ভিড়টা কোথায় গেল?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ২২ আগস্ট ২০২৬
“যে সমাজ একজন মানুষকে সম্মান দেয়, সেই সমাজই আবার তার বিপদের সময় দরজা বন্ধ করে দেয়।”
সামাজিক মর্যাদার কোনো মাপযন্ত্র নেই। কোনো সনদ নেই, নির্দিষ্ট দামও নেই। তবু আমরা প্রতিদিন মানুষের মূল্য নির্ধারণ করি—সে কী কাজ করে, কত টাকা আয় করে, কোথায় থাকে, কোন প্রতিষ্ঠানে পড়েছে, কার সঙ্গে ওঠাবসা করে, তার পরিবার কতটা পরিচিত।
কখনো কখনো মানুষটির সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগেই তার সম্পর্কে আমাদের ধারণা তৈরি হয়ে যায়।
একজন ডাক্তার হলে তার কথা মন দিয়ে শুনি। বড় ব্যবসায়ী হলে তার মতামতের গুরুত্ব বাড়ে। উচ্চপদে থাকলে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য সময় বের করি।
কিন্তু একই মানুষটি চাকরি হারালে?
ব্যবসায় লোকসান হলে?
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকলে?
হঠাৎ ঋণের মধ্যে পড়ে গেলো?
তখন আমাদের আচরণ কতটা একই থাকে?
এই প্রশ্নের উত্তরটাই আসলে বলে দেয়—আমরা মানুষকে সম্মান করি, নাকি তার অবস্থানকে।
মর্যাদা কোথা থেকে আসে?
টাকা সামাজিক মর্যাদা তৈরি করে—এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।
পেশাও করে।
শিক্ষা করে।
পরিবারের পরিচয়ও করে।
একজন মানুষের আয় বাড়লে তার চারপাশের মানুষের আচরণও অনেক সময় বদলে যায়। আগে যে কথাগুলো কেউ গুরুত্ব দিয়ে শুনত না, সেগুলোই হঠাৎ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নতুন গাড়ি আসে।
বড় বাসা হয়।
সন্তান নামী প্রতিষ্ঠানে পড়ে।
পরিচিত মানুষের তালিকা বড় হয়।
আর মানুষটিও ধীরে ধীরে সমাজের চোখে “গুরুত্বপূর্ণ” হয়ে ওঠে।
কিন্তু এই মর্যাদার একটা অস্বস্তিকর দিক আছে।
এটা অনেক সময় মানুষের সঙ্গে নয়, তার অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সফলতার চারপাশে ভিড়
সফল মানুষের চারপাশে মানুষের ভিড় থাকে।
অভিনন্দন থাকে। নিমন্ত্রণ থাকে। যোগাযোগ থাকে। পুরোনো পরিচিতরাও নতুন করে খোঁজ নেয়।
কারণ সাফল্যের সঙ্গে সম্ভাবনা জড়িয়ে থাকে।
কাজের সুযোগ।
প্রভাব।
পরিচিতি।
কখনো সুবিধা।
কিন্তু মানুষটি যখন ব্যর্থ হয়, দৃশ্যটা দ্রুত বদলে যায়।
চাকরি চলে গেছে।
ব্যবসা বন্ধ হয়েছে।
অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ।
তখন ফোনের সংখ্যা কমে যায়।
দাওয়াত কমে যায়।
আড্ডায় তার প্রয়োজন কমে যায়।
কেউ কেউ এমনভাবে দূরে সরে যায়, যেন সম্পর্কটা কোনোদিন ছিলই না।
ব্যর্থতার সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হয়তো অর্থের ক্ষতি নয়।
নিজের চারপাশের মানুষগুলোকে নতুন করে চিনে ফেলা।
পরিবারের নামও এক ধরনের পুঁজি
আমাদের সমাজে একজন মানুষের নিজের পরিচয়ের পাশাপাশি তার পরিবারের পরিচয়ও মর্যাদা তৈরি করে।
বাবা কী করেন।
কোথায় থাকেন।
কোন পরিবারের সন্তান।
কোন প্রতিষ্ঠানে পড়েছেন।
কার সঙ্গে সম্পর্ক আছে।
এসবের ওপর ভিত্তি করে একজন মানুষকে অনেক সময় আগেই একটা সামাজিক অবস্থান দিয়ে দেওয়া হয়।
ফলে কেউ নিজের যোগ্যতার চেয়ে বেশি সম্মান পায়, আবার কেউ নিজের যোগ্যতার চেয়েও কম।
শুধু জন্মপরিচয়ের কারণে একজনকে বড় বা ছোট করে দেখা হলে সেখানে ন্যায়বিচার কোথায়?
