আলোর ওপারে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা। ১৭ অক্টোবর ২০২৬
বাবার মৃত্যুর পর কিছুদিন আমি একটা অদ্ভুত কাজ করতাম। ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকেই মনে হতো, বাবা হয়তো কোথাও আছেন। পাশের ঘরে, বারান্দায়, কিংবা এমন কোনো জায়গায়, যেখানে একটু পরেই তাঁকে দেখা যাবে।
তারপর মনে পড়ত, বাবা আর নেই।
এই মনে পড়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে কষ্টের ছিল। একবার নয়, বারবার। যেন মন খবরটা পেয়েছে, কিন্তু এখনো বিশ্বাস করতে রাজি হয়নি।
বাবার চেয়ারটা আগের জায়গাতেই ছিল। ঘরের জিনিসপত্রও বদলায়নি। অথচ ঘরটা কেমন অচেনা হয়ে গিয়েছিল। আগে যেসব জায়গা দিয়ে হেঁটে গেলে বাবার কথা মনে হতো না, সেখানেও তাঁকে খুঁজতাম। কোনো কথা শুনলে মনে হতো, বাবাকে বললে ভালো হতো। কোনো সমস্যায় পড়লে মনে হতো, একবার তাঁর সঙ্গে কথা বলি।
তারপর থেমে যেতাম।
ফোনটা হাতে নিয়ে আবার রেখে দেওয়ার মতো একটা অনুভূতি হতো। যাঁকে সারা জীবন প্রয়োজনে কাছে পাওয়ার অভ্যাস ছিল, তাঁকে আর কোনো প্রয়োজনে ডাকা যাবে না। এই কথাটা জানার পরও মন যেন মাঝেমধ্যে ভুল করে বসত।
গীতায় পড়েছিলাম, আত্মার মৃত্যু নেই। তখন কথাটার অর্থ নিয়ে এতটা ভাবিনি। কোরআনেও পড়েছি, “নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই কাছে ফিরে যাব।” (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৬)
দুটি ভিন্ন ধর্মগ্রন্থের কথা, অথচ বাবাকে হারানোর পর দুটিই নতুন করে মনে পড়েছে। কিন্তু বাবার চেয়ারটা খালি দেখে কোনো ধর্মগ্রন্থের কথাই আমাকে সেই শূন্যতা থেকে সরিয়ে নিতে পারেনি। কথাগুলো মনে পড়েছে, বিশ্বাসও করতে চেয়েছি। কিন্তু যে মানুষটাকে আর ডাকতে পারব না, তাঁর অনুপস্থিতি তো আর তাতে কমে যায়নি।
বাবার সঙ্গে আমার শেষ দিকের কিছু স্মৃতি বারবার মনে পড়ে। হাসপাতালে তাঁর পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম। শরীরটা তখন অসুস্থতায় ভেঙে পড়েছে। তবু আমার বাম হাতে ব্যথা হচ্ছে কি না, বাবা সেটা খেয়াল করেছিলেন। বলেছিলেন, “তুই ডান হাত দিয়ে টিপ, তোর বাম হাতে ব্যথা তো!”
নিজের কষ্টের মধ্যেও ছেলের হাতের ব্যথা মনে রাখা মানুষটা আজ নেই। অথচ কথাটা আমি ভুলিনি। কখনো হঠাৎ মনে পড়ে যায়। তখন মনে হয়, মানুষ চলে গেলে তার সবকিছু কি সত্যিই চলে যায়?
আমি জানি না, মৃত্যুর ওপারে কী আছে। আত্মা কোথায় থাকে, আদৌ কীভাবে থাকে, সেসব প্রশ্নের উত্তরও আমার জানা নেই। শুধু এটুকু জানি, বাবাকে হারানোর পরও আমার ভেতরে এমন অনেক জায়গা আছে, যেখানে তিনি আগের মতোই রয়ে গেছেন।
কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আজও মনে হয়, বাবা থাকলে কী বলতেন। নিজের অসহায় মুহূর্তে মনে পড়ে, একটা সময় এমন একজন মানুষ ছিলেন, যাঁর কাছে কিছু না লুকিয়েও থাকা যেত। এখন তাঁকে কিছু বলতে হলে কথাগুলো নিজের মনেই বলতে হয়।
উত্তর আসে না।
কখনো মনে হয়, বাবার সঙ্গে আরও কিছু কথা বলা বাকি ছিল। এমন কোনো বড় কথা নয়। হয়তো সেদিনের একটা সাধারণ ঘটনা, হয়তো নিজের কোনো দুশ্চিন্তা, হয়তো এমন কিছু, যা বলতে বলতে তিনি অন্য প্রসঙ্গে চলে যেতেন। তখন বুঝিনি, সাধারণ কথাগুলোও একদিন অসম্ভব দামি হয়ে উঠতে পারে।
এখন ঘরে ঢুকলে মাঝেমধ্যে চেয়াটার দিকে চোখ যায়। মনে হয়, মানুষটা থাকলে হয়তো এখানেই বসে থাকতেন। আমি পাশ দিয়ে চলে যেতাম, নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তাম। হয়তো কোনো কথার উত্তর দিতে বিরক্ত হতাম। হয়তো বলতাম, পরে কথা বলব।
সেই ‘পরে’ আর আসেনি।
কোরআনের সূরা আলে ইমরানের ১৮৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।” কথাটা আমরা জানি। অন্যের মৃত্যুতে শুনি, নিজের কাছের কেউ চলে গেলে আবার মনে পড়ে। তবু যে মানুষটিকে প্রতিদিনের জীবনের অংশ বলে ভেবেছি, তাঁর অনুপস্থিতি মেনে নেওয়া শুধু একটি সত্য জেনে নেওয়ার মতো সহজ নয়।
মৃত্যু নিয়ে অনেক কথা বলা যায়। আত্মা অমর কি না, জীবন কোথা থেকে আসে, মৃত্যুর পর কী থাকে। কিন্তু একজন মানুষ চলে যাওয়ার পর তাঁর ঘরে দাঁড়িয়ে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে চোখ প্রথমে যায় তাঁর চেনা জায়গাটার দিকে। যেখানে তিনি বসতেন। যে দরজাটা দিয়ে ঢুকতেন। যে কণ্ঠে একসময় নাম ধরে ডাকতেন।
সেই জায়গাগুলো তখন আর শুধু জায়গা থাকে না।
বাবার ঘরের বাতিটা এখনো জ্বালিয়ে রাখি। জানি না, ওপারে আলো আছে কি না। কিন্তু এই ঘরে আলোটা থাকুক।
কখনো দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলে আজও এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়, বাবা হয়তো কোথাও আছেন।
তারপর ঘরটা দেখি।
আর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।