কেউ দেখছে না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ৬ অক্টোবর ২০২৬
দরজা বন্ধ। চারপাশে কেউ নেই। তখন আপনি কে?
“আপনার সচেতনতাই আপনার স্বর্গ, আর আপনার অজ্ঞতাই আপনার নরক।”
কথাটা শুনলে প্রথমে আপত্তি আসতেই পারে। ধর্ম কি শুধু ভয় আর লোভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে? নিশ্চয়ই বিষয়টা এত সরল নয়। মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে ভালোবাসা, নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি, দায়িত্ববোধ এবং পরকালের ধারণাও জড়িয়ে আছে। তবু এই কথাটা একটা অস্বস্তিকর জায়গায় হাত দেয়। আমরা কি শুধু শাস্তির ভয়েই ভালো থাকি, নাকি কেউ না দেখলেও ভালো থাকার মতো একটা বোধ আমাদের ভেতরে তৈরি হয়?
ছোটবেলায় আগুন থেকে দূরে থাকতে বলা হতো, “হাত দিও না, পুড়ে যাবে।”
তখন আগুনের স্বভাব বুঝতাম না। ভয়টাই ছিল কারণ। পরে বুঝেছি, আগুনকে ভয় পাওয়ার চেয়ে আগুনকে বোঝা বেশি জরুরি। তখন কেউ পাশে না থাকলেও জানি, কোথায় হাত বাড়ানো নিরাপদ আর কোথায় নয়।
মানুষের নৈতিক জীবনেও এমন একটা পরিবর্তন দরকার।
শাস্তির ভয় কাউকে চুরি থেকে আটকাতে পারে। লোকলজ্জা কাউকে মিথ্যা বলা থেকে থামাতে পারে। কিন্তু দরজা বন্ধ, চারপাশ ফাঁকা, দেখার মতো কেউ নেই, তখন?
সেই মুহূর্তে মানুষের সঙ্গে তার নিজের সম্পর্কটাই সামনে আসে।
রাস্তার পাশে এমন দৃশ্য খুব স্বাভাবিকভাবেই চোখে পড়ে। একজন ভদ্রলোক রিকশাওয়ালার সঙ্গে দশ টাকা নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ তর্ক করছেন। কথার ধরন এমন, যেন ওই দশ টাকা না দিলে তার বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে। অথচ কিছুক্ষণ পর সেই মানুষটিকেই হয়তো উপাসনালয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাবে।
এখানে প্রশ্নটা তার ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে নয়। প্রশ্নটা অন্য জায়গায়।
যে মানুষটি সৃষ্টিকর্তার সামনে নত হন, তিনি কি একজন দরিদ্র মানুষের প্রাপ্য সম্মানটুকুও দিতে পারছেন?
ধর্মীয় জীবনে আমরা অনেক সময় বাহ্যিক পরিচয় সহজে দেখতে পাই। পোশাক, আচার, প্রার্থনা, ধর্মীয় শব্দের ব্যবহার, উপাসনালয়ে উপস্থিতি। এগুলো বিশ্বাসের প্রকাশ হতে পারে। কিন্তু মানুষের চরিত্রের গভীরতা বোঝা যায় অন্য জায়গায়।
সে তার স্ত্রীকে কীভাবে কথা বলে। কর্মচারীর ভুল হলে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। দোকানের কর্মচারী বা রিকশাচালক তার চেয়ে দুর্বল বলে তাকে ছোট করে কি না। কারও পাওনা দেওয়ার সময় অজুহাত খোঁজে কি না।
এসব জায়গায় মানুষ অভিনয় করার সুযোগ কম পায়।
কোনো ধর্মীয় শিক্ষা সত্যিই ভেতরে পৌঁছেছে কি না, তার একটা পরীক্ষা হলো আচরণ। মুখে মানুষ অনেক কিছু বলতে পারে। কিন্তু ক্ষমতা হাতে এলে সে কী করে, দুর্বল মানুষের সামনে কেমন আচরণ করে, আর কেউ না দেখলে নিজের সুবিধার জন্য কতটা অন্যায় করে, সেখানেই তার আসল চরিত্রটা বেরিয়ে আসে।
এখানেই “অজ্ঞতা” শব্দটাও নতুন অর্থ পায়।