একজন মানুষ তার পরিবারের ইতিহাস বেছে নেয় না।
কিন্তু নিজের চরিত্র তৈরি করার সুযোগ তার থাকে।
বিপদই আসল পরীক্ষা
সুখের সময়ে পাশে থাকা সহজ।
সফল বন্ধুর সঙ্গে ছবি তোলা সহজ।
ক্ষমতাবান আত্মীয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়া সহজ।
কিন্তু সেই মানুষটি যখন অসুস্থ, বেকার কিংবা ঋণগ্রস্ত, তখন পাশে দাঁড়ানো কঠিন।
কারণ তখন তার কাছ থেকে পাওয়ার মতো কিছু থাকে না।
সেখানেই সম্পর্কের আসল পরীক্ষা।
একজন মানুষ বিপদে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি তার সামাজিক মর্যাদাও কমে যায়, তাহলে হয়তো সেই মর্যাদা কখনো তার নিজের ছিল না।
সমাজ তাকে সেটা ধার দিয়েছিল।
যতদিন তার কাছে টাকা, পদ, ক্ষমতা কিংবা প্রভাব ছিল, ততদিন সে সম্মানিত।
সেগুলো চলে গেলেই সম্মানও চলে গেল।
তাহলে এতদিন আমরা কাকে সম্মান করছিলাম?
মানুষটাকে?
নাকি তার অবস্থানকে?
চরিত্রের মূল্য কোথায়?
টাকা প্রয়োজন।
পেশার গুরুত্ব আছে।
শিক্ষার মূল্য আছে।
অর্জনও অবশ্যই সম্মানের।
কিন্তু এগুলো একজন মানুষের সামাজিক অবস্থান তৈরি করতে পারে; তার মানবিক মূল্য নয়।
মানুষের আসল পরিচয় অনেক সময় বোঝা যায় তখন, যখন তার হাতে ক্ষমতা থাকে না।
সে দুর্বল মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করে?
নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে?
অন্যের সাফল্যে আনন্দিত হতে পারে?
নিজে বিপদে পড়লে যেমন সহানুভূতি চায়, অন্যের বিপদে তেমন সহানুভূতি দেখায়?
এসবের উত্তরেই চরিত্র লুকিয়ে থাকে।
ক্ষমতা চলে যেতে পারে।
টাকা হারাতে পারে।
চাকরি শেষ হতে পারে।
কিন্তু চরিত্র থাকলে মানুষটির ভেতরে কিছু একটা থেকে যায়।
হয়তো আমাদের সামাজিক মর্যাদার সংজ্ঞাটাই বদলানো দরকার।
বড় গাড়িতে চলা মানুষকে সম্মান করা সহজ।
কিন্তু যে মানুষটি নিজের সামর্থ্যের মধ্যে থেকে অসুস্থ প্রতিবেশীর ওষুধ কিনে দেয়, তাকে সম্মান করতে শিখতে হয়।
ক্ষমতাবান মানুষকে সম্মান করা সহজ।
ক্ষমতা না থাকলেও যে অন্যায় করে না, তার মূল্য বুঝতে হয়।
কারণ সমাজ শুধু ধনী, সফল কিংবা ক্ষমতাবান মানুষ দিয়ে তৈরি নয়। সমাজ তৈরি হয় সেই অসংখ্য মানুষের হাতেও, যাদের পদ নেই, পরিচিতি নেই, বড় আয় নেই—তবু যারা প্রতিদিন মানুষের মতো মানুষ হয়ে থাকার চেষ্টা করে।
শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটা খুব সরল,
মানুষের মর্যাদা কি তার অবস্থানের, নাকি তার চরিত্রের?
আর কোনো মানুষ যখন সব হারিয়েও সৎ, সহানুভূতিশীল এবং মানবিক থাকে, তখন তাকে ছোট করে দেখার অধিকার কি সত্যিই আমাদের আছে?
হয়তো সাফল্যের সময় ভিড়টা দেখা যায়।
আসল মানুষগুলোকে দেখা যায় পতনের পর।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।