নারী নিরাপত্তা: বাস্তবতা কোথায় দাঁড়িয়ে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। মে ০৭, ২০২৬
গত সপ্তাহে মিরপুরে এক তরুণী রাত ১০টায় থানায় গিয়ে ফিরে এসেছে অভিযোগ না নেওয়ায়। খবরটা নতুন না। শুধু তারিখটা বদলায়, ঘটনা প্রায় একই থাকে।
নারী নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলা এখন আর নতুন কিছু না। তবু প্রশ্নটা থেকে যায়—আমরা কি সত্যিই নিরাপদ হচ্ছি, নাকি নিরাপত্তার একটা ধারণা তৈরি করে তাতে স্বস্তি খুঁজছি?
এই প্রশ্নের সরল উত্তর নেই। একদিকে অগ্রগতির গল্প—শিক্ষা, কাজ, দৃশ্যমান অংশগ্রহণ। অন্যদিকে প্রতিদিনের খবর, যেগুলো ভিন্ন কিছু ইঙ্গিত করে। এই দুইয়ের মাঝখানে যে অস্বস্তিকর ফাঁক, সেটাই আসলে আলোচনার জায়গা।
প্রথমেই একটা সীমা টানা দরকার। নারী নিরাপত্তা বলতে আমরা অনেক সময় শুধু পাবলিক স্পেস বুঝি। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা অন্য কথা বলে। ঘরের ভেতর, পরিচিত মানুষের মধ্যে, এমনকি অনলাইনেও অনিরাপত্তা কাজ করে। ফলে সমস্যাটা নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় আটকে নেই।
শহরকে আমরা তুলনামূলক নিরাপদ ভাবতে অভ্যস্ত। এর পেছনে কিছু বাস্তব যুক্তিও আছে—নজরদারি, দ্রুত যোগাযোগ, প্রশাসনিক উপস্থিতি। কিন্তু এই কাঠামো সবসময় কাজ করে কি না, সেটাই আসল প্রশ্ন। অনেক ঘটনায় অভিযোগই হয় না। আর যেগুলো হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রেও বিচার পেতে দীর্ঘ সময় লাগে।
আইনে বলা আছে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। বাস্তবে এই সময়সীমা প্রায়ই কয়েক বছরে গড়ায়। এই ব্যবধান কেবল প্রশাসনিক না, এটি ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতাকেও বদলে দেয়। বিচার দেরি হলে সেটা আংশিকভাবে অস্বীকারের মতো মনে হতে পারে।
গ্রামের বাস্তবতা আবার অন্যরকম। সেখানে সমস্যা শুধু আইনি না, সামাজিকও। সম্পর্ক, প্রভাব, স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য—এসব বিষয় সত্য প্রকাশের পথকে অনেক সময় সংকুচিত করে। ফলে নিরাপত্তা একটা প্রশাসনিক বিষয় থেকে বেরিয়ে সামাজিক কাঠামোর অংশ হয়ে যায়।
আইনের কাঠামো অনুপস্থিত না। বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা আছে। কিন্তু আইন থাকা আর প্রয়োগ হওয়া এক জিনিস না। অভিযোগ নিতে অনীহা, তদন্তে ধীরগতি—এসব নিয়ে প্রশ্ন নতুন না। রাতের বেলা থানায় গিয়ে অভিযোগ নিতে না চাওয়ার ঘটনাও শোনা যায়। এগুলো বিচ্ছিন্ন কি না, সেটা বিতর্কের বিষয় হতে পারে, কিন্তু একেবারে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।
এখানে এসে দায়ের প্রশ্নটা জটিল হয়। সব দায় প্রশাসনের ওপর চাপালে হয়তো পুরো চিত্রটা ধরা পড়ে না। সামাজিক মানসিকতাও এখানে কাজ করে।
ভুক্তভোগীর প্রতি সন্দেহ বা প্রশ্ন তোলার প্রবণতা এখনো আছে। কেন সেখানে গিয়েছিল, কীভাবে ছিল—এই প্রশ্নগুলো আলোচনার কেন্দ্র সরিয়ে দেয়। অপরাধীর পরিবর্তে ভুক্তভোগীই আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। আগেই বলা ভিকটিম ব্লেমিংয়ের সংস্কৃতি এখানেই আবার সামনে আসে।
বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা বিষয়টাকে আরও কঠিন করে। একটি মামলা বছরের পর বছর চলতে থাকলে, সেটি শুধু আইনি প্রক্রিয়া থাকে না—এটি মানসিক চাপেরও উৎস হয়ে দাঁড়ায়।
প্রযুক্তি এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যোগাযোগ সহজ হয়েছে, কিন্তু ঝুঁকিও বেড়েছে। অনলাইন হয়রানি বা ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার এখন পরিচিত সমস্যা। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯-এ কল করলে অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়—এটা একটি অগ্রগতি। কিন্তু বাস্তবে যদি ভুক্তভোগীর ফোনে ডাটা সংযোগ না থাকে, বা ফোন ব্যবহার করার সুযোগ না থাকে, তখন এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা কতটা থাকে—এই প্রশ্ন উঠতেই পারে।
পরিবারের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে প্রথম সিদ্ধান্তটা নেওয়া হয় এখানেই—অভিযোগ করা হবে, না চুপ থাকা হবে। “মানুষ কী বলবে” এই ভাবনা অনেক সময় বাস্তব বিচারকে পেছনে ঠেলে দেয়।
তাহলে সমাধান কোথায়?
একক কোনো উত্তর এখানে নেই। আইনের দ্রুত প্রয়োগ প্রয়োজন—এটা প্রায়ই বলা হয়, এবং কিছুটা যুক্তিসঙ্গতও। দৃশ্যমান বিচার অপরাধ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
শিক্ষার কথাও আসে, তবে সেটার ধরন নিয়ে ভাবার জায়গা আছে। শুধু তথ্য না, আচরণ—সম্মান, সীমা, দায়িত্ব—এসব কতটা শেখানো হচ্ছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এটি যেমন ঝুঁকি তৈরি করে, তেমনি সমাধানের অংশও হতে পারে। ব্যবহারের ধরনটাই এখানে মূল বিষয়।
সবশেষে, মানসিকতার প্রশ্নটা এড়ানো যায় না। এটি ধীর পরিবর্তনের জায়গা। তবু অপরাধীর দায় স্পষ্টভাবে চিহ্নিত না করলে অন্য কোনো উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে কাজ করবে কি না, সেটা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
নারী নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত—এমন দাবি করা কঠিন। আবার সবকিছুই ব্যর্থ—এটাও পুরো সত্য না। বাস্তবতা হয়তো এই দুইয়ের মাঝামাঝি কোথাও দাঁড়িয়ে আছে।
আলোচনা দরকার। কিন্তু আলোচনাই যদি শেষ গন্তব্য হয়, তাহলে ১৮০ দিনের মামলা ৩ বছরেও শেষ হবে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।