অসম্ভবের সীমা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ। মে ১৩, ২০২৬
ফজরের আজান ভেসে আসে। ঘরের ভেতর তখনো আধো অন্ধকার। মা চুপচাপ জায়নামাজে বসেন। কিছুক্ষণ পর ঠোঁট নড়ে—শব্দ খুব একটা শোনা যায় না। কিন্তু বোঝা যায়, তিনি কথা বলছেন। কার সঙ্গে? চোখে দেখা যায় না। তবু সেই অদৃশ্য সংলাপের ভেতরেই যেন তাঁর দিনের শুরু।
এই দৃশ্যটাই আসলে প্রশ্ন তোলে। প্রার্থনা আর বিশ্বাস—এগুলো ঠিক কী করে মানুষের ভেতরে? কেবল অভ্যাস? নাকি এর ভেতরে এমন এক কাজ চলে, যেটা চোখে ধরা পড়ে না, কিন্তু জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে?
“অসম্ভবকে সম্ভব করে”—এই কথাটা আমরা প্রায়ই শুনি। শুনতে ভালো লাগে, একটা ভরসা দেয়। কিন্তু একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবলে মনে হয়, ব্যাপারটা এত সরল না। প্রার্থনা হঠাৎ করে বাস্তবতা বদলে দেয়—এমনটা ধরে নেওয়া সহজ, কিন্তু পুরোটা নয়। বরং মনে হয়, এটি মানুষের ভেতরে এক ধরনের নীরব সরে যাওয়া ঘটায়। খুব সূক্ষ্ম। বাইরে থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু ভেতরে জমতে থাকে।
বিশ্বাসের জায়গাটা এখানেই গুরুত্বপূর্ণ। একে অন্ধ আস্থা ভাবলে ভুল হবে। বরং এটা একধরনের মানসিক অবস্থান—যেখানে মানুষ পুরো নিশ্চিত না হয়েও সম্ভাবনাকে একেবারে বাতিল করে না। “হয়তো পারি”—এই ভাবনাটা। খুব ছোট একটা জায়গা, কিন্তু এখান থেকেই চেষ্টা শুরু হয়।
ধরা যাক, একজন চাকরি হারিয়েছে। প্রথম ধাক্কায় সে থেমে যায়। দিন কেটে যায়। তারপর একদিন বসে—পুরোনো সিভিটা খুলে। কিছু ঠিক করে, কিছু বাদ দেয়। দু-একটা জায়গায় পাঠায়। সবই ছোট ছোট কাজ। কিন্তু এই শুরুটা আসে কোথা থেকে? সম্ভবত সেই ক্ষীণ বিশ্বাস থেকে, যেটা তাকে পুরোপুরি ভেঙে পড়তে দেয়নি।
মনোবিজ্ঞানে যাকে স্বয়ং-সম্পূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী বলা হয়, সেটাও এখানে কাজ করে। আমরা নিজের সম্পর্কে যা ভাবি, সেটাই ধীরে ধীরে আমাদের আচরণে ঢুকে পড়ে। “আমি পারব না”—এই ধারণা মানুষকে থামিয়ে দেয়। আবার “চেষ্টা করে দেখি”—এই ভাবনা তাকে এগোতে বাধ্য করে। ফল তখন আর কেবল বাইরের অবস্থার ওপর নির্ভর করে না।
প্রার্থনার জায়গাটা একটু আলাদা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়—একটা ধর্মীয় আচার। কিন্তু ভেতরে এর কাজটা অন্যরকম। এটি মানুষকে থামায়। জোর করে। সারাদিনের অস্থিরতার ভেতর হঠাৎ একটু নীরবতা এনে দেয়। সেই নীরবতায় মানুষ নিজের সঙ্গে বসে—ভয়, অনিশ্চয়তা, অপরাধবোধ—সবকিছুর মুখোমুখি হয়।
এখানে একটা ভারসাম্য তৈরি হয়। একদিকে নিজের সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়া, অন্যদিকে কোনো বড় কিছুর ওপর আস্থা রাখা। বিজ্ঞান একে প্ল্যাসিবো প্রভাব বলতে পারে, বিশ্বাসী একে রহমত বলে। নাম আলাদা, অভিজ্ঞতাটা হয়তো কাছাকাছি।
তবে অস্বস্তিকর দিকটাও আছে। এই একই বিশ্বাস কখনো মানুষকে বাস্তবতা থেকে সরিয়ে দেয়। আমরা দেখি—কেউ অসুস্থ, কিন্তু চিকিৎসা না নিয়ে শুধু দোয়ায় ভরসা করছে। কেউ ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়ে আছে, তবু হিসাব না মিলিয়ে “ভরসা রাখলেই হবে” বলে বসে আছে। এই জায়গায় প্রার্থনা আর শক্তি থাকে না; বরং এড়িয়ে যাওয়ার অজুহাত হয়ে ওঠে।
তাই প্রার্থনা আর বিশ্বাসকে আলাদা করে দেখলে ভুল হবে। এগুলোর পাশে কাজ না থাকলে, সিদ্ধান্ত না থাকলে—সবকিছু ফাঁপা হয়ে যায়। আসল শক্তিটা তখনই আসে, যখন ভেতরের স্থিরতা আর বাইরের প্রচেষ্টা একসঙ্গে চলে। প্রার্থনা মানুষকে ভেতর থেকে প্রস্তুত করে, আর কাজ তাকে সামনে ঠেলে দেয়।
আরেকটা জিনিস চোখে পড়ে। প্রার্থনা মানুষকে একা থাকতে দেয় না। অন্তত মনে হয়, কেউ আছে। এই অনুভূতিটাই কঠিন সময় পার করার জন্য যথেষ্ট। মানুষ ভেঙে পড়ে না এত সহজে। নিজেকে টেনে তোলে, আবার চেষ্টা করে।
এই সহনশীলতাই হয়তো আসল শক্তি। প্রার্থনা অলৌকিক কিছু নয়; বরং মানুষের নিজের সঙ্গে করা এক ধরনের নীরব চুক্তি—আমি ভাঙব না, যত কঠিনই হোক।
তবু প্রশ্নটা থেকে যায়। তাহলে অসম্ভবকে সম্ভব করে কে—প্রার্থনা, না পরিশ্রম? নাকি এই দুটো আসলে আলাদা কিছু না, একই শক্তির দুই রূপ?
হয়তো “অসম্ভব” শব্দটা বাস্তবতার দেয়াল না। অনেক সময় সেটা আমাদের নিজের ভেতরের সীমা। আর প্রার্থনা ও বিশ্বাস—নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে—সেই সীমাটাকেই একটু সরিয়ে দেয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।