এক দেশের দুই চেহারা
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ডিসেম্বর ২৬, ২০২৫
একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি—এই দেশে মানুষ হওয়ার যোগ্যতা কি এখনো টাকার দামে মাপা হয়? নাকি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলেই মানুষ,
বাকিরা কেবল সংখ্যামাত্র?
সরকারি হাসপাতালের ভেতরে ঢুকলে এই প্রশ্নটা আর তাত্ত্বিক থাকে না, বাস্তব হয়ে সামনে দাঁড়ায়। মেঝেতে শুয়ে থাকা রোগী, করিডোরে স্ট্রেচার, এক বিছানায় দুই–তিনজন মানুষ, স্বজনদের অসহায় চোখ—এই দৃশ্যগুলো দেখে বারবার মনে হয়, এরা কি মানুষ নয়?
মানুষ হলে কি তাদের জন্য অন্তত একটা বিছানা থাকত না? অথচ একই রাষ্ট্রে, একই বাজেটের ভেতরে, কিছু সরকারি কর্মকর্তা আর আমলাদের জন্য রয়েছে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ব্যক্তিগত গাড়ি, বড় বড় বাংলো বাড়ি। দুই বাস্তবতা, এক দেশ। এই বৈপরীত্য কেবল চোখে লাগে না, বিবেককে আঘাত করে।
এটা শুধু অব্যবস্থাপনার গল্প নয়। এটা নীতিগত বৈষম্যের গল্প। এখানে প্রশ্নটা “ব্যবস্থা নেই” নয়, প্রশ্নটা “কার জন্য ব্যবস্থা আছে”। দরিদ্র মানুষের অসুখকে যেখানে সহনীয় মনে করা হয়, সেখানে ক্ষমতাবানদের সামান্য অস্বস্তিও রাষ্ট্রের বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এই মানসিকতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে ভয়ংকর অন্যায়—মানুষকে মানুষ হিসেবে না দেখা।
আমরা প্রায়ই বলি, “দেশ গরিব।” কিন্তু সত্যটা হলো—দেশ গরিব নয়, অগ্রাধিকার গরিব। টাকা আছে, কিন্তু সেই টাকার পথ ঠিক করা নেই। হাসপাতালের জন্য বিছানা নেই—এই কথাটা পুরো সত্য নয়। বিছানা আছে, কিন্তু তা সবার জন্য নয়। প্রশ্নটা তাই খুব সোজা—রাষ্ট্র কাকে আগে রাখছে?
অসুস্থ দরিদ্র মানুষকে, নাকি ক্ষমতার ছায়ায় থাকা আরামপ্রিয়দের?
এই জায়গায় এসে প্রশ্ন ওঠে—
এই বৈষম্য কবে দূর হবে?
কে দূর করবে?
আমরা সহজ উত্তর খুঁজি। বলি, “সিস্টেম খারাপ।” কিন্তু সিস্টেম কোনো অদৃশ্য শক্তি নয়। সিস্টেম বানায় মানুষ। সিদ্ধান্ত নেয় মানুষ। বাজেট পাশ করে মানুষ।
তাহলে দায়টা কার?
শুধু আমলাদের?
শুধু রাজনীতিবিদদের?
নাকি আমাদেরও—যারা এই বৈষম্য দেখেও চুপ করে থাকি, কারণ এটা সরাসরি আমাদের ঘরে ঢোকেনি?
২০২৪ সালের কথা কি আমরা ভুলে গেছি? পিচঢালা কালো রাজপথে ঝরে পড়া রক্ত, বুক চিরে ওঠা স্লোগান, চোখভরা স্বপ্ন আর ক্ষোভ—সব কি এত দ্রুত মুছে গেছে?
সেই রক্ত কি কেবল ক্ষমতার চেয়ার বদলানোর জন্য ঝরেছিল?
নাকি ঝরেছিল এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে?
