অসহায়ত্ব!
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । ২০ মে, ২০২৬
“আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আমার মেয়েও আর ফিরে আসবে না। আপনাদের বিচারের কোনো উদাহরণ নেই। এটা বড়জোর ১৫ দিন চলবে, তারপর আবার কোনো নতুন ঘটনা ঘটবে। এরপর সব ধীরে ধীরে ধামাচাপা পড়ে যাবে।”
— নিহত রামিসার বাবা
এই কথাগুলো কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য না। এটা কোনো বিশ্লেষণও না। এটা এক ভেঙে যাওয়া মানুষের শেষ পর্যবেক্ষণ—যেখানে আশা আর দাবি দুটোই ক্লান্ত হয়ে গেছে।
একটা শিশু মারা গেলে আমরা সাধারণত দুটি জিনিস করি। প্রথমটা হলো শোক প্রকাশ। দ্বিতীয়টা হলো দ্রুত ভুলে যাওয়া। এই দুইয়ের মাঝখানে যে সময়টুকু থাকে, সেটাই শুধু আলোচনার জায়গা। তারপর ধীরে ধীরে ঘটনাটা আরেকটা “কেস ফাইল” হয়ে যায়।
কিন্তু যে পরিবারটা ভেতরে ভাঙে, তাদের কাছে এটা কোনো কেস ফাইল না। এটা জীবনের স্থায়ী ভাঙন। প্রতিদিনের নিঃশ্বাসের মধ্যে আটকে থাকা একটা শূন্যতা।
এখানেই প্রশ্নটা কঠিন হয়ে ওঠে—আমরা কি সত্যিই বিচার চাই, নাকি শুধু বিচার চাওয়ার অভিনয় করি?
কারণ বাস্তবতা খুব নিষ্ঠুরভাবে বারবার একই চিত্রনাট্য মঞ্চস্থ করে। একটা ঘটনা ঘটে। মিডিয়া উত্তেজিত হয়। সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ তৈরি হয়। কিছুদিন তদন্তের কথা বলা হয়। তারপর ধীরে ধীরে খবরের তীব্রতা কমে আসে। নতুন কোনো ইস্যু জায়গা নেয়। আগের ঘটনা পিছনে সরে যায়। আর পরিবারটা থেকে যায় সেই জায়গাতেই—যেখানে সময় থেমে গেছে।
এই চক্রটা এতবার ঘটেছে যে এখন অনেকেই আর বিস্মিত হয় না। তারা জানে কী হবে। তারা শুধু অপেক্ষা করে পরের শিরোনামের জন্য।
রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা এখানে শুধু প্রশাসনিক সমস্যা না। এটা আস্থার সংকট। যখন মানুষ দেখে যে অপরাধের বিচার দীর্ঘ হয়, কখনো কখনো অসম্পূর্ণ থাকে, তখন তার ভেতরে একটি ধারণা জন্ম নেয়—বিচার আসলে দূরের কোনো প্রক্রিয়া, বাস্তব কোনো নিশ্চয়তা না।
এই ধারণা সবচেয়ে বিপজ্জনক।
কারণ যখন বিচার বিশ্বাসযোগ্য থাকে না, তখন সমাজ ধীরে ধীরে প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। মানুষ আইনের ওপর আস্থা হারায়, এবং সেই শূন্য জায়গায় জন্ম নেয় অসহায়ত্ব, ক্ষোভ, আর কখনো কখনো প্রতিশোধের প্রবণতা।
কিন্তু এই লেখাটা প্রতিশোধের না। এটা আরও কঠিন কিছু—একটা ভাঙা বিশ্বাসের স্বীকারোক্তি।
আমরা প্রায়ই বলি, “কঠোর বিচার চাই।” কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই বিচার কি সত্যিই কার্যকর হয়, নাকি শুধু নথির পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে? অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তদন্ত দীর্ঘ হয়, সাক্ষ্য হারিয়ে যায়, প্রক্রিয়া ধীর হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনমতের চাপও কমে যায়। আর তখন ন্যায়বিচারের জায়গা দখল করে নেয় বিস্মৃতি।
এটা শুধু আইনগত সমস্যা না। এটা সামাজিক অভ্যাসও। আমরা খুব দ্রুত ভুলে যেতে শিখে গেছি।
একটা শিশু হারানোর পর যে প্রশ্নগুলো ওঠা উচিত ছিল—সেগুলোও আমরা দীর্ঘদিন ধরে আর করি না। পরিবার কীভাবে নিরাপদ ছিল না? প্রতিবেশী কাঠামো কেন কাজ করেনি? কোথায় ছিল প্রাথমিক প্রতিরোধ?
