যে শূন্যতা ভেতরে আলো জ্বালে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ২৪ আগস্ট ২০২৬
“নিশ্চুপের ধু-ধু মাঠে
অকস্মাৎ শূন্যতাই,
আলোময় শূন্যতায় কী কী আছে
তার হিসেব কি সহজ হয়?”
শূন্যতা শব্দটা শুনলেই প্রথমে মনে হয়—কিছু একটা নেই। একজন মানুষ নেই, একটা সম্পর্ক নেই, কোনো শব্দ নেই, অপেক্ষা নেই। যেন চারপাশ থেকে সবকিছু সরে গিয়ে শুধু ফাঁকা জায়গাটা পড়ে আছে।
কিন্তু সব ফাঁকা জায়গা কি সত্যিই ফাঁকা?
কখনো গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায়। ঘর অন্ধকার। পাশের বালিশটা খালি। টেবিলের ওপর ফোনটা পড়ে আছে, কিন্তু কাউকে ফোন করার ইচ্ছে নেই। বাইরে দিয়ে একটা গাড়ি চলে গেল। কিছুক্ষণ তার শব্দ শোনা গেল, তারপর আবার নীরবতা।
ঘরটা তখন অদ্ভুত ফাঁকা লাগে।
অথচ সেই খালি বালিশের দিকে তাকালেই কারও মুখ মনে পড়ে। আলমারি খুললে পুরোনো একটা জামার ভাঁজে আটকে থাকা গন্ধ হঠাৎ কোনো একটা দিনকে ফিরিয়ে আনে। ফোনের পর্দায় বহুদিনের পুরোনো একটা নাম চোখে পড়লে আঙুল থেমে যায়।
মানুষটা নেই। কিন্তু তার অনুপস্থিতিও তো একেবারে অনুপস্থিত নয়।
সে অন্যভাবে থেকে গেছে।
একটা চেয়ার খালি হয়ে গেলে শুধু একটা চেয়ার খালি হয় না। তার সঙ্গে একটা বসার অভ্যাস চলে যায়। রান্নাঘরের একটা কাপ আর কেউ ব্যবহার না করলে শুধু কাপটা পড়ে থাকে না; তার সঙ্গে একটা সকাল, একটা ডাক, হয়তো দুজন মানুষের খুব সাধারণ কোনো কথোপকথনও ধীরে ধীরে স্মৃতির অংশ হয়ে যায়।
আমরা মানুষের উপস্থিতি সহজে বুঝতে পারি। সে সামনে থাকলে তাকে দেখা যায়, তার সঙ্গে কথা বলা যায়, তার ওপর রাগ করা যায়। কিন্তু কেউ চলে গেলে তার অস্তিত্ব মুছে যায় না। শুধু তাকে আর ছুঁতে পারি না।
এই জায়গাটাতেই শূন্যতার রহস্য।
সব শূন্যতা অন্ধকার নয়।
কিছু শূন্যতার ভেতরে আলো থাকে।
সেই আলো খুব উজ্জ্বল কিছু নয়। কখনো একটা স্মৃতি, কখনো কোনো অসমাপ্ত ভালোবাসা, কখনো এমন একটা সম্ভাবনা, যা পূর্ণ হওয়ার আগেই থেমে গেছে। আবার কখনো সেই আলো আসে নিজের ভেতর থেকে।
ভিড়ের মধ্যে নিজের কথা শোনা যায় না। চারপাশে সবাই কিছু না কিছু বলে—কী করা উচিত, কাকে ক্ষমা করতে হবে, কোথায় থাকতে হবে, কখন চলে আসতে হবে। এত কথার মধ্যে নিজের মনটা কী বলছে, সেটাই আর শোনা হয়ে ওঠে না।
শূন্যতা সেই সুযোগটা দেয়।
প্রথমে ভালো লাগে না। নীরবতা বড় হয়ে ওঠে। নিজের ঘড়ির শব্দও যেন কানে আসে। পুরোনো কথাগুলো মনে পড়ে। তারপর একসময় নীরবতাটা আর ততটা অপরিচিত লাগে না।
নিজের কাছে তখন খুব বেশি প্রশ্ন থাকে না।
শুধু মনে হয়—আমি কি সত্যিই এই জীবনটাই চেয়েছিলাম?
