এটা আমি জানি না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
৩১ অক্টোবর ২০২৬
একটি শিশু হাঁটতে শেখে পড়ে গিয়ে। কথা বলতে শেখে ভুল উচ্চারণ করে। প্রতিদিন তার সামনে নতুন কিছু আসে। একটি পিঁপড়া কীভাবে খাবার নিয়ে যায়, বৃষ্টির পানি কোথায় জমে, আকাশের রং সন্ধ্যায় বদলে যায় কেন, সবকিছু নিয়েই তার প্রশ্ন।
কেউ বিরক্ত হয়ে উত্তর দেয়, কেউ ধৈর্য ধরে বোঝায়। কিন্তু শিশুটি প্রশ্ন করা থামায় না। কারণ সে জানে না বলেই জানতে চায়।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের এই কৌতূহল কোথায় যেন হারিয়ে যায়। একসময় আমরা প্রশ্ন করার চেয়ে উত্তর দেওয়ায় বেশি আগ্রহী হয়ে উঠি। অন্যের কথা শোনার আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। নতুন কোনো মতামত শুনলে বোঝার চেষ্টা না করে নিজের জানা কথার সঙ্গে মিলিয়ে দেখি। মিল না পেলেই সেটিকে ভুল ভাবি।
সমস্যাটা জ্ঞানের অভাবে নয়, বরং নিজের জ্ঞান সম্পর্কে অতিরিক্ত নিশ্চয়তায়।
একজন মানুষ হয়তো ত্রিশ বছর ধরে একটি কাজ করছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা অনেক। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাই যদি তাঁকে নতুন পদ্ধতি শিখতে বাধা দেয়, তাহলে একসময় তাঁর দক্ষতা পুরোনো হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, নতুন কাজে আসা একজন তরুণ হয়তো এমন একটি উপায় জানেন, যা বহু বছরের অভিজ্ঞ মানুষটির চোখ এড়িয়ে গেছে। শেখার আগ্রহ থাকলে বয়সের ব্যবধান সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
পরিবারেও এই সমস্যা দেখা যায়। বাবা মনে করেন, তিনি জীবনের অনেক কিছু দেখেছেন, তাই সন্তানের সব সিদ্ধান্ত তাঁর চেয়ে ভালো কেউ বুঝতে পারবে না। সন্তান হয়তো নতুন সময়ের বাস্তবতা তুলে ধরতে চায়, কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার আগেই উত্তর আসে, “তোমরা এখনো জীবন দেখোনি।”
অথচ জীবন শুধু বয়স দিয়ে শেখায় না। সময় বদলায়, মানুষের প্রয়োজন বদলায়, সম্পর্কের ধরন বদলায়। বিশ বছর আগে যে সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল, আজকের পরিস্থিতিতে সেটি কার্যকর নাও হতে পারে। অভিজ্ঞতা তখনই মূল্যবান, যখন তার সঙ্গে নতুন কিছু গ্রহণ করার মানসিকতাও থাকে।
নিজের ভুল স্বীকার করাও শেখার একটি বড় অংশ। আমরা অনেক সময় ভুল বুঝতে পারলেও তা স্বীকার করতে চাই না। মনে করি, এতে সম্মান কমে যাবে। অথচ ভুল স্বীকার করলে মানুষ ছোট হয় না। বরং নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারার মধ্যেই তার পরিণত হওয়ার পরিচয় থাকে।
যে শিক্ষক শিক্ষার্থীর কাছ থেকেও নতুন কিছু শিখতে পারেন, যে বাবা সন্তানের কথা মন দিয়ে শোনেন, যে কর্মকর্তা অধস্তন কর্মীর পরামর্শ গ্রহণ করেন, তাঁরা কেউ নিজেদের মর্যাদা হারান না। বরং তাঁদের প্রতি অন্যদের আস্থা বাড়ে।
শেখার জন্য সব সময় বইয়ের প্রয়োজন হয় না। কখনো একটি ছোট শিশুর প্রশ্ন, কখনো বাসের সহযাত্রীর অভিজ্ঞতা, কখনো নিজের ব্যর্থতা, আবার কখনো বহুদিনের পরিচিত একজন মানুষের অপ্রত্যাশিত আচরণও নতুন কিছু শেখাতে পারে। শর্ত একটাই, নিজের জানার বাইরে আরেকটি জগৎ আছে, সেটি মেনে নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে।
মানুষের জীবন থেমে যায় একদিন, কিন্তু তার চিন্তার মৃত্যু অনেক আগেই শুরু হতে পারে। যখন সে মনে করে, তার আর কিছু জানার নেই, নতুন কিছু বোঝার নেই, তখন তার সামনে থাকা সম্ভাবনাগুলোও ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।
জ্ঞানী মানুষ সব প্রশ্নের উত্তর জানেন, এমন নয়। বরং তিনি জানেন, কোন প্রশ্নের উত্তর তাঁর জানা নেই। তাই তিনি শোনেন, পড়েন, ভাবেন এবং প্রয়োজন হলে নিজের পুরোনো ধারণাও বদলে ফেলেন।
মানুষের জন্ম শুধু পৃথিবীতে আসার মধ্য দিয়ে নয়, নতুন কিছু জানার আগ্রহের মধ্য দিয়েও প্রতিদিন ঘটে। আর শেখার ইচ্ছা হারিয়ে ফেললে বয়স বাড়তে থাকে ঠিকই, কিন্তু মনের দরজা আর খোলে না।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শেখার মতো কিছু না কিছু থেকে যায়। শুধু নিজের ভেতরে এই স্বীকারোক্তিটুকু বাঁচিয়ে রাখতে হয়:
“এটা আমি জানি না, আমাকে শেখাও।”
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।