যে ঋণের কোনো হিসাব নেই
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ২১ আগস্ট ২০২৬
মানুষের জীবনে কিছু ঋণ থাকে, যেগুলো শোধ করার জন্য কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট লাগে না। কেউ টাকা ধার দেয়নি। কোনো কাগজে সই হয়নি। তবু একটা অদৃশ্য খাতা খুলে যায়।
সেখানে লেখা থাকে—বাবা-মায়ের জন্য কী করেছি, ভাইয়ের জন্য কী করেছি, বোনের জন্য কতটা ছেড়েছি, সন্তানের জন্য কত রাত জেগেছি।
খাতাটা কেউ দেখেও না। অথচ তার হিসাব মানুষ নিজের ভেতরে সারাজীবন বয়ে বেড়ায়।
আমাদের অনেকের জীবন আসলে এমনই।
ছোটবেলায় শুনেছি, “তোমাকে মানুষ করতে কত কষ্ট করেছি।”
বড় হয়ে শুনি, “সংসারের জন্য তো একটু ছাড় দিতেই হয়।”
আর বয়স বাড়লে হয়তো নিজের মনেই বলি, “এখন আমার নিজের কথা ভাবলে কি স্বার্থপর হয়ে যাব?”
কথাগুলো আলাদা। কিন্তু ভেতরের হিসাবটা একই।
আমি কতটা নিয়েছি, আর তার বদলে কতটা দেওয়া এখনও বাকি?
এই প্রশ্নটা কখনো কখনো এত গভীরে ঢুকে যায় যে মানুষ নিজের ইচ্ছাকেও অপরাধ মনে করতে শুরু করে।
একজন ছেলে ভালো চাকরির সুযোগ পেয়েও বাড়ি ছাড়ে না। বাবার শরীর ভালো নয়।
একজন মেয়ে নিজের পড়াশোনা বা ক্যারিয়ারের একটা সুযোগ ছেড়ে দেয়। ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ আছে।
কেউ নিজের জন্য একটা ছোট ঘর বানানোর স্বপ্নটা পিছিয়ে দেয়। সন্তানের স্কুলের বেতন, বাড়িভাড়া, ওষুধ—সব মিলিয়ে মাস শেষ হওয়ার আগেই টাকা শেষ।
এসব ত্যাগের গল্প।
কিন্তু সব ত্যাগের গল্পের শেষটা সুন্দর হয় না।
কখনো কখনো সেই মানুষটিই একদিন চুপচাপ বসে ভাবে,
আমি সবার জন্য এত কিছু করলাম, কিন্তু আমার জন্য কে করল?
প্রশ্নটা শুনতে স্বার্থপর লাগে।
কিন্তু সত্যিই কি স্বার্থপর?
আমরা খুব সহজে দায়িত্ব আর আত্মবিসর্জনকে এক করে ফেলি।
বাবা-মায়ের পাশে থাকা দায়িত্ব।
সন্তানের জন্য পরিশ্রম করা দায়িত্ব।
ভাইবোনের বিপদে পাশে দাঁড়ানো ভালোবাসা।
কিন্তু নিজের সমস্ত ইচ্ছা, সময়, স্বপ্ন, স্বাধীনতা, সবকিছু যদি একে একে বন্ধক রাখতে হয়, তখন কি সেটাকে এখনও শুধু দায়িত্ব বলা যায়?
নাকি কোথাও গিয়ে দায়িত্বের সঙ্গে অপরাধবোধ মিশে গেছে?
আমাদের সমাজে এই অপরাধবোধের ব্যবহার খুব স্বাভাবিক।
“তোমার জন্য এত কিছু করেছি।”
“আমরা কি তোমার জন্য কম করেছি?”
“এখন নিজের কথা মনে পড়ছে?”
কথাগুলো অনেক সময় রাগের মাথায় বলা হয়। আবার অনেক সময় সত্যিই বলা হয়।
কিন্তু যে মানুষটি কথাগুলো শোনে, তার ভেতরে কী হয়?
