মধ্যবিত্তদের নীরব কান্না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী কলাম | ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬
শুক্রবার রাত দশটা। মোহাম্মদপুরের সরু গলিতে আলো কমে এসেছে। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলাম, দেখলাম অভিক সাহেব ফিরলেন—হাতে একটি ছোট কেকের বাক্স। স্ত্রী নিশি জিজ্ঞেস করলেন, "কী বিশেষ?"
তিনি বললেন, "অফিসে বিদায় সংবর্ধনা, মেয়েদের জন্য নিয়ে এলাম।" হাসলেন।
আমি জানি—তিনি নিজে খাননি। তার রাতের খাবার ছিল ৩০ টাকার সিগারেট আর হোটেলের ফ্রি পানি।
এই দৃশ্যটাই মধ্যবিত্তের জীবন। নাটক নয়, নীরব কান্না।
মানুষ মানে কী?
যার নিজের মতো বাঁচার অধিকার, স্বপ্ন দেখার সময়, অসুখে বিশ্রামের সুযোগ আছে—তাকে মানুষ বলি। কিন্তু যারা এসব পায় না, তবু সব দায়িত্ব পালন করে, তারা কি মানুষ নয়?
আমি কখনো ভাবিনি, কিন্তু অভিক সাহেবকে দেখে ভাবি—তিনি কি আদৌ নিজের জন্য কিছু করেন, নাকি শুধু অন্যের জন্য বাঁচেন?
মধ্যবিত্ত মানে হিসাব করে বাঁচা। মাসের শুরুতে স্বপ্ন, মাঝখানে উদ্বেগ, শেষে আতঙ্ক। তাদের আয় এতটা কম নয় যে সাহায্য চাইতে পারে, এতটা বেশি নয় যে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে।
একটি অসুখ, একটি চাকরি হারানো—সব ভেঙে দিতে পারে। আমি একবার জ্বরে পড়েছিলাম, তিনদিন অফিসে যাইনি। অভিক সাহেব জিজ্ঞেস করেছিলেন, "বেতন কাটবে?" বুঝলাম, তার চিন্তা আমার চেয়ে বড়।
অভিক সাহেব ২০০৪ থেকে একই কোম্পানিতে চাকরি করছেন। বেতন চারগুণ বেড়েছে, বাজার দর দশগুণ। কাগজে টাকা বাড়ে, হাতে কমে—এই কথাটা অর্থনীতিবিদরা বলেন "আসল আয়ের ক্ষয়"। আমি বলি, মাস শেষে হাত ফাঁকা। একই বাসায় আছেন, ভাড়া ৩০০% বেড়েছে। স্ত্রী নিশির সেলাইয়ের দোকান করার স্বপ্ন ছিল, ২০২৫ সালে মেয়ের কোচিংয়ের টাকায় তা বন্ধ রেখেছেন। এখনো রাতে সেলাই মেশিন চালান, পাড়ার কাপড় ঠিক করে—নিজের জন্য নয়। আমি রাতে শব্দ শুনি, ঘুমাতে পারি না। ভাবি, উনি কি ঘুমাতে পান?
মেয়ে রিমি এবার ভার্সিটিতে ভর্তি হবে। কোচিংয়ে মাসে ৮ হাজার, বাবার বেতন ৪৫ হাজার, বাসা ভাড়া ১৮ হাজার। চিকিৎসা ৮-১০ হাজার, বাজার খরচ, যাতায়াত, বিদ্যুৎ, গ্যাস—বাকি হিসাব করুন। না, আসলে হিসাব করা যায় না।
কারণ হিসাব মেলে না, মেলানোর চেষ্টাই বোকামি। মাস শেষ হওয়ার আগেই আয় শেষ। এটাই মধ্যবিত্তের ট্র্যাজেডি—তারা গরিব নয়, কিন্তু নিরাপদও নয়।
এই গল্প নাটকীয় নয়, তাই কেউ দেখে না। কিন্তু এটাই সবচেয়ে বাস্তব।
মধ্যবিত্তের জীবন ট্রেডমিলের মতো—দৌড়াচ্ছে, কিন্তু সামনে এগোচ্ছে না।
২০১৯ সালের এক জরিপ বলেছিল, ঢাকার মধ্যবিত্তের বেশিরভাগ মাস শেষে ঋণে থাকে। ঠিক সংখ্যা মনে নেই, তবে অনেক—৬০ বা ৭০ শতাংশের মতো।
অভিক সাহেব ২০২০ সালে তিন মাস বেতন পাননি, তখন জানতে পারেন তার সঞ্চয় শূন্য। বরং মাইক্রোফাইন্যান্সে ঋণ, বাইপাস অপারেশনের। কত ছিল?
লাখ দেড়েক?
এখন সেটি বেড়ে দেড় লাখের বেশি। ঠিক জানি না, জানতে চাইও না।
জানলে কী হবে?
ঋণ তো শোধ করতেই হবে।
সমাজ মধ্যবিত্তের কাছে সবচেয়ে বেশি আশা করে—ভদ্র হও, সৎ হও, শিক্ষিত হও, সন্তানকে ভালো মানুষ বানাও। এই সব ঠিক রাখতে গিয়ে তারা নিজের জীবন ভুলে যায়। অভিক সাহেবের বন্ধু কামাল চাকরি হারিয়েছিলেন ২০২৪ সালে, কাউকে বলেননি। তিন মাস অফিসে গেছেন, স্ত্রীকে বলেছেন "বেতন দেরি হচ্ছে"। এখনো ঘুমের ওষুধ খান, কাউকে বলেন না।
কেন? কারণ "ভদ্র মানুষ" কষ্ট প্রকাশ করে না। চাকরি হারানো মানেই শুধু আয়ের ক্ষতি নয়—সামাজিক পরিচয়ের পতন। মর্যাদা হারাতে ভয় পায় তারা। উপরে উঠতে পারে না, নিচে নামতে ভয় পায়। এই ফাঁদে আটকে নীরব থাকে।
আমরা কি মধ্যবিত্তদের "ভদ্র" বলে তাদের প্রতিবাদের অধিকার কেড়ে নিই?
