গোলাপের কীট
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ডিসেম্বর ২৮, ২০২৫
একটা গোলাপ গাছ ছিল। তার শিকড় গভীরে প্রোথিত উর্বর মাটিতে। মাটি ছিল নীরব, ধৈর্যশীল, প্রতিদিন সূর্যের আলো, বৃষ্টির জল, বাতাসের স্পর্শ গ্রহণ করে গাছকে জীবন দান করত। গাছটা ফুটল। লাল পাপড়ি মেলে ধরল আকাশের দিকে। তার সৌন্দর্য দেখে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত, ছবি তুলত, গন্ধ নিত। গোলাপটা যেন স্বপ্নের প্রতীক হয়ে উঠল।
কিন্তু কেউ লক্ষ করেনি, কখন যেন পাপড়ির ভাঁজে ভাঁজে কীট ঢুকে পড়েছে। প্রথমে ছোট, অদৃশ্য। তারা পাপড়ির রস চুষতে শুরু করল। গোলাপের লাল রং একটু একটু করে ফ্যাকাশে হতে লাগল। কীটগুলো বাড়তে লাগল। একটা থেকে দুটো, দুটো থেকে দল। তারা নিজেদের মধ্যে লড়াই শুরু করল—কে বেশি রস পাবে, কে বেশি জায়গা দখল করবে। লড়াইয়ে পাপড়ি ছিঁড়ে গেল, কাঁটা ভেঙে পড়ল। গোলাপের সৌরভ মিলিয়ে গেল কীটের বিষাক্ত গন্ধে।
মাটি দেখতে লাগল সব। সে চাইলে শিকড় সরিয়ে নিতে পারত, কিন্তু তাহলে গাছ মরে যেত। সে চুপচাপ জল দিয়ে যেতে লাগল, পুষ্টি দিয়ে যেতে লাগল। কখনো বৃষ্টি এলে আরও গভীরে ঢুকে পড়ত, যাতে গাছটা টিকে থাকে। কিন্তু কীটের লড়াই থামছিল না। এক দল কীট আরেক দলকে তাড়াতে গিয়ে পাপড়ি ছিঁড়ে ফেলল। কখনো বিষ ছড়াল, কখনো জাল বুনল। গোলাপটা কাঁপতে লাগল। তার ফুল ঝরে পড়তে শুরু করল।
কীটেরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিল গোলাপকে। এক দল বলল, “এই পাপড়ি আমাদের।” আরেক দল বলল, “না, এটা আমাদের।” লড়াইয়ে গোলাপের কাঁটা ভোঁতা হয়ে গেল। সৌন্দর্য হারিয়ে গেল। যারা দূর থেকে দেখত, তারা এখন মুখ ফিরিয়ে নিল। “গোলাপটা আর আগের মতো নেই,” বলে চলে গেল। কিন্তু কীটেরা থামল না। তারা আরও গভীরে ঢুকে পড়ল। গাছের কাণ্ডে গর্ত করতে লাগল।
মাটি তবু চুপ। সে জানে, কীটেরা এলে যায়, কিন্তু গাছটা থাকলে আবার ফুল ফুটবে। কিন্তু কীটেরা যখন গাছের শিকড় পর্যন্ত পৌঁছে গেল, তখন মাটিও কেঁপে উঠল। শিকড় দুর্বল হয়ে পড়ল। গাছটা হেলে পড়তে লাগল। বৃষ্টি এলে আর ধরে রাখতে পারল না। একদিন ঝড় এল। গোলাপ গাছটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কীটেরা তখনো লড়ছিল—কে বেশি অংশ পাবে। কিন্তু গাছ মরে গেলে তাদেরও খাবার শেষ। তারা তখন নতুন গাছ খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল।
মাটি চুপচাপ পড়ে রইল। তার উর্বরতা কমেনি। সে জানে, একদিন নতুন শিকড় গজাবে। নতুন গাছ ফুটবে। কিন্তু সেই গাছে যাতে কীট না ঢোকে, তার জন্য মাটিকে জেগে উঠতে হবে। তাকে বলতে হবে, “আমি তোমাকে জীবন দিচ্ছি, কিন্তু তুমি আমাকে ধ্বংস করো না।” মাটি যদি একবার কাঁপে, কীটেরা তখন পালাবে। গোলাপ আবার ফুটবে—লাল, সুন্দর, সতেজ।
কিন্তু আজ গোলাপটা লুটিয়ে পড়ে আছে। কীটেরা এখনো উৎসব করছে। মাটি চুপ।
কিন্তু তার চুপে একটা প্রশ্ন জমছে—কতদিন?
#গোলাপের_কীট #রূপকের_রাজনীতি #বাংলাদেশের_অস্থিরতা #জনগণের_মাটি #রাজনৈতিক_বিশ্লেষণ #নীরব_প্রতিবাদ
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।