দেওয়ারও একটা ভাষা আছে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
২৯ অক্টোবর ২০২৬
রাতের খাবার শেষ হতে তখনো কয়েক মিনিট বাকি। বড় ভাই ভাতের থালা সরিয়ে ছোট ভাইকে বললেন, “তোর পড়াশোনার খরচ কে দিয়েছে, মনে আছে? নিজের বিয়েটাও পিছিয়ে দিয়েছিলাম তোর জন্য। আর আজ তুই আমার একটা কথা শুনতে পারবি না?”
ছোট ভাই কোনো উত্তর দিল না। টেবিলে রাখা পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে আবার নামিয়ে রাখল। কথাগুলো মিথ্যা নয়। বড় ভাই সত্যিই তার জন্য অনেক কিছু করেছেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে ছোট ভাইয়ের মনে হলো, নিজের জীবনের একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারটুকুও বুঝি তার নেই।
দুজনের কারও কথাই পুরোপুরি মিথ্যা নয়। বড় ভাইয়ের জীবনে কিছু অপূর্ণতা রয়ে গেছে ছোট ভাইকে এগিয়ে দেওয়ার কারণে। আর ছোট ভাই বড় হয়েও নিজের সিদ্ধান্তের জন্য বারবার পুরোনো হিসাবের সামনে দাঁড়াচ্ছে।
বড় ভাইয়ের মনে ক্ষোভ জমতে পারে। যার জন্য নিজের অনেক ইচ্ছা সরিয়ে রেখেছেন, সে আজ তাঁর কথার বিরোধিতা করছে—এটা মেনে নেওয়া সহজ নয়। কিন্তু সেই কষ্ট থেকেই যখন পুরোনো দিনের হিসাব টেনে এনে বর্তমানের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে চান, তখন সাহায্যের অর্থ বদলে যায়।
একসময় যে মানুষটি ছোট ভাইকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন, তিনি হয়তো খেয়ালই করেন না, এখন সেই ভাইয়ের প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁর অনুমোদন প্রয়োজন হয়ে পড়ছে।
লজ্জার হিসাব
কেউ বিপদের সময় পাশে দাঁড়িয়েছেন, নিজের সঞ্চয় ভেঙে টাকা দিয়েছেন, অসুস্থতার রাতে হাসপাতালে ছুটেছেন। বিপদ কেটে যাওয়ার পর সাহায্য পাওয়া মানুষটি যদি এমন আচরণ করেন, যেন কিছুই ঘটেনি, তাহলে কষ্ট পাওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ধরন সবার এক নয়। কেউ মুখে বলতে পারেন না, কেউ মনে রাখেন কিন্তু প্রকাশ করেন না। আবার কেউ সত্যিই অন্যের অবদানকে নিজের প্রাপ্য বলে ধরে নেন।
এখানেই আরেকটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন আসে। সাহায্য পাওয়ার পর মানুষটি কি নিজের অসহায় সময়টাকে ভুলে যেতে চান? যে হাত একদিন তাঁকে টেনে তুলেছিল, সেই হাতের সামনে নিজের দুর্বলতার স্মৃতি নিয়ে দাঁড়াতে কি তাঁর লজ্জা লাগে?
