অস্থায়ীত্বের যুগ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ০৫ মার্চ ২০২৬
'অস্থায়ীত্ব'—শব্দটি শুনলে প্রথমে মনে হয় সব ভেঙে পড়ছে। ধ্বংস। কিন্তু তা নয়। একটু ভাবুন। স্থায়ীত্ব মানে দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকা। ধারাবাহিকতা। অস্থায়ীত্ব শুধু এর বিপরীত নয়; এটি দ্রুত পরিবর্তন, অনিশ্চয়তা, এবং—সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ের সংকোচন।
আমার দাদা বলতেন, মানুষের জীবন একটি ক্রমবর্ধমান গল্প। শৈশব। শিক্ষা। পেশা। পরিবার। সব মিলিয়ে এক রেখা। কিন্তু সেই রেখা এখন? খণ্ডিত। বিচ্ছিন্ন মুহূর্ত। একটি দৃশ্য, তারপর আরেকটি। দীর্ঘ বর্ণনার সুতো আলগা হয়ে যাচ্ছে। আমি নিজেই দেখেছি—আমার বন্ধুদের ক্যারিয়ার পথ কেমন আঁকাবাঁকা। কেউ আজ ইঞ্জিনিয়ার, কাল ফটোগ্রাফার। পরশু কিছুই না।
পরিচয় কী?
এটি আত্ম-বিবরণের ক্ষমতা। সময়ের ভেতরে একটি তুলনামূলক স্থিতিশীল "আমি" গড়ে তোলা। উপস্থাপনা ভিন্ন—নির্দিষ্ট মুহূর্তে অন্যদের সামনে নিজেকে দৃশ্যমান করা। অস্থায়ীত্বের যুগে এই দুটির পার্থক্য মিলিয়ে যাচ্ছে। আমরা কে—এর চেয়ে বেশি জরুরি হয়ে উঠছে, আমরা কীভাবে দেখা যাচ্ছি। এটি কেবল সাংস্কৃতিক রুচির পরিবর্তন নয়। অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও এর সম্পর্থ আছে। গভীর।
ঐতিহাসিকভাবে পরিচয় গঠিত হতো কাজে। সম্পর্কে। পেশা, দক্ষতা, সামাজিক ভূমিকা—একটি স্তর। পরিবার, সম্প্রদায়, প্রতিষ্ঠান—আরেকটি। এই দুইয়ের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতি ছিল। এখন?
তৃতীয় উপাদান যুক্ত হয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। প্রকাশের ধরন। এবং—সবচেয়ে মূল্যবান—তা যে প্রতিক্রিয়া পায়। আগে প্রশংসা বা সমালোচনা সীমিত পরিসরে। এখন? সংখ্যায় ধরা যায়। লাইক। শেয়ার। মন্তব্য। স্কেল বদলেছে। সম্ভাব্য দর্শক অনির্দিষ্ট। অ্যালগরিদম নির্ধারণ করে—কার প্রকাশ কতদূর পৌঁছাবে। আমি একবার একটি পোস্ট দেখেছিলাম। সাধারণ একটি ছবি। কিন্তু অ্যালগরিদম তা ঠেলে দিয়েছিল লাখো মানুষের কাছে।
অন্য একটি?
ভালো ছবি। কিন্তু দশ জন দেখেছে। পরিমাণ এত ব্যাপক যে প্রকৃতি বদলে গেছে। উপস্থাপনা এখন পরিচয়ের অংশ নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি পরিচয় নির্মাণের কেন্দ্র। মূল কেন্দ্র।
বলা হয়, ব্যবহারকারী নিষ্ক্রিয়। সরলীকরণ। মানুষ নির্বাচন করে। বিরতি নেয়। প্ল্যাটফর্ম ত্যাগ করে। কিন্তু এই নির্বাচন?
একটি পূর্বনির্ধারিত নকশার ভেতরেই সীমাবদ্ধ। ইন্টারফেস কেমন হবে—প্ল্যাটফর্ম ঠিক করে। নোটিফিকেশন কখন আসবে—তারা ঠিক করে। স্ক্রলিংয়ের কাঠামো—তাদের হাতে। ব্যবহারকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দৃশ্যমানতার প্রণোদনা তৈরি হয়। ক্ষমতা কাঠামোগত। অদৃশ্য। ব্যক্তিগত নয়।
তবে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়তাও নয়। ব্যবহারকারীর ক্ষমতা ব্যক্তিগত। কী পোস্ট করব, কতক্ষণ ব্যয় করব—এসব সিদ্ধান্ত তার। সম্মিলিত আচরণ কখনো কখনো প্রভাব ফেলে। ২০২০ সালের বিজ্ঞাপন বয়কট মনে আছে?
