সফলতার ভান
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী কলাম।ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬
বিকেলের আলো জানালার গ্রিল ভেদ করে টেবিলে এসে পড়ছিল। রাশেদ কফি শপের এক কোণার টেবিলে বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছবি তুলল—খোলা ল্যাপটপ, পাশে কফির কাপ, আর চোখে-মুখে ক্লান্তি আর আত্মবিশ্বাসের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। ক্যাপশনটা ছিল ছোট কিন্তু ধরছে—‘বড় কিছু গড়ে তুলছি। অপেক্ষা করুন।’
পোস্টটি আপলোড হতেই নোটিফিকেশন বাজতে শুরু করল। বন্ধু ও পরিচিতরা লিখল—
“গর্বিত!”
“অনুপ্রেরণা!”
“ভাই, আপনি পারবেন।”
রাশেদ ফোনটা টেবিলে নামিয়ে রাখল। কিন্তু তার বুকটা ধকধক করছিল। ওয়েটার যখন বিলটা টেবিলে রেখে গেল, রাশেদ দেখল—তার পকেটে কোনো টাকার ঠিকানা নেই। এই কফিটুকুও সে বন্ধুর কাছ থেকে ধার নিয়ে খাচ্ছে। তার সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলে পদবি লেখা ‘প্রতিষ্ঠাতা’, কিন্তু বাস্তবে সে গত তিন মাস ধরে একটি চাকরির জন্যও ইন্টারভিউ পায়নি।
বাসায় ফিরে মা যখন জিজ্ঞেস করলেন, “কাজ কেমন চলছে?”
রাশেদ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “ভালো... বড় একটা সুযোগ আসছে। হয়তো চুক্তিটা আজকেই হয়ে যাবে।”
মা নিশ্চিন্তে হাসলেন। কিন্তু রাশেদ জানত—তার হাসিটা কেবল একটা পর্দার মতো। নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে সে ভাবল, সে কি সত্যিই জীবনে এগোচ্ছে, নাকি নিজের জীবনের একজন দক্ষ অভিনেতা হয়ে উঠেছে? যে নিজের প্রতিটি মুহূর্তকে এডিট করে সাজিয়ে অন্যের কাছে উপস্থাপন করছে, কিন্তু নিজের ভেতরের মানুষটাকে চেনেই না।
এই প্রশ্নটি আজকাল ঘুরপাক খায় শুধু রাশেদের মনে নয়, পুরো তরুণ প্রজন্মের জন্য এটি এক নীরব সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার পর্দায় যা দেখাই, তা বাস্তবতার চেয়ে প্রায়শই ভিন্ন। এই ‘সফলতার ভান’ শুধু একটি মিথ্যা নয়; এটি ভেতরের সৃজনশীল মানুষটিকে ধীরে ধীরে চূর্ণ করে দেয়। আমাদের মস্তিষ্ক যখন সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে অন্যের জীবন যাচাই করতে, নিজের জীবনকে সাজিয়ে গুছিয়ে তুলতে এবং প্রতিটি পোস্টের লাইক বা কমেন্টের সংখ্যা গুনতে, তখন নতুন কিছু ভাবার বা তৈরি করার জন্য মস্তিষ্কের সেই ফাঁকা জায়গাটুকু আর থাকে না। আমরা হয়ে যাই আমাদের নিজেদের জীবনের একজন দর্শক—যে নিজের জীবনকে এডিট করতে এতটাই ব্যস্ত যে, তা উপভোগ বা গড়ে তোলার সময়ই থাকে না। এই পারফরম্যান্সই ধীরে ধীরে স্বপ্ন দেখার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং মানুষকে একটি ভুয়া আত্ম-পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখে।
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা এই ক্ষতকে আরও প্রকট করে। পরিবার বা আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে আসা প্রশ্নগুলো—
‘চাকরি হলো?’, ‘বেতন কত?’, ‘বিদেশ যাবে কবে?’
