“আইসিইউতে প্রথম হার্টের সমর্পণ, আর সে সমর্পণ মাঝে খেলে যায় রক্তের মধ্যে এক অনিন্দ আবেশ।
এটা কি মৃত্যুর প্রথম প্রহর?”
একটি হাসপাতালের নির্বাক দেয়াল, নিঃশব্দ অন্ধকারে ঘেরা রাত, কেবল মনিটরের টুংটাং শব্দ। তার মাঝেই যখন হৃদপিণ্ড প্রথমবার নিজের রাজ্য ছেড়ে সমর্পিত হয়, তখন পৃথিবী যেন থমকে দাঁড়ায়। সেই মুহূর্তে শ্বাসের প্রতিটি ওঠানামা, রক্তের প্রতিটি প্রবাহ হয়ে ওঠে এক অনন্ত কাব্য, যার নাম জীবন ও মৃত্যু।
হৃদয়ের প্রথম সমর্পণঃ
হৃদপিণ্ড সারাজীবন একটানা ধকধক করে যায়। কখনো থামে না, কখনো বিশ্রাম নেয় না। কিন্তু যখন প্রথমবার সেটি ক্লান্ত হয়ে পড়ে, যখন ধীরে ধীরে সুর হারাতে শুরু করে—তখন মনে হয় যেন কোনো অর্কেস্ট্রার সুর মাঝপথে ভেঙে পড়ছে।
এ কি শুধু চিকিৎসাশাস্ত্রের ভাষায় কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট? নাকি এটি আসলে মানুষের সবচেয়ে গভীরতম আত্মসমর্পণ—জীবনের কাছে, মৃত্যুর কাছে, কিংবা অজানার কাছে?
রক্তের অনিন্দ আবেশঃ
“রক্তের মধ্যে এক অনিন্দ আবেশ”—এ যেন মৃত্যুর ভয় নয়, বরং এক অদ্ভুত মুগ্ধতা।
বলা হয়, মৃত্যুর মুখোমুখি হলে মানুষ এক ধরণের অচেনা প্রশান্তি অনুভব করে। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন Near Death Experience (NDE)। অনেকেই জানান,
শরীর থেকে আত্মাকে আলাদা হয়ে দেখা,
উজ্জ্বল আলোয় ভেসে ওঠা,
অথবা এক অচেনা টান, যেন ডেকে নিচ্ছে অন্য এক জগতে।
এই আবেশ কি তবে মৃত্যুরই আহ্বান?
নাকি জীবনের শেষ উপহার, এক মায়াবী শান্তি?
মৃত্যুর প্রথম প্রহরঃ
মৃত্যু কখনো হঠাৎ আসে আবার নাও আসতে পারে । এটি ধীরে ধীরে ছায়া ফেলে। প্রথমে শ্বাস ভারী হয়, হৃদয়ের ছন্দ দুর্বল হয়, দৃষ্টির আলো নিভে আসে।
কিন্তু সাহিত্যিক দৃষ্টিতে এই মুহূর্ত কেবল জৈবিক অবসান নয়। এটি সেই সীমানা যেখানে মানুষ দাঁড়িয়ে দেখে—জীবন কত ক্ষণস্থায়ী, অথচ কত মূল্যবান।
এই সময়েই মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করে,
আমি কি যথেষ্ট ভালোবেসেছি?
আমি কি যথেষ্ট সত্য ছিলাম?
আমি কি আমার জীবনকে পূর্ণ করেছি?
হৃদয়ে এক অস্থির ঝড়, এই বাক্য ভেতরে সৃষ্টি করে এক দ্বৈত আবেগ—ভয় এবং মুগ্ধতা। মৃত্যুর ভয় মানুষকে কাঁপিয়ে দেয়, কিন্তু সেই “অনিন্দ আবেশ” তাকে টেনে নিয়ে যায় শান্তির গভীরে। এই দ্বন্দ্বই সাহিত্যের প্রাণ, যা হৃদয়ে এক অস্থির ঝড় জাগিয়ে তোলে।
আইসিইউতে প্রথম হার্টের সমর্পণ কেবল মৃত্যুর সূচনা নয়, এটি মানুষের অস্তিত্বের চূড়ান্ত সত্য। আমরা সবাই সেই প্রথম প্রহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছি—কেউ দ্রুত, কেউ ধীরে।
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়,
যখন সেই প্রথম প্রহর আসবে, তখন কি আমরা ভয়ে কাঁপব?
নাকি আবেশে ভেসে গিয়ে হাসিমুখে বলব—
“আমি বেঁচেছিলাম, আমি ভালোবেসেছিলাম, আমি মানুষ ছিলাম”?
তথ্যসূত্রঃ
Kübler-Ross, E. (1969). On Death and Dying.
Greyson, B. (2003). The Near-Death Experience Scale. Journal of Nervous and Mental Disease.
Parnia, S., et al. (2014). AWARE Study: Awareness during resuscitation. Resuscitation.
বাংলাদেশ জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট – কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বিষয়ক প্রকাশনা।
WHO – Cardiovascular Diseases and Mortality Reports.
#মৃত্যুরপ্রথমপ্রহর #জীবনওমৃত্যু #Heart #ICU #NearDeathExperience #মানবিকতা #LiteraryEssay #MohammadZahidHossain #ExistentialThought
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।