সময়ের দাস
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী সামাজিক প্রবন্ধ
১৩ জুলাই, ২০২৬
প্রযুক্তি আমাদের সময় বাঁচানোর কথা ছিল। অথচ এখন সময়টাই যেন সে কেড়ে নিচ্ছে।
একসময় মানুষ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখত। এখন সময় নিজেই আমাদের মোবাইলের পর্দায় বন্দি হয়ে গেছে।
সকালে ঘুম ভাঙার পর হাতে প্রথমে উঠে আসে মোবাইল। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগেও শেষবার চোখ পড়ে ওই পর্দায়। মাঝখানের পুরো দিনটা কখন যে নোটিফিকেশন, ভিডিও, রিল আর অবিরাম স্ক্রলের ভেতর হারিয়ে যায়, অনেক সময় টেরই পাই না।
প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করেছে, তাতে সন্দেহ নেই। দূরের মানুষকে কাছে এনেছে, কাজের গতি বাড়িয়েছে, তথ্যকে হাতের মুঠোয় তুলে দিয়েছে। কিন্তু সেই সঙ্গে একটা প্রশ্নও সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে— আমরা কি প্রযুক্তি ব্যবহার করছি, নাকি প্রযুক্তিই আমাদের ব্যবহার করছে?
প্রশ্নটা যত সহজ, উত্তর তত সহজ নয়।
অনেকে বলেন, “আজ ভীষণ ব্যস্ত ছিলাম।” অথচ দিনের শেষে হিসাব করলে দেখা যায়, কয়েক ঘণ্টা নিঃশব্দে মোবাইলের পর্দায় কেটে গেছে। পাঁচ মিনিটের জন্য ফোন হাতে নিয়েছিলাম। তারপর এক ভিডিও থেকে আরেক ভিডিও, এক পোস্ট থেকে আরেক পোস্ট। কখন এক ঘণ্টা গড়িয়ে গেল, টের পেলাম না।
সময়ের সবচেয়ে বড় অপচয়গুলো এভাবেই নীরবে ঘটে।
এর প্রভাব শুধু কাজে পড়ে না। পড়ে সম্পর্কে।
একই ঘরে চারজন মানুষ বসে আছি, কিন্তু চারজনের চোখ চারটা আলাদা পর্দায়। কথা কমে যাচ্ছে। একসঙ্গে বসেও একসঙ্গে থাকা হচ্ছে না। পরিবারের জন্য বরাদ্দ সময়টুকুও নোটিফিকেশনের কাছে হেরে যাচ্ছে।
শিশু বাবা-মায়ের মনোযোগ চায়। বৃদ্ধ বাবা-মা দুটো কথা বলতে চান। বন্ধু মন খুলে কিছু বলতে চায়। অথচ আমরা বলি, “একটু দাঁড়াও”, “এই পোস্টটা শেষ করি”, “এই মেসেজটার উত্তর দিয়ে নিই।”
সেই ‘একটু’ কখন যে অনেক বড় দূরত্ব তৈরি করে দেয়, সেটা বুঝতে বুঝতেই দেরি হয়ে যায়।
মোবাইল নিজে কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন সেটি আমাদের সময়ের মালিক হয়ে বসে। আমরা নিজেরাই ঠিক করতে পারি না, কখন ফোনটা নামিয়ে রাখব। নোটিফিকেশনের টুং শব্দ মনোযোগ কেড়ে নেয়। কিছুক্ষণ ফোন না দেখলেই অস্থির লাগে। মনে হয়, এই কয়েক মিনিটেই পৃথিবীর সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে যাবে।
এটা আর শুধু অভ্যাস নয়, ধীরে ধীরে নির্ভরতায় রূপ নিচ্ছে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয় সময় ব্যবস্থাপনায়। জরুরি কাজ পিছিয়ে যায়। বই পড়া হয় না। পরিবারের সঙ্গে আড্ডা হয় না। নিজের জন্যও সময় থাকে না। অথচ দিনশেষে মনে হয়, “আজ সারাদিন করলামটা কী?”
হয়তো সত্যিটা হলো, আমরা সময়ের অভাবে ভুগছি না। ভুগছি মনোযোগের অভাবে।
তাহলে উপায় কী?
প্রযুক্তি ছেড়ে দেওয়া নয়। বরং প্রযুক্তিকে তার সঠিক জায়গায় রাখা। খাবার টেবিলে ফোন দূরে রাখা, ঘুমের আগে কিছুটা সময় পর্দা ছাড়া থাকা, প্রিয়জনদের সঙ্গে কথা বলার সময় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, কিংবা প্রতিদিন নিজের স্ক্রিন টাইমটা একবার দেখে নেওয়া— এই ছোট অভ্যাসগুলোই বড় বদল আনতে পারে।
প্রযুক্তি আমাদের সহায়ক হওয়ার কথা, শাসক নয়। আমরা যদি নিজের সময়ের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাই, তাহলে সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তিও আমাদের সত্যিকার অর্থে উন্নত করতে পারবে না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা প্রযুক্তির নয়, আমাদের সচেতনতার।
কারণ সময় এমন এক সম্পদ, যা একবার গেলে আর ফেরে না। আর সেই সময় যদি অজান্তেই একটি ছোট্ট পর্দার কাছে হারিয়ে ফেলি, তাহলে একদিন হয়তো বুঝব— আমরা শুধু সময় নয়, অনেক মূল্যবান সম্পর্কও হারিয়েছি।
আপনার মনে হয়, প্রতিদিন মোবাইলে আপনার কত ঘণ্টা কাটে? মন্তব্যে জানাতে পারেন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।