বাংলা সাহিত্যে জাতপাতের ছায়া
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। এপ্রিল ০১, ২০২৬
বাংলা সাহিত্যে ‘উঁচু-নিচু’র দেওয়াল এখনো ভাঙেনি — ডালিত সাহিত্য পড়লে চোখ খুলে যাবে!
একটা সময় ছিল যখন বাংলা সাহিত্যে জাতপাতের কথা খুব কমই উঠত। মূলধারার লেখকরা প্রায়ই এই বিষয়টাকে এড়িয়ে যেতেন বা খুব হালকাভাবে ছুঁয়ে যেতেন। কিন্তু ডালিত সাহিত্য এসে সেই দেওয়ালটা ভেঙে দিয়েছে। এখানে অস্পৃশ্যতা আর জাতিগত বৈষম্য শুধু একটা সামাজিক সমস্যা নয়, সেটা পরিবারের ভেতরের প্রতিদিনের যন্ত্রণা হয়ে উঠেছে।
অচিন্ত্য বিশ্বাসের ‘ঘর’ গল্পে দেখি, একটা ডালিত ছেলে শহরে পড়াশোনা করে বাড়ি ফিরে দেখে তার ঘরের জায়গাটা আর নেই। জাতের লোকেরা বলেছে, “উঁচু জায়গায় ডালিতের ঘর হয় না।” শুধু বাইরের সমাজ নয়, নিজের পরিবারের ভেতরেও সে একটা অদৃশ্য দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। বিয়ে, শিক্ষা, চাকরি — সবক্ষেত্রে জাতের ছাপ পড়ে। পরিবারের সদস্যরা নিজেরাই এই বৈষম্যকে বয়ে বেড়ায়, কখনো ভয়ে, কখনো অভ্যাসে।
নকুল মল্লিকের লেখায় এই অস্পৃশ্যতা আরও গভীরভাবে ধরা পড়ে। তাঁর চরিত্ররা যখন শহরে আসে বা গ্রামে থেকে যায়, তখন দেখা যায় জাতপাতের দেওয়ালটা কখনো ভাঙে না, শুধু রূপ বদলায়। একটা ডালিত ছেলে যদি ভালো চাকরি করে, তবু তার বিয়ে হয় না ‘ভালো ঘরে’। পরিবারের মেয়েরা যদি পড়াশোনা করে, তবু তাদের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় জাতের নিয়ম অনুসারে। এই চাপ পরিবারের ভেতরে ঝগড়া, অভিমান আর নীরব যন্ত্রণা তৈরি করে।
আমাদের পাড়ায় সুমন দা ছিলেন। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে শহরে চাকরি করতেন। বাড়ি ফিরতেন শুক্রবারে, মায়ের হাতের বিরিয়ানি খেতেন। একবার বিয়ের কথা ঠিক হলো — মেয়ে অনার্স পড়া, সুমন দা-র মতোই। কিন্তু জাত শুনে মেয়ের বাবা চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলেন। সুমন দা বলেছিলেন, “আমি তো মানুষ।” উত্তর এসেছিল, “আমরা তো সমাজের মানুষ।” সুমন দা আর বিরিয়ানি খান না। মা বলেন, “জাতের জন্য ছেলের ভাত নষ্ট হলো।”
আজকের সমাজে এই সমস্যা কতটা প্রাসঙ্গিক? অনেকে বলেন, জাতপাত এখন আর আগের মতো নেই। কিন্তু বাস্তবে দেখলে ছবিটা অন্যরকম। গ্রামে তো এখনও পানি খাওয়া, মন্দিরে ঢোকা, বিয়ে-শাদি — সবকিছুতে জাতের ছাপ পড়ে। শহরে এটা আরও লুকিয়ে থাকে। চাকরির ইন্টারভিউয়ে নাম শুনে মুখের ভাব বদলে যায়। বিয়ে ঠিক হওয়ার সময় ‘জাত কী?’ প্রশ্নটা এখনও আসে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারেও ছেলে-মেয়ের বিয়ে ঠিক করার সময় জাতের বিষয়টা চুপিচুপি আলোচনা হয়।
সাহিত্যের কাজ হলো আয়না ধরা। ডালিত সাহিত্য সেই আয়নাটা খুব নির্মমভাবে ধরেছে। মূলধারার সাহিত্য যেখানে এই দেওয়ালটাকে এড়িয়ে যেত, সেখানে ডালিত লেখকরা সেটাকে ভেঙে দেখিয়েছেন। আজ যদি আমরা বলি এই সমস্যা আর নেই, তাহলে আমরা সেই আয়নাটাকেই অস্বীকার করছি।
তোমার কাছে জাতপাতের ছায়া মানে কী? একটা নাম যা বলা হয় না, না একটা ভাত যা খাওয়া হয় না?
#জাতপাত #ডালিতসাহিত্য
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।