যদি বৈষম্যের বিরুদ্ধেই হয়ে থাকে, তাহলে আজ কেন একই দৃশ্য ফিরে ফিরে আসে, শুধু মুখ আর পোস্টার বদলায়?
এইখানেই প্রশ্নটা সবচেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়—তবে কি এত আত্মত্যাগ ব্যর্থ হলো?
এই প্রশ্নটা শুনতে নিষ্ঠুর লাগতে পারে, কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আত্মত্যাগ তখনই অর্থ পায়, যখন তার ফল সাধারণ মানুষের জীবনে দৃশ্যমান হয়। যদি একজন দরিদ্র মানুষ আজও চিকিৎসা না পেয়ে মারা যায়, যদি তার অসুস্থ মা হাসপাতালের মেঝেতে রাত কাটায়, তাহলে সব উন্নয়নের গল্প কেবল শব্দের সাজ।
আমরা উন্নয়নের ছবি দেখি—ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, ঝকঝকে ভবন। কিন্তু উন্নয়ন কি কেবল কংক্রিট আর আলো?
উন্নয়ন কি মানুষের কষ্ট কমায় না?
যদি না কমায়, তাহলে সেটা উন্নয়ন নয়, সেটা প্রদর্শনী। আর যখন সেই প্রদর্শনীর আড়ালে মানুষের মৌলিক অধিকার চাপা পড়ে যায়, তখন সেটা অপরাধে পরিণত হয়।
অনেকে যুক্তি দেন—“সব দেশেই এমন হয়।”
না, সব দেশেই এমন হয় না। যেসব দেশে নাগরিকের জীবন সত্যিই মূল্যবান, সেখানে ক্ষমতাবানদের সুবিধা কমিয়ে হলেও সাধারণ মানুষের সেবা নিশ্চিত করা হয়। সেখানে রাষ্ট্র নাগরিককে বোঝা হিসেবে নয়, সম্পদ হিসেবে দেখে। সেখানে হাসপাতালের বিছানা কোনো বিশেষ পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে না।
আমাদের সমস্যাটা টাকার নয়, মানসিকতার। আমরা এখনো “ভিআইপি” আর “সাধারণ” এই বিভাজনকে স্বাভাবিক মনে করি। যতদিন এই মানসিকতা থাকবে, ততদিন রক্ত ঝরবে, শিরোনাম বদলাবে, কিন্তু বাস্তবতা বদলাবে না।
এই লেখা কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে নয়। এটা একটা প্রশ্ন, একটা আয়না। এই আয়নায় আমরা যদি নিজেদের মুখ দেখতে না চাই, তাহলে দায় অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে লাভ নেই। কারণ রাষ্ট্র বদলায় তখনই, যখন নাগরিক বদলায়।
শেষ প্রশ্নটা তাই আবার আপনাকেই করি—
কে দেবে এর জবাব?
সরকার একা?
নাকি আমরা সবাই, যারা নীরব থেকে এই বৈষম্যকে স্বাভাবিক করে তুলেছি?
পরিবর্তন শুরু হবে সেদিন, যেদিন হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে থাকা মানুষটাকে নিজের মানুষ ভাববে। যেদিন শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ দেখে গর্ব নয়, লজ্জা অনুভব করব। কারণ এক দেশের দুই চেহারা থাকার কথা নয়—দেশ একটাই, আর মানুষের মূল্যও একটাই হওয়া উচিত।
এই লেখা যদি আপনার ভেতরের ক্ষোভ আর প্রশ্নগুলোকে ভাষা দিয়ে থাকে, তাহলে চুপ থাকবেন না—শেয়ার করুন।
নীরবতাই আজকের সবচেয়ে বড় অপরাধ।
#এক_দেশের_দুই_চেহারা
#বৈষম্য
#মানুষ_আগে
#স্বাস্থ্য_অধিকার
#রাষ্ট্র_ও_নাগরিক
#২০২৪
#রক্তের_জবাব
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।