আমরা কি স্মৃতি হারাচ্ছি?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হাজার ছবি তুলি।
তবু আশ্চর্যভাবে অনেক মুহূর্ত মনে থাকে না।
কথাটা একটু অদ্ভুত।
আমাদের আগের প্রজন্মের কাছে স্মৃতি ধরে রাখার সুযোগ ছিল খুব কম। একটা বিয়েতে হয়তো দশটা ছবি উঠেছে। কোনো ভ্রমণে পাঁচটা। শৈশবের অনেক বছর কেটে গেছে একটাও ছবি ছাড়া।
আমাদের কাছে সেই অভাব নেই।
মোবাইলটা পকেট থেকে বের করলেই ক্যামেরা।
যে মুহূর্তটা ঘটছে, সঙ্গে সঙ্গে ধরে রাখা যায়। ভালো না হলে আবার তোলা যায়। একই দৃশ্যের দশটা, বিশটা, একশোটা ছবি রাখা যায়।
তবু প্রশ্নটা থেকেই যায়—
এত ছবি জমছে, স্মৃতি কি ততটা জমছে?
কখনো কখনো মনে হয়, আমরা মুহূর্তটা বাঁচার আগেই তার ছবি তুলে ফেলছি।
একটা শিশু প্রথমবার হাঁটছে।
বাবা-মা সামনে দাঁড়িয়ে।
শিশুটি টলতে টলতে এক পা, তারপর আরেক পা এগিয়ে যাচ্ছে।
সেই দৃশ্যটা চোখের সামনে ঘটছে।
কিন্তু কখনো কখনো বাবা-মায়ের চোখ শিশুর মুখে থাকার বদলে মোবাইলের পর্দায় আটকে থাকে। তারা মুহূর্তটাকে ধরে রাখছেন, কিন্তু মুহূর্তটাকে পুরোপুরি দেখছেন কি না—সেই প্রশ্নটা থেকেই যায়।
ভ্রমণেও একই ব্যাপার।
পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে পাহাড় দেখার আগে ছবি তুলি।
সমুদ্রের ঢেউ পায়ের কাছে এসে ফিরে যাচ্ছে, আর আমরা ভাবছি—ছবিটা ঠিকমতো উঠল তো?
তারপর বাড়ি ফিরে ছবিগুলো দেখি।
একশো ছবি।
দুইশো ছবি।
একই পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের অসংখ্য মুখ।
কিন্তু সেই পাহাড়ি বাতাসের গন্ধটা মনে পড়ে না।
সন্ধ্যার ঠান্ডাটা মনে পড়ে না।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির হাতটা কেমন ছিল, সেটাও হয়তো মনে থাকে না।
ছবি দৃশ্য ধরে রাখে।
কিন্তু দৃশ্যের ভেতরে আমরা কেমন ছিলাম, সবসময় তা ধরে রাখতে পারে না।
একটা পুরোনো ছবি হাতে নিয়ে আমরা কখনো হঠাৎ থেমে যাই।
ছবিতে বাবা আছেন।
অনেক বছর আগের ছবি।
মুখটা একটু ঝাপসা। পেছনে পুরোনো বাড়ি। হয়তো একটা গাছও আছে।
ছবিটা বাবার মুখ ফিরিয়ে দেয়।
কিন্তু বাবার গলার স্বর?
হাঁটার শব্দ?
রাগ করে চুপ করে থাকার সেই ভঙ্গি?
সকালে ঘুম থেকে ডেকে তোলার গলা?