অজ্ঞতা মানে শুধু লেখাপড়া না জানা নয়। নিজের রাগ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা, নিজের অহংকারকে না চিনতে পারা, লোভকে প্রয়োজনের নাম দেওয়া, নিজের ভুলের দায় অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে স্বস্তি পাওয়া, এগুলোও অজ্ঞতা।
একজন মানুষ হয়তো অনেক বই পড়েছেন, কিন্তু নিজের ভেতরের মানুষটাকে কখনো পড়েননি।
এই অজ্ঞতার ফল খুব কাছেই দেখা যায়। মানুষ একই ভুল বারবার করে। সম্পর্ক ভাঙে, অথচ সে কারণটা বুঝতে চায় না। ক্ষমা চাওয়ার জায়গায় যুক্তি দাঁড় করায়। নিজের অন্যায়কে স্বাভাবিক করে তুলতে তুলতে একসময় বিবেকের অস্বস্তিটাও কমে যায়।
নরক তখন কোনো দূরের জায়গা থাকে না।
ভাঙা সম্পর্ক, হারানো বিশ্বাস, অপরাধবোধ, একাকিত্ব এবং নিজের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানো জীবনও এক ধরনের নরক হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে নিজেকে দেখতে শেখা মানেই নিখুঁত হয়ে যাওয়া নয়। বরং নিজের ভুল চোখে পড়া। প্রয়োজন হলে বলা, “আমি ভুল করেছি।” কারও কষ্টের কারণ হলে ক্ষমা চাওয়া। নিজের সুবিধার বাইরে অন্য মানুষের অবস্থাটাও একবার ভাবা।
যে মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে, তার ভেতরে বদলে যাওয়ার দরজাটা খোলা থাকে। আর যে মানুষ মনে করে তার কোনো ভুল নেই, তার জন্য কোনো শিক্ষা কতটা কাজে লাগবে?
স্বর্গ ও নরক নিয়ে মানুষের বিশ্বাস অবশ্যই ব্যক্তিগত। কেউ এগুলোকে মৃত্যুর পরের বাস্তবতা হিসেবে দেখেন, কেউ আবার মানুষের বর্তমান জীবন ও মানসিক অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। এই ভিন্ন বিশ্বাসের জায়গাটাকে সম্মান করেই প্রশ্নটা করা যায়।
মৃত্যুর পর কী আছে, তা নিয়ে আমাদের বিশ্বাস থাকতে পারে। কিন্তু মৃত্যুর আগের জীবনটা কেমন হবে, তার অনেকটাই আমাদের হাতে।
কেউ না দেখেও একজন মানুষকে সাহায্য করা যায়। আবার কেউ না দেখেও তাকে অপমান করা যায়। প্রথম কাজটির জন্য হয়তো কোনো পুরস্কার পাওয়া হবে না, দ্বিতীয়টির জন্য হয়তো কোনো শাস্তিও হবে না। তবু দুটো কাজের ওজন মানুষের নিজের ভেতরে সমান থাকে না।
মানুষের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা সম্ভবত সেখানেই, যেখানে তাকে কেউ দেখছে না।
সেখানে ধর্মীয় পরিচয়ও পাশে দাঁড়ায় না, সামাজিক সম্মানও নয়। থাকে শুধু মানুষটি এবং তার বিবেক।
তখন স্বর্গ হয়তো কোনো দূরের জায়গার নাম নয়। এমন এক জীবন, যেখানে নিজের কাজের জন্য প্রতিদিন নিজেকে লুকাতে হয় না।
আর নরকও হয়তো শুধু আগুনের কোনো কল্পিত স্থান নয়। এমন এক জীবন, যেখানে মানুষ নিজের সত্যকে এতদিন এড়িয়ে চলে যে একসময় নিজের কাছেই অপরিচিত হয়ে যায়।
তাহলে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা স্বর্গ কোথায় বা নরক কোথায়, সেটাও নয়।
প্রশ্নটা আরও ব্যক্তিগত।
আজ রাতে ঘুমানোর আগে, যখন চারপাশে কেউ থাকবে না, তখন নিজের সামনে দাঁড়িয়ে আমি কী দেখতে পাব?
আমি যে মানুষটাকে পৃথিবীর কাছে দেখাই, আর যে মানুষটা সত্যি সত্যি আমি, তারা কি একই মানুষ?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।