অপ্রতিমকে কি বাঁচানো যেত?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আমার ছোট্ট বুদ্ধিতে একটা প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—অপ্রতিম যখন নিখোঁজ হলো, তখনই যদি তাকে খুঁজে বের করার জন্য সর্বোচ্চ তৎপরতা দেখানো হতো, তাহলে কি আজ ছেলেটাকে এভাবে হারাতে হতো?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। কখন তার মৃত্যু হয়েছে, নিখোঁজ হওয়ার পর ঠিক কী ঘটেছিল, কিংবা কোন পর্যায়ে তাকে উদ্ধার করা সম্ভব ছিল—এসব তদন্তেই পরিষ্কার হবে।
তবু প্রশ্নটা থেকে যায়।
অপ্রতিম যখন জীবিত ছিল, তখন তাকে খুঁজে বের করার জন্য রাষ্ট্র কতটা সক্রিয় ছিল?
১৮ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩টার দিকে ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিম কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল। এরপর সে আর বাড়ি ফেরেনি। পরিবার খোঁজ শুরু করে। পরে সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। রাতে তার মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেলেকে খুঁজে পেতে মানুষের সহযোগিতা চান।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত অপ্রতিমের ফোনের অবস্থান কুমিল্লার গন্ধমতী এলাকায় শনাক্ত করা যাচ্ছিল। এরপর ফোনটির আর কোনো অবস্থান পাওয়া যায়নি।
পরদিন দুপুরে কোটবাড়ি এলাকার একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত করছে পুলিশ।
এই সময়ের মাঝখানেই রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ঘণ্টা।
অবশ্যই ফোনের অবস্থান মানেই শিশুটির সঠিক অবস্থান নয়। ফোন অন্য কারও কাছে থাকতে পারে, সরিয়ে নেওয়া হতে পারে, কিংবা কোনো পর্যায়ে তার অবস্থান শনাক্ত করা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাও আছে।
কিন্তু একটি শিশু নিখোঁজ। তার সঙ্গে থাকা ফোনের অবস্থান একটি নির্দিষ্ট এলাকা পর্যন্ত শনাক্ত করা যাচ্ছে। সেই তথ্যটি একজন জীবিত শিশুকে খুঁজে বের করার কাজে কত দ্রুত এবং কতটা গুরুত্ব দিয়ে ব্যবহার করা হয়েছিল—এই প্রশ্নটি তাই অস্বাভাবিক নয়।
এখানেই অপ্রতিমের ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি।
কখন নিখোঁজের খবর পাওয়া গেল, কখন পুলিশ তৎপর হলো, ফোনের অবস্থান পাওয়ার পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হলো, কোন কোন এলাকায় তল্লাশি চালানো হলো এবং রাতের মধ্যে কী কী অনুসন্ধান করা হয়েছিল—এই সময়রেখা জনসমক্ষে পরিষ্কার হওয়া দরকার।
কারও বিরুদ্ধে আগেভাগে অভিযোগ তোলার জন্য নয়। বরং ভবিষ্যতে আরেকটি শিশুকে বাঁচানোর জন্য।
পাঁচটি প্রশ্নের হিসাব দরকার
অপ্রতিমের ঘটনার পূর্ণ তদন্তের পাশাপাশি অন্তত পাঁচটি বিষয়ের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।
প্রথমত, নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর পুলিশ কখন আনুষ্ঠানিকভাবে তৎপর হয়?
দ্বিতীয়ত, সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত ফোনের অবস্থান গন্ধমতীতে শনাক্ত হওয়ার পর সেখানে কী ধরনের তল্লাশি চালানো হয়েছিল?
তৃতীয়ত, আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ কত দ্রুত সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করা হয়েছিল?
চতুর্থত, অপ্রতিমের সম্ভাব্য চলাচলের পথ, নির্জন স্থান ও আশপাশের এলাকাগুলোতে রাতেই কতটা অনুসন্ধান চালানো হয়েছিল?