এই প্রশ্নগুলোর বদলে আমরা শুধু শেষ দৃশ্যটা নিয়ে কথা বলি। অপরাধ, গ্রেফতার, শাস্তি। কিন্তু প্রক্রিয়াটা কোথায় ভেঙে গেছে, সেটা নিয়ে আলোচনা খুব কম হয়।
ফলে প্রতিবার একই গল্প ফিরে আসে, শুধু চরিত্র বদলায়।
এখানে আরেকটা অস্বস্তিকর সত্য আছে। সমাজ এখন শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে খুব কাঠামোগতভাবে চিন্তা করে না। অনেক পরিবার এখনো মনে করে “এমন কিছু আমাদের সঙ্গে হবে না।” এই ধারণা বিপজ্জনকভাবে স্বস্তিদায়ক। কারণ বাস্তবতা তা বলে না।
শিশুরা তাদের নিরাপত্তা বোঝে না শব্দে, বোঝে অভ্যাসে। তারা শেখে কাকে বিশ্বাস করতে হবে, কাকে নয়—এই শিক্ষা কথায় না, আচরণে আসে। কিন্তু আমরা অনেক সময় এই শিক্ষাটাকে গুরুত্ব দিই না, যতক্ষণ না দেরি হয়ে যায়।
স্কুলগুলোতেও নিরাপত্তা বিষয়টা প্রায়ই আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে আটকে থাকে। পরীক্ষার ফলাফল, ভর্তি প্রতিযোগিতা, সিলেবাস—সবকিছু আছে। কিন্তু শিশুদের মানসিক নিরাপত্তা, ঝুঁকি বোঝার সক্ষমতা, বা বিপদে কী করতে হবে—এই বাস্তব বিষয়গুলো অনেক সময় অনুপস্থিত।
এবং এই শূন্যতাই সমাজের দুর্বল জায়গা তৈরি করে।
এখানে কোনো সহজ সমাধান নেই। এটা এমন কোনো সমস্যা না যেটা এক আইন বা এক উদ্যোগে ঠিক হয়ে যাবে। এটা ধীরে গড়ে ওঠা সংস্কৃতির সমস্যা।
কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়তো আইন না, সমাজের অভ্যস্ততা। আমরা খারাপ খবরের সঙ্গে বাঁচতে শিখে গেছি। প্রথমে ধাক্কা লাগে, তারপর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করে।
এই স্বাভাবিক হয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
কারণ যখন ভয়ংকর ঘটনাও স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই লেখার শুরুটা ছিল এক ধরনের অসহায়ত্ব দিয়ে। সেই অসহায়ত্বই শেষেও থেকে যায়। কিন্তু তার ভেতরেই একটা অস্বস্তিকর সত্য লুকিয়ে আছে—যতক্ষণ না এই চক্রটাকে আমরা শুধু “ঘটনা” না ভেবে “ব্যবস্থা” হিসেবে দেখি, ততক্ষণ পরিবর্তন সম্ভবত খুব দূরের বিষয়ই থেকে যাবে।
আমরা কি সত্যিই বিচার চাই, নাকি বিচার না পাওয়ার অসহায়ত্বকেই নিয়তি মেনে নিয়েছি?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।