আংশিক নীতিগত সাড়া এনেছিল। যদিও প্ল্যাটফর্মের মৌলিক কাঠামো অপরিবর্তিত রইল। অসমতা পরম নয়। সমানও নয়। ধাপের মতো—ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ ও কাঠামোগত প্রভাব মিলিত।
চাকরির স্থায়িত্ব কমছে। গিগ অর্থনীতি। স্বল্পমেয়াদি চুক্তি। ঋণচাপ। সবই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে চ্যালেঞ্জ করছে। যখন অনিশ্চয়তা বাড়ে, মানুষ স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্তে ঝুঁকে। অভিযোজন। কিন্তু মূল্য আছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সক্ষমতা ক্রমাগত দুর্বল হলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই স্থায়িত্ব হারায়। কার্যকর? হ্যাঁ।
কিন্তু সম্ভাব্য ক্ষতিকর। নিশ্চয়ই।
বাংলাদেশে—আমি যে সমাজে বাস করি—ফ্রিল্যান্সিং বা অস্থায়ী চাকরিতে নতুন প্রজন্মের অভিজ্ঞতা দেখেছি। গত মাসে এক তরুণের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলাম। সে বলল, "ভাই, পরের মাসে কী হবে জানি না। কিন্তু এখনকার কাজটা ভালোই চলছে।" দ্রুত রূপান্তরিত কাজের পরিবেশে অভিযোজন জরুরি। অবশ্যই। কিন্তু পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা? কমছে। স্পষ্টভাবে কমছে।
অস্থায়ীত্বের এক রূপ বাধ্যতামূলক। চুক্তিভিত্তিক শ্রম। আয়ের অস্থিরতা। ঋণচাপ। আরেকটি অপেক্ষাকৃত ঐচ্ছিক। রুচির দ্রুত পরিবর্তন। মতাদর্শের রূপান্তর। মধ্যবিত্ত শ্রেণি এই দুই প্রবাহের সংযোগস্থলে। আংশিক নিরাপত্তা আছে। ঝুঁকিও আছে। সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণের সুযোগ উন্মুক্ত। ফলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দুর্বল হতে পারে। আবার প্রবণতায় সক্রিয় অংশগ্রহণও দেখা যায়। উভয়ই সম্ভব। একসাথে।
অর্থনৈতিক চাপ স্বল্পমেয়াদি মনোভাব বাড়ায়। সাংস্কৃতিক দ্রুততা গিগ অর্থনীতিকে স্বাভাবিক করে। শ্রমজীবী মানুষের নান্দনিক পরিবর্তন কেবল ট্রেন্ড নয়। এটি সামাজিক গতিশীলতার প্রকাশ। গভীর প্রকাশ।
ডিজিটাল স্মৃতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষণ করে। ছবি। লেখা। প্রতিক্রিয়া। পরে অ্যালগরিদম এগুলো থেকে অংশ নির্বাচন করে সামনে আনে। কীভাবে? আমরা জানি না। যখন শুধুই সাফল্য নথিভুক্ত হয়, ব্যর্থতা নয়—আত্ম-বিবরণ সম্পাদিত হয়ে যায়। সচেতনভাবে উভয়ই সংরক্ষণ করা অসামঞ্জস্য কমাতে পারে। সংরক্ষণ নিজে সমস্যা নয়। নির্বাচনের ধরনই মূল। সবসময়।
মূল্যবোধ তত্ত্ব নয়। নৈতিক সংবেদন। অন্যায় দেখলে অস্বস্তি। অসম্মানে প্রতিরোধ। এগুলো মূল্যবোধ। মতাদর্শ হতে পারে তত্ত্ব—যেমন, "ব্যক্তিস্বাধীনতা সর্বোচ্চ।" মূল্যবোধ ব্যক্তির আচরণে স্থিতিশীল। কম পরিবর্তনশীল। অন্তত তা হওয়া উচিত।
নিজের পরিবর্তন বোঝা সহজ নয়। কঠিন। নিয়মিত গুরুত্বপূর্ণ মতামত, লক্ষ্য, পছন্দ লিখে রাখা যায়। পরে প্রশ্ন করা যায়—আমি কি নতুন তথ্য পেয়েছি, না কি নতুন পরিবেশে অভিযোজিত হয়েছি? পার্থক্য মূল্যবান। বিপরীত মতামত পড়া অস্বস্তিকর। স্বীকার করি। কিন্তু প্রয়োজনীয়। অবস্থান টিকে থাকলে তার ভিত্তি স্পষ্ট হয়। না থাকলে সংশোধনের কারণ বোঝা যায়। উভয়ই লাভ।
স্থিতি মানে স্থবিরতা নয়। পরিবর্তনের ভেতর কিছু স্তর সচেতনভাবে ধরে রাখা জরুরি। মৌলিক নৈতিক সংবেদন। অন্তত একটি দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক। একটি মধ্যমেয়াদি লক্ষ্য। এগুলো হতে পারে নোঙর। হারালে কি আমি একই মানুষ থাকব? উত্তর অনিশ্চিত। সত্যিই অনিশ্চিত। নোঙর হতে হলে এটি স্বীকৃত ও বিবেচিত হতে হবে। অনুভূত হতে হবে।
ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা: সময়ের দিগন্ত বাড়ানো। আত্মমূল্যায়ন। ডিজিটাল ব্যবহারে সীমা। কঠিন, কিন্তু সম্ভব।
সম্প্রদায়: দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের পরিসর। আন্তপ্রজন্মিক সংলাপ। আমার মা যা বোঝেন, আমি তা বুঝি না। কিন্তু কথা বললে বোঝার চেষ্টা করা যায়।
কাঠামোগত নীতি: শ্রমবাজারে স্থায়িত্ব। সামাজিক নিরাপত্তা। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রবণতা বাড়ায়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমাদের দাবি।
পরিবর্তন সমস্যা নয়। সমস্যা তখন, যখন আমরা পরিবর্তনের কাঠামো বুঝতে ব্যর্থ হই। এবং তার মধ্যে নিজের অবস্থান সচেতনভাবে নির্ধারণ করি না। আমাদের সময়ের বিশেষত্ব—উপস্থাপনার অতিরিক্ত গুরুত্ব। যা আত্ম-বিবরণকে সংকুচিত করে। কর্ম, উপস্থাপনা ও কাঠামোর মিশ্রণে পরিচয় গঠিত হয়। সম্পূর্ণ স্থিরতা কোনো যুগেই ছিল না। সম্পূর্ণ ভাসমানতাও টেকসই নয়। প্রশ্ন তাই ব্যক্তিগত। অত্যন্ত ব্যক্তিগত। পরিবর্তনের প্রবাহে আমার আত্ম-বিবরণের কেন্দ্র কোথায়?
আমি কি তা জানি?
জানতে চাই?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।