কোথায় গিয়ে নিজেকে এতটা হারিয়ে ফেলেছিলাম?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সবসময় স্বস্তির নয়। অন্যের ভুল মনে রাখা যত সহজ, নিজের ভুল স্বীকার করা তত কঠিন।
কখনো বুঝতে হয়, যাকে হারিয়ে এতদিন কষ্ট পেয়েছি, তাকে হারানোই হয়তো দরকার ছিল।
কখনো বুঝতে হয়, যে সম্পর্কটাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ধরে রাখতে চেয়েছি, সেটি হয়তো অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। শুধু আমি সেটা মানতে চাইনি।
আর কখনো নিজের দিকেও তাকাতে হয়। সব শূন্যতার জন্য অন্য কাউকে দায়ী করা যায় না। কিছু শূন্যতা তৈরি হয় আমাদেরই সিদ্ধান্তে, আমাদের নীরবতায়, সময়মতো বলা হয়নি এমন কয়েকটি কথায়।
সেখানেই শূন্যতা দুঃখের বাইরে গিয়ে অন্য অর্থ পায়।
সেটা হয়ে ওঠে নিজের সঙ্গে বসার জায়গা।
আমাদের একটা অভ্যাস আছে—কোনো ফাঁকা জায়গা আমরা সহ্য করতে পারি না। সম্পর্ক শেষ হলে নতুন সম্পর্ক চাই। একা থাকলে সবাই জানতে চায়, “কেউ নেই?” কোনো ব্যর্থতা এলে তার ওপর দ্রুত আরেকটা সাফল্যের গল্প চাপিয়ে দিতে চাই।
যেন ফাঁকা থাকাটাই অপরাধ।
কিন্তু মনের সব ঘর সঙ্গে সঙ্গে নতুন আসবাব দিয়ে সাজাতে নেই।
বাড়ির দেয়ালে ফাটল ধরলে তার ওপর ছবি টাঙিয়ে দিলে বাইরে থেকে সুন্দর দেখাতে পারে। কিন্তু দেয়ালের ভেতরের ফাটলটা থেকে যায়। মানুষের মনও তেমন। নতুন মানুষ, নতুন ব্যস্ততা, নতুন সম্পর্ক দিয়ে পুরোনো কষ্টকে কিছুদিন ভুলে থাকা যায়; তাকে সেরে ফেলা যায় না।
তাই কিছু সময় একা থাকতে হয়।
কাঁদতে হলে কাঁদতে হয়। নিজের ওপর রাগ থাকলে সেটাও স্বীকার করতে হয়। যে ভুলগুলো করেছি, সেগুলো নিয়ে সারাজীবন নিজের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকলে কোনো লাভ নেই। একসময় নিজেকেও ক্ষমা করতে হয়।
তারপর খুব অল্প অল্প করে বদল আসে।
একদিন যে গান শুনলে বুকটা ভার হয়ে যেত, সেটাই আর তেমন কিছু করে না। পুরোনো কোনো নাম চোখে পড়লেও ফোন করার তাড়া থাকে না। কোনো এক বিকেলে সেই পরিচিত রাস্তায় দাঁড়িয়ে মনে হয়—এখান দিয়ে একদিন অনেক দূর গিয়েছিলাম।
ব্যস, ওইটুকুই।
সেরে ওঠার সবচেয়ে সত্যিকারের মুহূর্তগুলো বোধহয় এমনই। কোনো ঘোষণা নেই। কেউ জানে না। শুধু একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, আমি ঠিক আছি।
কথাটা শুনতে খুব সাধারণ। কিন্তু যে মানুষটি দীর্ঘদিন নিজের ভেতরে যুদ্ধ করেছে, তার কাছে এই ছোট্ট বাক্যের ওজন অনেক।
কারণ তখন সে হারানো কাউকে ফিরে পায়নি।
নিজেকেই ফিরে পেয়েছে।
তাই “আলোময় শূন্যতায় কী কী আছে”—তার হিসেব সহজ হওয়ার কথা নয়।
সেখানে স্মৃতি আছে, আবার স্মৃতি থেকে বেরিয়ে আসার শক্তিও আছে। কষ্ট আছে, আবার সেই কষ্ট থেকে শেখা কিছু কথাও আছে। একাকিত্ব আছে, কিন্তু সেই একাকিত্বের মধ্যেই নিজের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সময় আছে।
হয়তো জীবনের সব শূন্যতা ভরাট করার দরকার নেই।
কিছু চেয়ার খালি থাকুক। কিছু নাম আর ফিরে না আসুক। কিছু দরজা বন্ধই থাক। কিছু প্রশ্নের উত্তর না মিললেও ক্ষতি নেই।
শুধু একদিন সেই ফাঁকা জায়গাটার দিকে তাকিয়ে যেন মনে হয়—
এখানে যা নেই, তার জন্য আমি আর অপেক্ষা করছি না।
কারণ এই না-থাকার ভেতরেই এমন কিছু পেয়েছি, যা ভিড়ের মধ্যে কোনোদিন খুঁজে পাইনি।
নিজেকে।
তখন হয়তো বোঝা যায়, শূন্যতা সবকিছু কেড়ে নেয় না।
কিছু শূন্যতা শুধু চারপাশটা ফাঁকা করে দেয়, যাতে মানুষ প্রথমবার নিজের ভেতরের আলোটা দেখতে পারে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।