মানুষ জন্মগতভাবে আলো ও আঁধারের মিশেল। তার ভেতরে যেমন ভালোবাসা আছে, তেমনি আছে ঘৃণা; যেমন সহানুভূতি আছে, তেমনি আছে হিংসা। মানব-মনোজগতের এই অন্ধকারতম দিকটির নামই হলো হিংসা।
অপরের সাফল্য দেখে নিজের বুকের ভেতর আগুন জ্বলে ওঠা, কারও উন্নতি সহ্য না করা, অন্তরে অন্তরে তার পতন কামনা করা—এসবই হিংসার লক্ষণ। বাইরে থেকে ভদ্রতা দেখালেও ভেতরে ভেতরে হিংসুক মানুষ প্রতিদিন নিজের হৃদয়টাকেই ক্ষতবিক্ষত করে।
হিংসা হলো আত্মার ব্যাধি। যতদিন মানুষ বেঁচে আছে, ততদিন এই রোগও বেঁচে আছে। পৃথিবীর ইতিহাস খুললে দেখা যায়, প্রথম গুনাহটিও হিংসার ফল। ইবলিস আদম (আ.)-এর মর্যাদা দেখে হিংসা করেছিল। অথচ সে জানত— তার জ্ঞান, ক্ষমতা, দক্ষতা অনেক বেশি। তবু হিংসা তাকে আল্লাহর অবাধ্য করে তুলেছিল।
আজ হিংসা নাটক-সিনেমার গল্প নয়; এটি প্রতিটি বাড়িতে, প্রতিটি সম্পর্কের ভেতরে, প্রতিটি সমাজের কোণে ছড়িয়ে আছে।
যার টাকা আছে সে অন্যের টাকার দিকে চেয়ে আছে, যার ডিগ্রি আছে সে অন্যের ডিগ্রির দিকে হিংসে করছে, যার পদ আছে সে অন্যের পদে চোখ রাখছে। এ যেন অদৃশ্য এক দৌড়—কেউ কাউকে ছাড়তে চাইছে না।
হিংসার পেছনে থাকে সন্দেহ, আর সন্দেহ থেকে জন্ম নেয় শত্রুতা। বন্ধুত্ব ভাঙে, দাম্পত্য ভাঙে, আত্মীয়তা ভাঙে—শুধু এই হিংসার আগুনে।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন,
“হিংসা থেকে বাঁচো। কারণ, আগুন যেমন কাঠকে ভস্ম করে দেয়, তেমনি হিংসা মানুষের নেক আমলকে ধ্বংস করে ফেলে।”
(সুনানে আবু দাউদ: ৪৯০৩)
হিংসা অনেকটা ছাইয়ের স্তূপের মতো। বাইরে থেকে বিশাল দেখালেও, সামান্য বাতাসেই তা উড়ে যায়। হিংসুক মানুষ কারও ক্ষতি করতে পারে না; বরং নিজেই দিনরাত দুশ্চিন্তায় জ্বলে-পুড়ে শেষ হয়ে যায়। সে সন্তুষ্টি হারায়, শান্তি হারায়, দুনিয়া-আখিরাত দুটোই হারায়।
আমাদের সমাজের বড় বড় অবক্ষয়, এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুদ্ধবিগ্রহের অন্যতম কারণও এই হিংসা। মানুষ মানুষের বন্ধু না হয়ে শত্রুতে পরিণত হয় কেবল এই একটি রোগের কারণে।
আল্লাহ যাকে যা দেন, তা তাঁর ইচ্ছাতেই দেন। অন্যের সাফল্য দেখে হিংসে করার মানে হলো আল্লাহর ফয়সালাকে অস্বীকার করা। তাই হিংসা হলো এক ধরনের কুফরি।
তাহলে করণীয় কী?
অন্যের সাফল্য দেখে মন পোড়ানো নয়, বরং দোয়া করা—
“ইয়া আল্লাহ, যেভাবে তাকে দিয়েছো, আমাকেও দাও।”
আরও উত্তম হলো, নফসকে দমন করে বলা—
“হে আল্লাহ, আপনি তাকে দিয়েছেন, তার জন্য শুকরিয়া। আপনি তাকে আরও দিন।”
এমন দোয়া করলে অন্তরে শান্তি নামে, হৃদয় প্রসারিত হয়, সম্পর্ক সুন্দর হয়, সমাজ কল্যাণময় হয়।
হিংসা হলো সেই আগুন, যা কখনো অন্যকে নয়, বরং হিংসুকের হৃদয়কেই প্রথমে জ্বালিয়ে দেয়।
তাই আসুন, আমরা হিংসাকে ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করি, অপরাধ হিসেবে দেখি, এবং দোয়া ও ধৈর্যের মাধ্যমে আত্মাকে শুদ্ধ করি।
কারণ, হিংসার অন্ধকারে কখনো আলো ফুটে না; আলো ফোটে শুধু কৃতজ্ঞতায়, দোয়ায়, ভালোবাসায়।
তথ্যসূত্র:
আমার সংবাদ (২৭ ডিসেম্বর, ২০২৩)
ইন্টারনেট, গুগল
#হিংসা #মানসিকরোগ #ইসলামিকনিবন্ধ #নৈতিকতা #জেলাসি #আত্মার_ব্যাধি #প্রবন্ধ #সমাজ #মোহাম্মদজাহিদহোসেন
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।