কখনো কখনো কৃতজ্ঞতা স্বীকার করার বদলে মানুষ উপকারীর অবদানকেই ছোট করে দেখেন। এতে তিনি নিজেকে স্বাধীন প্রমাণ করতে চান, অথচ সম্পর্কের মধ্যে জমে থাকা ক্ষত আরও গভীর হয়।
সাহায্যকারী যদি নিজের অবদানকে ক্ষমতা হিসেবে ব্যবহার করেন, আর সাহায্যগ্রহীতা সেই অবদান অস্বীকার করে নিজের অবস্থান শক্ত করতে চান, তাহলে দুজনেই সম্পর্কটিকে হিসাবের খাতায় নামিয়ে আনেন।
দেওয়ার ভারও আছে
যিনি সব সময় দেন, তাঁর দেওয়াটাও একসময় পরিবারের প্রত্যাশা হয়ে উঠতে পারে।
বড় ছেলে উপার্জন করেন, তাই ছোট ভাইয়ের প্রয়োজন মেটানো তাঁর দায়িত্ব। মেয়ে চাকরি করেন, বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচটা তাই স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ঘাড়ে এসে পড়ে। কোনো বন্ধু বিপদে টাকা ধার দেন, পরেরবারও সবাই তাঁর কাছেই ছুটে যান।
প্রথমবার সাহায্য করার সময় মানুষটি হয়তো আনন্দ পেয়েছিলেন। পরেরবারও দিয়েছেন, কারণ না বলতে পারেননি। একসময় নিজের সংসারের খরচ সামলাতে গিয়ে তাঁকেই হিসাব মেলাতে হয়েছে। অথচ পরিবারের কেউ জিজ্ঞেস করেনি, তাঁর নিজের মাসটা কীভাবে কাটছে।
এমন মানুষ একদিন সাহায্য করতে না পারলে চারপাশের আচরণ বদলে যেতে পারে। এত দিনের অবদান তখন মুহূর্তেই আড়ালে চলে যায়। যেন তাঁর মূল্য ছিল শুধু দেওয়ার ক্ষমতায়।
এখানে প্রশ্নটি শুধু কৃতজ্ঞতার নয়। যে মানুষটি সাহায্য করেন, তাঁকে কি আমরা একজন পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখি, নাকি প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করার মতো নির্ভরযোগ্য একটি আশ্রয় হিসেবে?
ঋণ কোথায় শেষ হয়?
ছোট ভাই চাকরি পাওয়ার পর প্রথম বেতন থেকে বড় ভাইয়ের জন্য একটা শার্ট কিনেছিল। দোকানে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ রং বেছে নিয়েছিল—বড় ভাই কোন রং পছন্দ করেন, সেটা তার মনে ছিল। শার্টটা দেওয়ার দিন বড় ভাই হেসে বলেছিলেন, “এসব কেনার কী দরকার ছিল?”
ছোট ভাইও হেসেছিল। বলতে পারেনি, শার্টটা কেনার সামর্থ্য অর্জন করতে তার কত বছর লেগেছে, আর সেই সামর্থ্যের পেছনে বড় ভাইয়ের কতটা অবদান ছিল।
কিন্তু সেই শার্টের দাম দিয়ে পুরোনো দিনের হিসাব মেটেনি। মেটার কথাও ছিল না। ছোট ভাইয়ের মনে কৃতজ্ঞতা ছিল, বড় ভাইয়ের মনে ছিল অপূর্ণতার বোধ। দুজনের কেউই হয়তো বুঝতে পারেননি, এই দুই অনুভূতি পাশাপাশি থাকতে পারে।
কোনো মানুষ আপনার জন্য অনেক কিছু করেছেন—এই সত্য মেনে নিয়েও তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। আবার নিজের জীবন নিজের মতো করে গড়তে চেয়েও তাঁর অবদান অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই।
কিন্তু সম্পর্কের মধ্যে এই সীমারেখা টানা কঠিন। কারণ, যে মানুষটি একদিন আপনার অভাব পূরণ করেছিলেন, তাঁর সামনে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করতে গিয়েও আপনি বারবার সেই পুরোনো দিনের কাছে ফিরে যান।
বড় ভাইয়ের আলমারিতে হয়তো শার্টটা বহু বছর পড়ে থাকবে। ছোট ভাইয়ের কাছে সেটি ছিল সামর্থ্য দিয়ে কৃতজ্ঞতা জানানোর প্রথম চেষ্টা। অথচ দুজনের কেউই জানতেন না, সেই ছোট্ট উপহারের ভেতরে কত না-বলা কথা জমে ছিল।
কখনো কখনো আমরা উপকারের প্রতিদান দিতে চাই, অথচ যাঁর কাছে দিতে চাই, তাঁর প্রত্যাশা হয়তো প্রতিদান নয়—আমাদের জীবনে নিজের গুরুত্বটুকু হারিয়ে না ফেলা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।