ক্যামেরা এগুলোর কিছুই ধরে রাখেনি।
তবু আশ্চর্যভাবে এগুলোর কিছু কিছু থেকে যায়।
মানুষের স্মৃতি শুধু চোখের জিনিস নয়।
একটা গন্ধ হঠাৎ বহু বছর আগের একটা দুপুর ফিরিয়ে আনতে পারে।
পুরোনো সাবানের গন্ধে মায়ের ঘর মনে পড়ে।
ভেজা মাটির গন্ধে স্কুল থেকে বৃষ্টিতে ভিজে ফেরার দিন।
কোনো পুরোনো গান হঠাৎ এমন একজন মানুষের কথা মনে করিয়ে দেয়, যার সঙ্গে বহু বছর কথা নেই।
সেই স্মৃতির কোনো ছবি নেই।
কোনো ভিডিও নেই।
কোনো মেঘে রাখা ব্যাকআপও নেই।
তবু সে থেকে যায়।
হয়তো স্মৃতি আসলে ছবি জমিয়ে রাখার নাম নয়।
স্মৃতি হলো কোনো একটা মুহূর্তকে নিজের ভেতরে জায়গা করে দেওয়া।
সেই জায়গায় থাকে গন্ধ।
থাকে শব্দ।
থাকে স্পর্শ।
থাকে মানুষের মুখ।
থাকে কখনো এমন কিছু কথা, যেগুলো তখন খুব সাধারণ মনে হয়েছিল।
অনেক বছর পরে সেগুলোই অমূল্য হয়ে ওঠে।
তাই সমস্যা মোবাইলের ক্যামেরায় নয়।
বরং ক্যামেরা আমাদের জীবনে অসাধারণ একটা সুযোগ এনে দিয়েছে। সন্তানের শৈশব, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের মুখ, পরিবারের উৎসব, হারিয়ে যাওয়া মানুষের ছবি—এসব ধরে রাখা ভবিষ্যতের জন্য কত মূল্যবান, তা আমরা হারানোর পর বুঝি।
সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন ছবি তোলা আর মুহূর্তে থাকা—দুটোর মধ্যে আমাদের বেছে নিতে হয়, আর আমরা বারবার প্রথমটাকে বেছে নিই।
একটা বিয়েতে সবাই নাচছে।
একজন মানুষ পুরো অনুষ্ঠানটা মোবাইলে ধারণ করছে।
বছর কয়েক পরে সেই ভিডিও দেখে সে বলতে পারে—
“সেদিন কত সুন্দর ছিল!”
কিন্তু তার নিজের কাছে হয়তো প্রশ্নটা থেকে যাবে—
আমি কি সেদিন সত্যিই সেখানে ছিলাম?
নাকি আমি শুধু অন্যদের আনন্দের একজন রেকর্ডার ছিলাম?
অবশ্য প্রতিটি মুহূর্ত ক্যামেরা থেকে দূরে রাখতে হবে—এমন কথাও নয়।
কিছু মুহূর্ত ধরে রাখা দরকার।
কিছু ছবি একদিন খুব প্রয়োজন হবে।
কিন্তু কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলোকে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করালে তারা যেন একটু দূরে সরে যায়।
বন্ধুর সঙ্গে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে হঠাৎ হেসে ওঠা।
মায়ের রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা গরম ভাতের গন্ধ।
বাবার পাশে বসে কোনো কথা না বলে দশ মিনিট কাটানো।
বৃষ্টির দিনে জানালার পাশে চুপ করে বসে থাকা।
এসবের কোনো ছবি না থাকলেও ক্ষতি নেই।
কারণ জীবনের সবকিছু সংরক্ষণ করার জন্য নয়।
কিছু জিনিস শুধু বেঁচে থাকার জন্য।
হয়তো কয়েক বছর পরে ফোন বদলে যাবে।
পুরোনো ছবি হারিয়ে যাবে।
কোনো হার্ডডিস্ক নষ্ট হবে।
কোনো অ্যাকাউন্ট আর খোলা যাবে না।
কিন্তু সবকিছু হারাবে না।
একটা বিকেল থেকে যাবে।
একটা কণ্ঠস্বর।
একটা গন্ধ।
একটা স্পর্শ।
একজন মানুষ।
আর হয়তো সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো—
যে মুহূর্তটার কোনো ছবি আমরা তুলিনি, কোনো কোনো দিন সেটাই সবচেয়ে পরিষ্কার হয়ে ফিরে আসবে।
তখন বুঝব—
সব স্মৃতি ছবিতে থাকে না।
কিছু স্মৃতি মানুষ নিজের ভেতরে বহন করে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।