারের সবাই যখন একটি সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে মেনে নেয়, তখন একজন মানুষের পক্ষে উঠে দাঁড়িয়ে বলা কঠিন—সিদ্ধান্তটি ভুল। অফিসে সবাই যখন অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে চুপ থাকে, তখন প্রতিবাদ করতে যাওয়া মানুষটিকে বোকা মনে হতে পারে। বন্ধুরা যখন একই পথে হাঁটে, তখন নিজের পথ বেছে নেওয়ার আগে অনেকেই ভাবেন, শেষ পর্যন্ত একা হয়ে যাব না তো?
রাফি ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকতে ভালোবাসত। স্কুলের খাতার শেষ পাতায় সে বাড়ি আঁকত, নদী আঁকত, মানুষের মুখ আঁকত। বড় হয়ে চারুকলায় পড়ার ইচ্ছার কথা প্রথম যেদিন বাবাকে বলেছিল, বাবা হেসে বলেছিলেন, ‘শখের জায়গা শখেই থাক। জীবন চালাতে হয় বাস্তবতা বুঝে।’
কথাটা রাফির খারাপ লাগলেও সে তর্ক করেনি। বাবা সংসারের জন্য অনেক কষ্ট করেছেন। তাঁর কথার অবাধ্য হওয়াকে রাফি নিজের স্বপ্নের চেয়ে বড় অপরাধ বলে মনে করেছিল। মা বলেছিলেন, ‘তোর বাবা তোর ভালোই চান।’ আত্মীয়দের কেউ বলেছিলেন, ছবি এঁকে ভবিষ্যৎ হয় না। কেউ উদাহরণ দিয়েছিলেন পরিচিত এক ছেলের, যে পছন্দের বিষয় নিয়ে পড়ে এখন বেকার।
রাফি চারদিকে তাকিয়ে দেখল, সবাই একই কথা বলছে। তার মনে হলো, এত মানুষ নিশ্চয়ই ভুল হতে পারে না।
সে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ভর্তি হলো। পরে চাকরি পেল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। মাস শেষে বেতন আসে, সংসারে টাকা দেয়, ঈদের সময় পরিবারের জন্য কেনাকাটা করে। আত্মীয়দের কাছে সে এখন সফল ছেলে। বাবা পরিচিতদের বলেন, ‘আমার ছেলে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে।’
রাফি বাবার মুখে তৃপ্তি দেখে। তারও ভালো লাগে। শুধু মাঝেমধ্যে অফিস থেকে ফেরার পথে রং আর তুলির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। কাচের ওপাশে সাজানো রংগুলো দেখে তার মনে হয়, জীবনের কোনো একটা দরজা সে নিজেই বন্ধ করে এসেছে।
কিন্তু দরজাটা যে নিজের হাতে বন্ধ করেছে, এই কথাটা সে নিজেকে কখনো বলে না। বলে, পরিস্থিতি এমন ছিল। পরিবারকে হতাশ করা সম্ভব ছিল না। এখন আর নতুন করে শুরু করার বয়স নেই।
একদিন অফিসে পদোন্নতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। রাফির এক সহকর্মী অন্যায়ভাবে পদোন্নতি পেয়েছেন—এ কথা সবাই জানত। চায়ের টেবিলে সবাই অসন্তোষ প্রকাশ করল। রাফিও বলল, সিদ্ধান্তটি ঠিক হয়নি। কিন্তু আনুষ্ঠানিক বৈঠকে যখন মতামত জানতে চাওয়া হলো, তখন কেউ মুখ খুলল না। রাফিও না।
বৈঠক শেষে সে নিজেকে বোঝাল, একা প্রতিবাদ করে কী হবে? সবাই যখন চুপ, তখন নিশ্চয়ই চুপ থাকার পেছনে কোনো কারণ আছে।
কথাটা তার নিজের কাছেই পরিচিত মনে হলো। বহু বছর আগে বাবার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ইচ্ছা বলতে না পারার সময়ও সে এমনই একটি যুক্তি খুঁজেছিল। তখন পরিবার তার হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এখন অফিসে ভিড় তার হয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। দুটো পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য আছে, কিন্তু রাফির নীরবতার ভেতরে একই ভয় কাজ করছে—নিজের অবস্থান জানালে যদি আশ্রয় হারায়, যদি অন্যদের চোখে ভুল মানুষ হয়ে যায়?
