অধিকারের দুই দরজা
(নারী, ধর্ম ও সংবিধান)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ২৩ অক্টোবর ২০২৬
মেয়েটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে। চাকরি করে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারে। অফিসে তার অধীনে কাজ করেন কয়েকজন পুরুষ কর্মকর্তা। কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁরা তার মতামতও শোনেন। অথচ বাড়িতে ধর্মীয় কোনো অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গ উঠলে তার ভূমিকা বদলে যায়। সে আয়োজন করবে, অতিথিদের খেয়াল রাখবে, প্রয়োজনীয় সবকিছু সামলাবে। কিন্তু নেতৃত্বের প্রশ্ন এলে তাকে আর কেউ সামনে ডাকে না।
এ দৃশ্য সব পরিবারে এক নয়। তবু অনেক নারীর জীবনে এমন অভিজ্ঞতা একেবারে অপরিচিতও নয়।
একজন নারী দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, রাষ্ট্রপতি হতে পারেন, বিচারক, সচিব কিংবা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। কিন্তু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে তাঁর সুযোগ অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। একই নারী যখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তখন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে কেন?
প্রশ্নটি ধর্মকে ছোট করার নয়। প্রশ্নটি নারীর যোগ্যতা, অধিকার এবং সমাজে তাঁর অবস্থান নিয়ে।
ধর্মীয় নেতৃত্বের নিয়ম সব ধর্মে এক নয়। ইসলামি পরিসরে নারীর ইমামতি নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও বিতর্ক রয়েছে। আবার মুসলিম সমাজেই নারীরা ধর্মীয় শিক্ষা দেন, কোরআন শেখান এবং ধর্মীয় জ্ঞানচর্চায় সম্মানিত ভূমিকা পালন করেন। খ্রিষ্টধর্মের বিভিন্ন সম্প্রদায়েও নারী যাজক বা পাদ্রি হওয়ার সুযোগ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান রয়েছে। কোথাও নারীরা ধর্মীয় নেতৃত্ব দেন, কোথাও সেই সুযোগ সীমিত। অর্থাৎ ধর্মীয় ঐতিহ্যের ভেতরেও নেতৃত্বের প্রশ্নে একটিমাত্র অভিন্ন চিত্র নেই।
তাই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে হলে পার্থক্যগুলো বুঝতে হবে। কোনো ধর্মের সব অনুসারীকে একই অবস্থানের মানুষ ভাবা যেমন ভুল, তেমনি নারীর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই আলোচনা বন্ধ করে দেওয়াও সমাধান নয়।
রাষ্ট্রের কাঠামো এখানে আলাদা। সংবিধান নাগরিকের অধিকার ও রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ম নির্ধারণ করে। বাংলাদেশে নারী প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন; নারীরা বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন। রাষ্ট্রের পদে একজন নারীর যোগ্যতা বিচার করার ক্ষেত্রে তাঁর নারী পরিচয়কে একমাত্র বাধা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
কিন্তু সংবিধানের এই স্বীকৃতি বাস্তব জীবনে কতটা পৌঁছেছে?
যে নারী অফিসে একটি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন, বাড়িতে ফিরে তাঁকেই হয়তো শুনতে হয়, সংসারের শেষ সিদ্ধান্তটি পুরুষের হওয়া উচিত। যে নারী নিজের উপার্জনে পরিবার চালান, তাঁকেও ব্যক্তিগত পছন্দের জন্য অনুমতি চাইতে হয়। কর্মক্ষেত্রে তাঁর মতামত মূল্য পায়, অথচ পরিবারের আলোচনায় তাঁর কথাকে কখনো আবেগ বলে সরিয়ে দেওয়া হয়।
অধিকার তখন কাগজে থাকে, কিন্তু প্রতিদিনের জীবনে তার পরিধি ছোট হয়ে আসে।
তবে ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংবিধানিক অধিকারকে পরস্পরের শত্রু হিসেবে দাঁড় করানোও ঠিক নয়। মানুষ নিজের ধর্ম পালন করবে, ধর্মীয় বিধানকে সম্মান করবে—এ তার অধিকার। একই সঙ্গে ধর্মীয় ঐতিহ্যে নারীর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা, বিভিন্ন ব্যাখ্যা বোঝা এবং সামাজিক বাস্তবতা পর্যালোচনা করাও অসম্মানের শামিল নয়। বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা থাকতে পারে, আবার সেই বিশ্বাসের সামাজিক প্রয়োগ নিয়ে যুক্তিসংগত আলোচনা করার জায়গাও থাকতে পারে।
সবচেয়ে জরুরি হলো, নারীকে শুধু তাঁর পদ দিয়ে বিচার না করা। একজন নারী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে পৌঁছেছেন—এটি অগ্রগতির একটি চিহ্ন। কিন্তু যে নারী কোনো উচ্চপদে নেই, যিনি পরিবারের সিদ্ধান্তে নিজের মতামতটুকু প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না, তাঁর অভিজ্ঞতাও সমান গুরুত্বের দাবি রাখে।
কারণ অধিকার মানে শুধু ক্ষমতার আসনে বসার সুযোগ নয়। অধিকার মানে নিজের কথা বলার সুযোগ, নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা এবং মানুষ হিসেবে সম্মান পাওয়া।
একজন নারী দেশের নেতৃত্ব দিতে পারেন, অথচ নিজের জীবনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তে তাঁকে বারবার বাধার মুখে পড়তে হয়—এই বৈপরীত্যের দিকে তাকানো জরুরি।
রাষ্ট্রের দরজা তাঁর জন্য খুলেছে কি না, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি দেখতে হবে, সমাজের অন্য দরজাগুলোও তাঁর জন্য কতটা খোলা।
একজন নারী কত বড় পদে পৌঁছেছেন, তা দিয়ে তাঁর অধিকার মাপা যায় না; অধিকার বোঝা যায়, তিনি নিজের জায়গায় কতটা মর্যাদা নিয়ে দাঁড়াতে পারছেন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।