—প্রায়ই ভালোবাসা থেকে নয়, বরং এক ধরনের সামাজিক মর্যাদার হিসাব-নিকাশ থেকে আসে। এই চাপের মুখে তরুণরা সত্যটা লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হয় এবং মিথ্যার একটি আরামদায়ক আশ্রয় নেয়। কিন্তু এই আশ্রয় ক্ষণস্থায়ী। যখন বাইরের জগতটা চকচকে এবং ভেতরটা খালি, তখন মানুষের মনে এক প্রকার অস্তিত্বগত শূন্যতা তৈরি হয়। সে নিজের প্রতি বিশ্বাস হারায়, কারণ গভীরে সে জানে—তার অর্জিত সেই প্রশংসাগুলো তার প্রকৃত কাজের বিনিময়ে নয়, বরং একটা সুন্দরভাবে সাজানো মিথ্যার বিনিময়ে এসেছে। আর এই বিশ্বাসহীনতাই তার ভেতরের সৃষ্টিশীলতাকে শেষ করে দেয়। যে মানুষটা নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখে না, সে কখনও বড় কোনো স্বপ্ন দেখতে পারে না বা নতুন কিছু তৈরি করতে পারে না।
সেদিন রাতে রাশেদ বিছানায় শুয়ে ফোনের পর্দা দেখছিল। তার ওই ছবিটা আর নিচের কমেন্টগুলো জ্বলজ্বল করছিল। সে হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিতে চেয়েছিল, আবার একবার দেখতে—কে কী বলেছে, কে কী প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। এই ডোপামিন বা আনন্দটুকু তাকে মুহূর্তের জন্য হলেও বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখত। কিন্তু হঠাৎ হাতটা মাঝপথে থেমে গেল। একটা তীব্র হতাশা আর লজ্জার ঢেউ এসে তাকে আছড়ে দিল। সে উঠে বসে ড্রয়ার থেকে একটি পুরনো খাতা বের করল। কলম ধরতেই তার হাত কাঁপছিল। সে লিখতে চেয়েছিল—‘আমি এখনো সফল নই। আমি একজন প্রতারক।’ কিন্তু কালি কাগজে পড়ল না। এই স্বীকারোক্তিটুকু করা তার কাছে অসম্ভব মনে হলো, কারণ তা তার সাজানো ওই ঝকঝকে জগতটাকে ভেঙে চুরমার করে দেবে।
মিনিটের পর মিনিট সে চুপ করে বসে রইল। মনে হচ্ছিল, সে এক পুরনো এবং শক্তিশালী অভ্যেস থেকে বের হওয়ার এক লড়াই করছে। দীর্ঘদিন ধরে যখন কেউ অন্যের চোখে নিজেকে সাজিয়ে, তখন নিজের চোখের সামনে নগ্ন হয়ে দাঁড়ানো সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়ে ওঠে। কখনও মনে হলো ফোনটা বন্ধ করে চোখ বুজে ঘুমিয়ে পড়াই ভালো, আবার কখনও মনে হলো নতুন করে সবকিছু শুরু করা উচিত। এই দোলাচলে তার মনে হলো, সত্য মানে হলো সেই কঠিন পথটি বেছে নেওয়া, যেখানে কোনো প্রশংসা নেই, কোনো ক্ল্যাপ নেই, শুধু নিজের প্রতি একটু বিশ্বাস আর শান্তি আছে।
শেষ পর্যন্ত খাতায় সে একটি ছোট লাইন লিখল, তারপরই কলমটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। লেখাটা ছিল একটু এলোমেলো, হয়তো পড়া যাবেও না। কিন্তু রাতের এই নিস্তব্ধতায় তার মনে হলো—ভান করা বোধহয় অনেক সহজ, কিন্তু সেই ভান ভাঙা এক কঠিন এবং বেদনাদায়ক প্রক্রিয়া। সে জানত না, আগামীকাল সকালে ঘুম ভাঙলে সে আবার সেই পুরনো অভিনেতা হয়ে ওঠবে, নাকি একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে নিজের ব্যর্থতাকে বুকে ধারণ করে বাঁচার চেষ্টা করবে।
সফলতার ভান মানুষের মনের ভিতরে নীরবে ক্ষয় ধরিয়ে দেয়। এটি আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে, দক্ষতার বদলে দেখানোর প্রবণতা বাড়ায় এবং মানুষকে একটি অস্তিত্বহীন একাকিত্বের দিকে ঠেলে দেয়। কারণ মানুষ যখন দেখানোর পেছনে সময় ব্যয় করে, তখন সত্যিকারের দক্ষতা অর্জনের সময় তার হাত থেকে চলে যায়। বন্ধুরা জানে না আপনি আসলে কেমন আছেন, পরিবারও জানে না আপনি ভেতরে কতটা কষ্টে আছেন। আর এভাবেই একসময় মানুষ নিজের কাছেও একজন অপরিচিত হয়ে ওঠে।
একজন বিখ্যাত বিনিয়োগকারী একবার বলেছিলেন, “আগে কাজ করুন, পরে বলুন।” সাধারণ কথা মনে হলেও এর ভেতরে গভীর বাস্তবতা লুকিয়ে আছে। সফলতা কখনও বড় কোনো ঘোষণা নয়, সফলতা মানে নীরব অগ্রগতি। গত বছরের চেয়ে আজ একটু ভালো হওয়া, একটি নতুন দক্ষতা শেখা বা ছোট একটি কাজ শেষ করা—এটুকুই প্রকৃত অগ্রগতি। রাতের সেই নীরবতায় রাশেদ হয়তো বুঝতে পেরেছিল, ভান মানুষকে সাময়িক প্রশংসা এনে দিলেও দীর্ঘমেয়াদে শান্তি দেয় না। শান্তি মিলে সেই সত্যের কাছ থেকে, যখন মানুষ নিজের অপ্রতুলতা মেনে নিয়ে তারপরও হাল ছাড়ে না।
শেষ পর্যন্ত আমাদের প্রত্যেককেই প্রশ্নের মুখে দাঁড়াতে হয়—আমরা কি অন্যের কাছে দেখানোর জন্য বাঁচব, নাকি নিজের ভিতরের সেই অজানা সত্যকে তৈরি করার জন্য লড়াই করব? জবাবটা হয়তো সহজ নয়, কিন্তু প্রশ্নটি জিজ্ঞেস করা অত্যাবশ্যক। কারণ জীবন হলো একটি একক অভিনয় নয়, জীবন হলো নিজের সাথে নিজের এক সততার সম্পর্ক। সেই সম্পর্কটুকু যখন টিকে থাকে, তখনই মানুষ আসলে সফল।
#সফলতারভান #মনস্তাত্ত্বিকবিশ্লেষণ #তরুণসমাজ #সাহিত্য #জাহিদলেখে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।