ধিক এই নীরবতা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫
হতভম্ভ! নির্বাক!
এই দুটো শব্দই এখন বুকের ভেতর আছড়ে পড়ছে।
কি হচ্ছে এই দেশে?
কোথায় দাঁড়িয়ে আছি আমরা?
কোন দিকেই বা যাচ্ছি?
হাদি—একজন টগবগে তরুণ, সাহসী, স্পষ্টভাষী।
দেশকে ভালোবাসত বলেই যার কণ্ঠ ছিল তীক্ষ্ণ, চোখে ছিল প্রতিবাদের আগুন।
আজ সেই হাদিকেই আমরা হারাতে বসেছি।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য হলো—এই হারানো কোনো দুর্ঘটনা নয়, কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়।
এটা আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার ফল।
আমি বারবার নিজেকে প্রশ্ন করছি—এই দেশটা কি সত্যিই তার সাহসী সন্তানদের জন্য নিরাপদ?
যে তরুণ অন্যায় দেখলে চুপ থাকে না,
যে সত্য বলার আগে হিসাব করে না,
যে সুবিধাবাদের সঙ্গে আপস করে না—
তার জন্য কি এই রাষ্ট্রের বুকে আদৌ জায়গা আছে?
আমরা দেশপ্রেমের কথা বলতে ভালোবাসি।
পতাকা হাতে ছবি তুলি,স্লোগানে গলা ফাটাই,
অনুভূতিতে ভাসি।
কিন্তু যখন বাস্তব পরীক্ষার সময় আসে,যখন একজন দেশপ্রেমিক তরুণকে বুক দিয়ে আগলে রাখার প্রয়োজন হয়—তখন আমরা কোথায় থাকি?
আমরা তখন নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকি।
নীরব থাকি।
দেখে যাই। আর পরে সামাজিক মাধ্যমে শোক প্রকাশ করি।
ধিক! ধিক এই নীরবতাকে।
ধিক সেই সমাজকে,
যে সমাজ একজন সাহসী তরুণকে একা দাঁড়িয়ে লড়তে দেয়।
ধিক সেই জাতিকে,
যে জাতি জীবিত অবস্থায় কাউকে আগলে রাখতে পারে না, কিন্তু মরার পর তাকে শহীদ বানাতে ভালোবাসে।
হাদি একা নয়।
সে আসলে আমাদের সবার প্রতিচ্ছবি।
আমাদের ভেতরের সেই কণ্ঠ, যেটা অন্যায় দেখলে কথা বলতে চায়, কিন্তু আমরা ভয় পাই।
চাকরি যাবে, নিরাপত্তা যাবে, পরিচয় ঝুঁকিতে পড়বে—এই ভয়ে আমরা চুপ থাকি।
আর সেই চুপ থাকাটাই ধীরে ধীরে কাউকে না কাউকে হাদিতে পরিণত করে।
আজ হাদির জায়গায় সে আছে।
কাল সেই জায়গায় অন্য কেউ।
পরশু হয়তো আপনি,হয়তো আমি।
কারণ যে সমাজ অন্যায়ের সামনে নীরব থাকে,
সেই সমাজে কেউই নিরাপদ নয়।
আমরা প্রশ্ন করি— “সে এত সাহস দেখাতে গেল কেন?”
কিন্তু প্রশ্নটা হওয়া উচিত ছিল—আমরা কেন তার পাশে দাঁড়ালাম না?
একজন টগবগে তরুণকে বুক দিয়ে আগলে রাখার শক্তি কি সত্যিই এই জাতির নেই?
নাকি আমরা ইচ্ছে করেই সেই শক্তি ব্যবহার করতে চাই না?
কারণ সাহস মানে ঝুঁকি,আর ঝুঁকি মানে নিজের স্বাচ্ছন্দ্য ছাড়তে হয়।
এই দেশ কি শুধু সুবিধাভোগীদের জন্য?
নাকি যারা প্রশ্ন তোলে, যারা মাথা নত করে না,
যারা সত্যকে আঁকড়ে ধরে— তাদের জন্যও এখানে জায়গা থাকা উচিত?
আজ হাদিকে হারাতে বসে আমি শুধু শোকাহত নই।
আমি লজ্জিত।
একজন নাগরিক হিসেবে,
একজন মানুষ হিসেবে,এই সমাজের অংশ হিসেবে।
কারণ আমরা আবারও প্রমাণ করলাম—আমরা আবেগ দেখাতে পারি,কিন্তু দায়িত্ব নিতে পারি না।
আমরা প্রতিবাদে হাততালি দিতে পারি,
কিন্তু প্রতিবাদীর পাশে দাঁড়াতে ভয় পাই।
আমরা ভালো মানুষ হতে চাই, কিন্তু সাহসী মানুষ হতে চাই না।
এই দ্বিচারিতাই আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু।
হাদি বেঁচে থাকলে সে আবারও কথা বলত।
আবারও প্রশ্ন তুলত।
আবারও আমাদের অস্বস্তিতে ফেলত।
আর আমরা সেই অস্বস্তি নিতে পারি না বলেই
একজন একজন করে হাদিকে হারিয়ে ফেলি।
আজ ধিক জানাই শুধু জাতিকে নয়—নিজেকেও।
কারণ আমিও সেই ভিড়ের একজন, যে হয়তো সময়মতো যথেষ্ট জোরে চিৎকার করিনি।
যে হয়তো ভাবছিল—“আর কেউ তো বলবেই।”
কিন্তু সবাই যখন এই ভাবনাতেই থাকে,
তখন একজন হাদি একা পড়ে যায়।
আর একা পড়ে গেলে, সাহসীরাও একদিন ভেঙে পড়ে।
এখনও যদি সামান্য লজ্জা বেঁচে থাকে,
তাহলে অন্তত এই প্রশ্নটা নিজেদের করা উচিত—
আমরা আর কত হাদিকে হারালে জেগে উঠব?
আর কত তরুণের রক্ত, কান্না আর নিঃশব্দ পতন আমাদের চোখ খুলবে?
এই লেখা কোনো বিলাপ না। এটা একটা আয়না।
যেখানে আমরা সবাই নিজের মুখ দেখতে পারি—
যদি দেখার সাহস থাকে।
চুপ থাকলেই যদি নিরাপদ থাকা যেত, তাহলে ইতিহাসে কোনো পরিবর্তন আসত না।
এই লেখাটা শেয়ার করুন—হাদির জন্য না হলেও, ভবিষ্যতের হাদিদের জন্য।
#হাদি #দেশপ্রেম #ধিক_এই_নীরবতা #তরুণের_কণ্ঠ #জাতির_লজ্জা #আমরা_কোথায়
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।