হাসির আড়ালে চিৎকার
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ০১ ডিসেম্বর ২০২৫
“আজকের তরুণরা হাসে, কিন্তু তারা কি সত্যিই হাসছে?”
আমি আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, আমার বন্ধু রাহাত গ্রুপ চ্যাটে লিখেছে, “সব ঠিক আছে রে, চিল কর।” তারপর দুপুরে জানতে পারলাম, গত রাতে সে হাসপাতালে ভর্তি। ওভারডোজ। হাসতে হাসতে বলেছিল, “ভাই আমি ঠিক আছি।” কিন্তু ঠিক ছিল না।
আমরা এখন এমন একটা জেনারেশন যারা হাসির ইমোজি দিয়ে “আমি একদম ফাইন” লিখি, কিন্তু রাতে বালিশ ভিজিয়ে ফেলি। আমার ক্লাসের মেধাবী মেয়ে তানিয়া, যে সবাইকে মোটিভেশনাল স্পিচ দিত, সে গত মাসে নিজের হাত কেটেছিল। আমরা কেউ জানতাম না। কারণ তার ইনস্টায় সবসময় ফিল্টার লাগানো হাসি।
আমার নিজের কথাই বলি। আমি চাকরি পেয়েছি, বেতন ভালো, বাসা থেকে বলে, “তুই তো এখন সেট।” কিন্তু প্রতি রাতে আমি ভাবি, কালকে যদি আমাকে বস বলে, “তোমার পারফরম্যান্স খারাপ”, তাহলে কী হবে? আমার ব্যাঙ্কে টাকা আছে, কিন্তু মনে শান্তি নেই। আমি বাসায় ফোন করলে মা বলেন, “আরেকটা ফ্ল্যাট কিনে ফেল, বিয়ে করে ফেল।” আমি বলতে পারি না যে, আমার ঘুম আসে না, আমার বুকের ভিতরটা কেমন চিনচিন করে। বললে ওরা বলবে, “এত কিছু পেয়েও অসুখী?”
গত সপ্তাহে আমার এক্সের সঙ্গে দেখা। সে বলল, “তুই তো এখন অনেক হ্যাপি।” আমি হাসলাম। আসলে তার সঙ্গে দুই বছরের সম্পর্ক ভেঙে আমি এখনো রাতে তার চ্যাট খুলে দেখি। কিন্তু সেটা কাউকে বলা যায় না। বললে লোকে বলবে, “মুভ অন কর।” মুভ অন করা এত সহজ না।
আমরা সবাই একটা রেসে দৌড়াচ্ছি যার ফিনিশ লাইন কেউ দেখায়নি। পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকরি, চাকরি করে বিয়ে, বিয়ে করে বাচ্চা, বাচ্চা হলে তারপর আবার তার পড়াশোনা-চাকরি-বিয়ে। এই চক্রের মাঝে কোথাও নিজের জন্য দাঁড়ানোর জায়গা নেই। আমি যখন বলি, “আমি একটু ব্রেক নিতে চাই”, তখন সবাই বলে, “পাগল হয়েছিস? এখন তো ক্যারিয়ার বানানোর সময়!”
আমার ছোট ভাই, ক্লাস টেনে পড়ে। সে গতকাল বলল, “দাদা, আমার বন্ধুরা সব ফেসবুকে গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে ছবি দিচ্ছে, আমার কেউ নেই। আমি কি লুজার?” আমি কী বলব? আমি নিজেও তো জানি না, সম্পর্ক ছাড়া মানুষ কীভাবে বাঁচে, আর সম্পর্ক থাকলে কীভাবে বাঁচে।
আমরা হাজারটা ফ্রেন্ডলিস্টে আছি, কিন্তু রাত তিনটায় যখন বুক ধড়ফড় করে, তখন কার ফোন ধরব? কাকে বলব যে আমার মনে হচ্ছে আমি বাঁচতে চাই না? বললে লোকে বলবে, “ড্রামা করিস না।” তাই আমরা চুপ করে থাকি। আর চুপ করে থাকতে থাকতে একদিন সত্যিই চুপ হয়ে যাই।
আমি জানি না সমাধান কী। আমি শুধু জানি, আমি আর পারছি না এই হাসি-হাসি মুখোশ পরে থাকতে। আমি চাই একদিন কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করুক, “সত্যিই কেমন আছিস?” আর আমি যেন বলতে পারি, “খারাপ আছি। খুব খারাপ।” আর সে যেন না বলে, “চিয়ার আপ”, শুধু পাশে বসে থাকে।
তাই আজ থেকে আমি চেষ্টা করব। যাকে ভালোবাসি, তাকে বলব। যে কষ্টে আছে, তার কাছে যাব। ফোন রেখে চোখে চোখ রেখে কথা বলব। ভুল করলে স্বীকার করব। কাঁদতে ইচ্ছে করলে কাঁদব। আর যদি কেউ বলে, “তুই এখন অনেক উইক”, আমি বলব, “হ্যাঁ, আমি উইক। কিন্তু অন্তত আমি সত্যি।”
আমরা হয়তো পারফেক্ট হতে পারব না। কিন্তু অন্তত একটু সত্যি হতে পারি।
এটুকু তো পারি, তাই না?
আজ অন্তর খুঁজে বের করুন। লিখুন, বলুন, ভাগ করুন—একটা সত্যি সংযোগ তৈরি করুন।
#ভিতরের_কষ্ট #হাসির_আড়ালে
#আমিও_একা #মুখোশের_পিছনে
#বলতে_ইচ্ছে_করে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।