“ঘামের গন্ধে আমার শার্ট”
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ২৩-১১-২০২৫
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি শিল্প—গার্মেন্টস। দেশের অর্থনীতিকে বুক দিয়ে টেনে তোলা সেই শ্রমিকরা যখন ভোরের অন্ধকারে বের হয়, তখন শহর এখনও ঘুমিয়ে থাকে।
কিন্তু তাদের কষ্ট?
তাদের ঘাম?
তাদের অপমান?
এগুলোর কোনোটিই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লাইটবোর্ডে দেখা যায় না।
গার্মেন্টস লাইনে দাঁড়ানো একজন শ্রমিকের জীবন যেন নিয়ম মেনে বেঁচে থাকা নয়—বরং নিয়ম মেনে পুড়ে যাওয়া।
একজন অপারেটরকে প্রতিদিন ৪০০–৫০০ পিস মাল বানাতে দেওয়া হয়। সে যদি ৫০ পিসও কম করে—সাথে সাথেই মুখের ভিতর ঢুকিয়ে দেওয়া হয় আইলা নড়ির মতো অপমানের খোঁচা:
“এখানে কি রূপ দেখাতে আইছোস?”
“কাজ পারস না? কাল থিকা আর আসবি না।”
এই কথাগুলো শোনার পরও সে মেশিনের সামনে ফিরে যায়।
কেন?
কারণ তার ভাড়া দিতে হবে ৪,০০০ টাকা। গ্রামে বাবা-মায়ের ওষুধ ফুরিয়ে গেছে। সন্তানের স্কুলের বেতন বকেয়া।
কাঁদতে কাঁদতে দাঁড়িয়ে থাকলেও মেশিনের সামনে ফিরে যাওয়াই তার ভাগ্য।
২০২৫ সালের ডেটা যেখানে দেখাচ্ছে -বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন বাড়ানো হয়েছে ৳১২,৫০০, সেখানে অনেক কারখানায় শ্রমিকরা এখনও ঠিকমতো পাচ্ছেন না বেসিক বেতন, ওভারটাইম তো দূরের কথা।
শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে—৪–৫ ঘন্টা ওভারটাইম করিয়ে ইচ্ছেমতো ১–২ ঘন্টার টাকা ধরিয়ে দেওয়া এখনো অনেক কারখানার নিয়মিত কৌশল। (সূত্র: Industriall Global Union, ২০২৪–২৫)
প্রবাসী বাজারে রপ্তানি বাড়ছে—এই খবর দিয়ে মালিকরা লাভ না হওয়ার যে কান্না দেখায়, বাস্তবতা তার উল্টো চিত্র দিয়েছে।
২০২৪–২০২৫ আর্থিক হিসেবে সৌদি আরবে রপ্তানি ৭.৩% বৃদ্ধি পেয়েছে, রপ্তানির মোট মূল্য ১.৫২ বিলিয়ন ডলার।
কিন্তু সেই অর্থনৈতিক "উন্নতি" শ্রমিকের ডিনারের টেবিলে পৌঁছায় না—কারণ বৃদ্ধি পায় শুধু প্রফিট, মানুষের মর্যাদা নয়।
আরেকটি কষ্টের জায়গা—সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি।
গার্মেন্টসে কাজ করা মেয়েদের আজও অনেক জায়গায় বাকা চোখে দেখা হয়।
ছেলে পক্ষের একটাই অজুহাত—
“গার্মেন্টস-এ কাজ করা মেয়েকে ঘরে তুললে মান–সম্মান থাকবে না।”
যারা দিন-রাত ঘাম ঝরিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা এনে দেশকে বাঁচিয়ে রাখছে—তাদেরই নাকি সম্মান নেই।
এ কি আমাদের সমাজের পাপ?
নাকি আমাদের সমষ্টিগত ভণ্ডামি?
কোয়ালিটি সেকশনের শ্রমিকদের অবস্থাও কম নিষ্ঠুর নয়।
প্রতি ঘন্টায় ৩০০ পিস প্যান্ট চেক। প্রতি প্যান্ট চেক করার সময় মাত্র ১২ সেকেন্ড— এ সময়ে ৬০টি প্রসেসের প্রতিটি নিশ্চিত করতে হয়, বাটন থেকে ওয়েস্টব্যান্ড পর্যন্ত।
যদি ভুল ধরা পড়ে—শ্রমিককে ডেকে অপমান করা হয়, গায়ের কাজ খেয়ে নেয়ার মতো আচরণ করা হয়। এমন চাপ ও ভয় দেখিয়েই কাজ বের করে আনা হয়।
২০২৫ সালের শুরুর দিকে ঈদের আগে প্রায় ১ লাখ শ্রমিক চাকরি হারানো বা বেতনহীন অবস্থায় পড়েছে — শুধুমাত্র উৎপাদন কমে যাওয়ার অজুহাতে। (সূত্র: Business & Human Rights Resource Centre, ২০২৫)
একদিকে চাকরি নেই — অন্যদিকে চাকরি ছেড়ে হাঁটার সাহস নেই।
ফলে গার্মেন্টস শ্রমিকের জীবন আসলে শ্রম নয়—টিকে থাকার সংগ্রাম।
সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—বাংলাদেশ এখনো বিশ্বের সবচেয়ে শ্রমিক-অনিরাপদ ১০টি দেশের তালিকায়।
(সূত্র: Global Rights Index ২০২৪)
এত কষ্টের পরও মাস শেষে হাতে আসে ১২,৫০০ টাকা বা ওভারটাইমসহ সর্বোচ্চ ১৫–১৬ হাজার টাকা।
মালিকরা বলেন—“লাভ নাই।”
প্রশ্ন হলো—
লাভ নাই তাহলে প্রতি বছর কারখানার সংখ্যা বাড়ছে কেন?
একতলা বাড়ি সাততলায় রূপান্তর হচ্ছে কীভাবে?
গাড়ির ব্র্যান্ড পাল্টাচ্ছে কোথা থেকে?
বস্তুনিষ্ঠ সত্য হলো — শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে।
শ্রমিক মরলে শিল্প টিকবে না।
এখনও সময় আছে—
• শ্রমিককে মানুষ হিসেবে দেখা
• সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া
• ওভারটাইম সঠিকভাবে পরিশোধ করা
• উৎপাদন চাপে অপমান নয়—সহযোগিতা নিশ্চিত করা
• অভিযোগ থাকলে তদন্ত—অপমান নয়
যেদিন শ্রমিক হাসবে, সেদিন গার্মেন্টস সত্যিকারের উন্নয়ন দেখবে। তার আগে পর্যন্ত কোনো লাইটবোর্ডের জিডিপি—মানবিক উন্নয়নকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে না।
বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকরা ভিক্ষা নয়—
সম্মান, নিরাপত্তা এবং ন্যায্য পাওনা দাবি করছে।
এটা তাদের অধিকার—এটা আমাদের সভ্যতার পরীক্ষাও।
#GarmentsWorkers #JusticeForWorkers #BangladeshRMG #WorkersRights #StandWithGarmentsWorkers #RespectLabour #PayFairWage #StopAbuse #VoiceOfWorkers #HumanityFirst #RMGIndustry #LabourExploitation #HardWorkDeservesRespect #DignityForLabour #EqualityForWorkers #SaveWorkersFuture #BangladeshEconomy #গার্মেন্টস_শ্রমিক #শ্রমিকের_মর্যাদা #ন্যায্য_মজুরি #মানবিক_হোন
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।