আমরা বন্দে মাতরম বুঝি কতটা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। মার্চ ৩০, ২০২৬
শেষবার “বন্দে মাতরম” শুনেছিলাম টেলিভিশনের কোন একটি অনুষ্ঠানে । তখন আমি নবম শ্রেণির ছাত্র।
টিভিতে দেখছিলাম কোলকাতার কালীগঞ্জের মাঠে বাঁশের মঞ্চে এ গানটি গাওয়া হচ্ছে, হঠাৎ খেয়াল করলাম মঞ্চে পাশের এক স্যার এত জোরে গাইছিলেন—মনে হচ্ছিল, এটা শুধু গান না, কিছু একটা প্রমাণ করার চেষ্টা।
তখন ভালো লেগেছিল।
এখন মনে হয়—কী প্রমাণ করছিলেন?
“বন্দে মাতরম”—এই শব্দ দুটো নিয়ে কথা বলা সহজ না।
কারণ এগুলো আগে অনুভূতি তৈরি করে, তারপর প্রশ্ন আসে। আমরা সাধারণত উল্টোটা করি।
গানটা উপন্যাস থেকে—এটা জানা কথা। কিন্তু আমরা প্রায়ই এই তথ্যটা পাশ কাটিয়ে যাই।
যেন গানটা আলাদা, গল্পটা আলাদা। আসলে তা না।
উপন্যাসে সন্ন্যাসীরা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়ছে—এটা ঠিক। কিন্তু এটুকু বললে গল্পটা খুব সরল হয়ে যায়।
বাস্তবে জিনিসটা এতটা একরৈখিক ছিল না। দুর্ভিক্ষ ছিল, করের চাপ ছিল, টিকে থাকার লড়াই ছিল।
বঙ্কিম সেই জটিলতাকে সরিয়ে একটা দিক বেশি উজ্জ্বল করেছেন—হয়তো ইচ্ছে করে, হয়তো গল্পের প্রয়োজনে।
আর এখানেই একটু থামতে হয়।
কারণ গল্প যত মসৃণ হয়, বাস্তব ততটাই ঝাপসা হয়ে যায়। আমরা কি সেই ঝাপসা অংশটা দেখতে চাই না, নাকি দেখেও পাশ কাটাই—বোঝা কঠিন।
একবার ক্লাসে স্যার বঙ্কিমচন্দ্র নিয়ে পড়াচ্ছিলেন। আমি তখন জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলাম—মাঠে একটা কুকুর ঘুমাচ্ছিল।
স্যার কী বলছিলেন ঠিক শুনতে পাচ্ছিলাম না। পাশের বেঞ্চে কেউ খাতার শেষ পাতায় কিছু লিখছিল।
মনে হচ্ছিল, ক্লাসটা চলছে, কিন্তু আমি যেন অন্য কোথাও আটকে আছি—জানালার বাইরের ওই কুকুরটা আর ভেতরের শব্দগুলো একসাথে মিশে যাচ্ছিল।
হঠাৎ মনে হয়েছিল—এইসব গল্পের ভেতরে কি এমন শান্ত, সাধারণ কিছু থাকে? নাকি সবসময়ই লড়াই আর ত্যাগ?
আরেকটা অস্বস্তির জায়গা আছে।
“মাতৃভূমি” এখানে দেবীর মতো কল্পিত। অনেকের কাছে এটা শক্তিশালী চিত্র।
কিন্তু প্রশ্নটা রয়ে যায়—এই কল্পনায় সবাই কি সমানভাবে ঢুকতে পারে?
বঙ্কিমচন্দ্রের লেখার ভেতরে এই টানটা বারবার চোখে পড়ে।
একদিকে প্রতিরোধ।
অন্যদিকে সীমা টানা।
তার সময়ে এটা হয়তো স্বাভাবিক ছিল। এখন পড়লে একটু ধাক্কা লাগে।
ধাক্কাটা লেখার কারণে, নাকি আমার সময় বদলেছে—ধরতে পারি না ঠিক।
একবার বাড়িতে কথা উঠেছিল।
আব্বু বললেন, “এই গানটা স্বাধীনতার সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।” আম্মু চুপ ছিলেন।
পরে আলাদা করে বলেছিলেন—“সব গান সবার জন্য না।”
আমাদের বাসায় এসব নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হতো না—ধরে নেওয়া হতো, ইতিহাস মানে বইয়ের ভেতরের জিনিস। ওই কথাটা তখন ঠিক বুঝিনি। এখন মাঝে মাঝে মনে পড়ে।
একই গান। কিন্তু সবাই একভাবে শোনে না।
ভারত ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আলাদা—তাই এই গানের গ্রহণযোগ্যতা, ব্যবহার আর অর্থও ভিন্নভাবে দাঁড়ায়।
এটা স্বাভাবিক—নাকি সমস্যা, সেটাও স্পষ্ট না।
তবু একটা প্রশ্ন থেকে যায়।
যদি প্রেক্ষাপট এত গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে এই গান এখনো মানুষকে নাড়া দেয় কেন?
হয়তো কিছু প্রতীক তাদের উৎস ছাড়িয়ে যায়। হয়তো আমরা নিজেরাই নতুন অর্থ বসিয়ে দিই।
কোনটা ঠিক—বলা মুশকিল।
“বন্দে মাতরম” নিয়ে নিজের অবস্থানটা ঠিক স্থির না।
কখনো মনে হয়—দূরত্ব রেখে পড়া উচিত। আবার কখনো মনে হয়—এই আবেগটা পুরো অস্বীকার করাও কঠিন।
দুটো একসাথে ধরে রাখা সবসময় সহজ না।
কিছু জিনিস পরিষ্কার না থাকলেই বোঝা যায়, ভাবনাটা এখনো শেষ হয়নি।
হয়তো এইটাই দরকার।
একটা প্রশ্ন রেখে যাই—একটা গান, যা কারও কাছে গর্বের, আবার কারও কাছে অস্বস্তির—আমরা এটাকে কীভাবে ব্যবহার করব?
#বন্দেমাতরম #বঙ্কিমচন্দ্র #জাতীয়তাবাদ #বাংলাদেশ #ইতিহাসওরাজনীতি
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।