সে হয়তো প্রতিবাদ করে না।
চুপ করে যায়।
নিজের পরিকল্পনাটা বাদ দেয়।
আর নিজেকেই বোঝায়,
থাক, পরে করব।
সেই “পরে” শব্দটা ভয়ংকর।
কারণ জীবনে অনেক কিছুই পরে করার জন্য রেখে দিলে একদিন দেখা যায়, পরে আর আসেনি।
সন্তান বড় হয়ে গেছে।
বাবা-মা বৃদ্ধ হয়েছেন।
চাকরির বয়স পেরিয়ে গেছে।
শরীর আগের মতো নেই।
যে স্বপ্নটা একসময় খুব জরুরি মনে হয়েছিল, সেটার কথা মনে পড়লে এখন নিজেকেই অচেনা লাগে।
আমার নিজেরও কিছু ইচ্ছা আছে, যেগুলোকে জীবনের নানা ব্যস্ততার মধ্যে বারবার বলেছি—পরে করব।
এখন ভাবি, সেই “পরে” শব্দটারও তো একটা বয়স আছে।
তখন হয়তো বোঝা যায়, আমরা শুধু অন্যদের জন্য দায়িত্ব পালন করিনি; নিজের জীবনটাকেও একটু একটু করে পিছিয়ে দিয়েছি।
তবে এর মানে এই নয় যে পরিবার ছেড়ে নিজের মতো বাঁচতে হবে।
না।
বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব থাকবে। সন্তানের প্রতি দায়িত্ব থাকবে। প্রিয় মানুষের প্রতি দায় থাকবে।
কিন্তু ভালোবাসা যদি সত্যি ভালোবাসা হয়, সেখানে মানুষের নিজের জন্যও একটু জায়গা থাকবে।
একজন বাবা সন্তানের জন্য সবকিছু করবেন—কিন্তু সন্তানের জীবনটাও নিজের অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণের জায়গা হতে পারে না।
একজন সন্তান বাবা-মায়ের পাশে থাকবে—কিন্তু তার নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারটাও থাকতে হবে।
একজন ভাই বোনকে সাহায্য করবে—কিন্তু সেই সাহায্যের বিনিময়ে বোনের সারাজীবনের কৃতজ্ঞতা দাবি করা কি ভালোবাসা?
হয়তো সম্পর্কের সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা এখানেই।
কৃতজ্ঞতা চাওয়া যায়, কিন্তু কৃতজ্ঞতার বিনিময়ে কারও জীবন চাওয়া যায় না।
ভালোবাসা মানুষকে ঋণী করে—এটা সত্যি।
কিন্তু সেই ঋণ যেন কারাগার না হয়ে যায়।
কারণ একদিন মানুষকে নিজের কাছেও জবাব দিতে হয়।
সেদিন হয়তো বাবা-মা থাকবেন না। সন্তানের নিজের সংসার হবে। ভাইবোন যার যার জীবনে ব্যস্ত থাকবে। চারপাশের মানুষও হয়তো আর আগের মতো থাকবে না।
থাকবে শুধু আপনি।
আর আপনার ভেতরের সেই পুরোনো প্রশ্ন,
“সবার জন্য এতটা বাঁচলাম। নিজের জন্য কতটা?”
হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের একটু আগেই খুঁজে নেওয়া দরকার।
দায়িত্ব থাকবে। ভালোবাসা থাকবে। প্রয়োজন হলে নিজের স্বার্থও সরিয়ে রাখতে হবে।
কিন্তু নিজের অস্তিত্বটাকে পুরোপুরি মুছে ফেলার নাম তো ভালোবাসা হতে পারে না।
শেষ পর্যন্ত মানুষ শুধু কারও সন্তান নয়, শুধু কারও বাবা-মা নয়, শুধু কারও ভাই বা বোন নয়।
এই সব পরিচয়ের ভেতরেও একজন মানুষ থাকে।
তারও কিছু কথা থাকে, যা কাউকে বলা হয়নি।
কিছু ইচ্ছে থাকে, যা বারবার পিছিয়ে গেছে।
কিছু স্বপ্ন থাকে, যেগুলো সংসারের আলমারির ওপর রাখা পুরোনো বাক্সের মতো ধুলো জমিয়ে পড়ে থাকে।
সেই বাক্সটা কি একদিন খোলা যাবে?
নাকি জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার পর বুঝব,
যে ঋণ শোধ করতে করতে সারাজীবন কাটালাম, তার কোনো হিসাবই আসলে ছিল না।
নিজের জন্য একটু সময় চাওয়া অপরাধ নয়, এটা বেঁচে থাকার শর্ত।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।