মানুষ সব সময় জোর করে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে চালিত হয় না। অনেক সময় তাকে ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা, নিরাপত্তা আর গ্রহণযোগ্যতার বিনিময়ে আপস করতে শেখানো হয়। সেই আপসের প্রতিটি ধাপ আলাদা করে দেখলে অস্বাভাবিক কিছু মনে হয় না। বাবার কথা রাখা ভালো, পরিবারের চিন্তা করা ভালো, চাকরি ধরে রাখা ভালো, অকারণে বিরোধে না জড়ানোও ভালো। কিন্তু এসব ভালো কাজের মাঝখানে নিজের ইচ্ছা ও বিবেকের জন্য কোনো জায়গা অবশিষ্ট আছে কি না, সেই প্রশ্নটি আর করা হয় না।
এভাবেই অন্যের প্রত্যাশা ধীরে ধীরে নিজের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। একসময় মানুষ নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে এমন সব যুক্তি সাজায়, যেগুলো সে প্রথমে অন্যের মুখে শুনেছিল। পরে আর মনে থাকে না, কোন বিশ্বাসটি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে, আর কোনটি শুধু বহুবার শুনতে শুনতে সত্য বলে মেনে নিয়েছে।
তবে নিজের ইচ্ছাকে সব সময় সঠিক ভাবাও আত্মঅনুসন্ধান নয়। রাফি চারুকলায় পড়লে হয়তো তার জীবন সহজ হতো না। হয়তো অনেক বাধার মুখে পড়ত, হয়তো একসময় বুঝত, ছবি আঁকার প্রতি ভালোবাসা আর সেটাকে পেশা হিসেবে নেওয়া এক কথা নয়। প্রশ্নটা তাই এই নয় যে সে ভুল বিষয় নিয়ে পড়েছে কি না। প্রশ্ন হলো, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সে নিজের সম্ভাবনাকে যাচাই করার সুযোগ পেয়েছিল কি না, নাকি অন্যদের ভয়কে নিজের ভবিষ্যৎ বলে মেনে নিয়েছিল।
পরিবারের পরামর্শ মূল্যবান হতে পারে। অভিজ্ঞ মানুষের সতর্কতাও অগ্রাহ্য করার বিষয় নয়। কিন্তু পরামর্শ আর সিদ্ধান্ত এক জিনিস নয়। অন্যের অভিজ্ঞতা শুনে নিজের পথ বেছে নেওয়া এক রকম; অন্যের ভয়কে নিজের ইচ্ছার ওপর বসিয়ে দেওয়া আরেক রকম।
আমরা সন্তানদের নিরাপদ রাখতে চাই, প্রিয় মানুষদের হতাশ করতে চাই না, সমাজে সম্মান নিয়ে বাঁচতে চাই। এসব চাওয়া স্বাভাবিক। তবু কখনো কখনো কাউকে রক্ষা করতে গিয়ে তার হয়ে জীবন বেছে নিই। আবার সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস না পেয়ে মানুষ নিজেই নিজের স্বপ্নকে অযৌক্তিক প্রমাণ করতে থাকে। বাইরে থেকে তখন সব ঠিকঠাক দেখায়। সংসার চলে, চাকরি থাকে, সামাজিক পরিচয় তৈরি হয়। শুধু মানুষটি ক্রমশ ভুলে যায়, একসময় সে কী হতে চেয়েছিল।
রাফি এখনো ছবি আঁকে। রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে পুরোনো খাতাটা বের করে। আঁকা শেষ হলে খাতা বন্ধ করে আলমারিতে রেখে দেয়। পরদিন সকালে আবার সেই পরিচিত জীবনে ফিরে যায়। তার বাবা এখনো ছেলেকে নিয়ে গর্ব করেন। রাফিও বাবাকে ভালোবাসে। এই ভালোবাসার মধ্যে কোনো মিথ্যা নেই। তবু ভালোবাসা আর আত্মবিসর্জনের মাঝখানে যে সূক্ষ্ম সীমারেখা আছে, রাফি কোনো দিন সেটি চিনতে পেরেছিল কি না, তা সে নিজেও জানে না।
আমরা প্রায়ই বলি, নিজের জীবন নিজের মতো করে বাঁচতে হবে। কথাটা বলা সহজ, কারণ নিজের জীবন বেছে নেওয়ার সঙ্গে শুধু সাহস জড়িত নয়; জড়িত সম্পর্ক, দায়িত্ব, অনিশ্চয়তা আর হারানোর আশঙ্কাও। তাই অন্যের প্রত্যাশা মেনে চলা মানুষকে দুর্বল বলে বিচার করা সহজ হলেও তার ভেতরের দ্বন্দ্ব বোঝা কঠিন।
কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তের দায় অন্যের হাতে তুলে দিলে সেই দায় পুরোপুরি সরে যায় না। বরং একসময় নিজের জীবনকে অপরিচিত মনে হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। তখন মানুষ হয়তো সফল, সম্মানিত, সবার প্রিয়—তবু নিজের ভেতরে এমন একজনের সঙ্গে বাস করে, যার ইচ্ছার কথা সে বহু বছর ধরে শোনেনি।
ভিড় আমাকে পরিচয় দেয়। কিন্তু ভিড় সরে গেলে যে মানুষটা থাকে, তার পরিচয়টা আমি নিজে জানি তো?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।