পঞ্চমত, কোন তথ্য কখন পুলিশের হাতে এসেছে এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে কত সময় লেগেছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া গেলে বোঝা যাবে, কোথাও সময়ের ঘাটতি ছিল কি না, নাকি পরিস্থিতির সীমাবদ্ধতার মধ্যেই পুলিশ কাজ করেছে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য।
কারণ পরে কী ঘটেছে, তা দেখে আগের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে বিচার করা সহজ। কিন্তু একজন শিশু নিখোঁজ হওয়ার মুহূর্তে হাতে থাকা তথ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছিল কি না—সেটিই আসল প্রশ্ন।
পুলিশ পরে তদন্তে প্রযুক্তি ও অন্যান্য সূত্র ব্যবহার করেছে। সন্দেহভাজনদের আটক করা হয়েছে এবং অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তাহলে স্বাভাবিকভাবেই জানতে হয়—নিখোঁজ হওয়ার পরের গুরুত্বপূর্ণ সময়টিতেও কি একই মাত্রার তৎপরতা সম্ভব ছিল?
এর উত্তর তদন্ত থেকেই আসা উচিত।
অপ্রতিমের ঘটনা আমাদের আরেকটি বিষয় ভাবায়। একজন মানুষ নিখোঁজ হলে পরিবারের ওপর যে মানসিক চাপ তৈরি হয়, তা শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত সংকট নয়। সেই মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতিটি পদক্ষেপের গুরুত্ব বেড়ে যায়।
একজন মা তখন কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য চান না। কোনো বড় আশ্বাসও চান না।
তিনি শুধু চান, তাঁর সন্তানকে খুঁজে দেওয়া হোক।
তিনি চান, ফোনের শেষ অবস্থানটি খুঁজে দেখা হোক। আশপাশের ক্যামেরাগুলো দেখা হোক। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কথা বলা হোক। সম্ভাব্য প্রতিটি জায়গায় দ্রুত খোঁজ নেওয়া হোক।
সবচেয়ে বড় কথা, তিনি চান—সন্তানটি যেন জীবিত ফিরে আসে।
এখানেই আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সাফল্যকে শুধু অপরাধী শনাক্ত বা গ্রেপ্তারের সংখ্যায় দেখলে পুরো ছবিটা পাওয়া যায় না।
একটি নিখোঁজ শিশুকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা গেলে সেটি একই সঙ্গে একটি সম্ভাব্য অপরাধ প্রতিরোধ এবং একটি পরিবারের জীবন রক্ষা।
অপ্রতিমের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ ছিল কি না, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। কিন্তু সেই সুযোগ থাকলে তা কোথায় ছিল, কেন কাজে লাগানো গেল না, কিংবা আদৌ এমন সুযোগ ছিল কি না—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বের করা জরুরি।
অপ্রতিম আর ফিরে আসবে না।
তার পরিবার হয়তো তদন্তের অগ্রগতি শুনবে। সন্দেহভাজনদের আটকের খবর শুনবে। বিচারপ্রক্রিয়ার অপেক্ষায় থাকবে।
কিন্তু একজন মা যে কথাটি শুনতে চেয়েছিলেন, সেটি আর কোনো দিন শোনা হবে না—
“আপনার ছেলে পাওয়া গেছে। সে বেঁচে আছে।”
এই একটি বাক্যের মূল্য কোনো তদন্তের পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না।
তাই অপ্রতিমের মৃত্যুর বিচার যেমন দরকার, তেমনি দরকার তার নিখোঁজ হওয়ার পরের সময়েরও হিসাব।
কখন খবর পাওয়া গেল, কখন অনুসন্ধান শুরু হলো, কী তথ্য হাতে ছিল, সেই তথ্যের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হলো—সবকিছু পরিষ্কার হওয়া দরকার।
কাউকে আগেভাগে দায়ী করার জন্য নয়।
বরং পরের অপ্রতিমকে বাঁচানোর জন্য।
কারণ একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুধু পরে অপরাধের রহস্য উদ্ঘাটন করা নয়।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো—বিপদে পড়া মানুষটিকে তার আগেই ফিরিয়ে আনা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।