মানসিক চাপ তাদের নিত্যসঙ্গী। কোনো এক গবেষণায় পড়েছিলাম, ঢাকার অনেক মধ্যবিত্ত মানসিক সমস্যায় ভোগে, কিন্তু ডাক্তারের কাছে যায় না।
কেন? চিকিৎসা ব্যয়বহুল, চাকরির অনিশ্চয়তা, আর সামাজিক কলঙ্ক—"মানসিক সমস্যা মানে দুর্বলতা।"
আমি নিজেও একবার ডাক্তারের কাছে যেতে চেয়েছিলাম, ভাড়া দেখে ফিরে এসেছিলাম। সেটা অন্য গল্প, হয়তো পরে লিখব। এই চাপ ধীরে ধীরে ভেতরকে ক্ষয় করে। একদিন গিটার বাজাতেন অভিক সাহেব, এখন সেটি ছাদে ধুলো খায়।
কী গান করতেন? মনে নেই, হয়তো লালন বা হাসন—না, না, হাসন ছিল না, সেটা অন্য কারো কথা। নিশির ডায়েরিতে ২০২৩ সালে লেখা—"মিরপুরে দোকানের জায়গা দেখলাম, অভিক বলেছে পরের বছর শুরু করব।" সেই "পরের বছর" আসেনি।
আসবে কী করে? মেয়ের কোচিং, ঋণের কিস্তি, বাসার ভাড়া—সবই তো "পরের বছর"।
আর "পরের বছর" তো কখনো আসে না, আসে শুধু পরের মাসের বিল।
সমাজ দুই গল্প দেখে—ধনীর বিলাসিতা, দরিদ্রের করুণতা। মধ্যবিত্ত এই দুইয়ের মাঝে হারিয়ে যায়। মিডিয়ায় তাদের গল্প কম, নীতিতে কম, সহানুভূতিতেও কম। কারণ তারা প্রতিবাদ করে না, চুপচাপ সহ্য করে। আমিও তো সহ্য করি, কী করব বলুন?
নীতিনির্ধারকরা কথা বলেন দরিদ্রের কল্যাণে বা ধনীর বিনিয়োগে। মধ্যবিত্তকে ধরে রাখা হয় "স্থিতিশীল শ্রেণি" হিসেবে—যারা বিপ্লব করবে না, শুধু কাজ করবে।
কাজ করবে, করবে, মরেও যাবে, কিন্তু বিপ্লব? সেটা তো সময়ের বিলাসিতা। তাদের জন্য নেই কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা, নেই আয়-সামঞ্জস্যপূর্ণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা। এটা শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়—বড় ছকের এই ব্যাপারে আমরা কিছুই করতে পারি না।
তবু তারা ভেঙে পড়ে না। কারণ আছে দায়িত্ববোধ, শিক্ষার মূল্যবোধ, ভবিষ্যতের আশা—নিজের নয়, সন্তানের। দেশের স্কুল, হাসপাতাল, অফিস—সব জায়গায় তাদের অবদান সবচেয়ে বেশি। তারা সমাজকে চালায়, কিন্তু আলো পায় না। আমি একবার অভিক সাহেবকে বলেছিলাম, "আপনি তো অনেক করেন।" তিনি হেসেছিলেন, সেই হাসি ছিল না, ছিল মুখোশ। আমি চিনতে পারি, কারণ আমারও তাই হয়।
মধ্যবিত্তরা মানুষই নয়—তারা মানুষের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা দেয়। তারা সুখ কম পায়, দায়িত্ব বেশি নেয়। স্বপ্ন কম দেখে, অন্যের স্বপ্ন পূরণ করে। নিজের জীবন ছোট করে, পরিবারের জীবন বড় করে। এই কথাগুলো লিখতে লিখতে ভাবছি, আমি কি নিজেও এই পরীক্ষায় পাস করছি, নাকি ফেল করে বসে আছি? উত্তর জানি না, হয়তো জানতে চাইও না।
গত মাসে অভিক সাহেব অফিস থেকে পুরস্কার পেয়েছেন—"দীর্ঘ ২০ বছরের সেবা"। ৫ হাজার টাকার বোনাসে স্ত্রীর জন্য শাড়ি কিনেছেন। নিশি কাঁদছিলেন।
কেন? কারণ গত ১০ বছরে এটি তার প্রথম নতুন শাড়ি। বাকি গুলো ছিল পাড়ার বিয়েতে পাওয়া "ব্যবহৃত" শাড়ি—যেগুলো দিয়ে তিনি নিজেকে "নতুন" মনে করতেন। আমি জানি, কারণ আমার স্ত্রীরও তাই। এই কান্নাই মধ্যবিত্তের জীবন। এই নীরব কান্নাই সমাজের সবচেয়ে সত্য গল্প।
আর এই গল্পগুলো যদি না বলি, তবে আমরা সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশকেই অদৃশ্য করে দিচ্ছি। আমি লিখছি, কিন্তু জানি না, কে পড়বে। হয়তো আরেক অভিক সাহেব, আরেক রাশেদ—যারা জানে, কান্না নীরব হলেও ব্যথা বাস্তব। অথবা হয়তো কেউ পড়বে না। তবু লিখি, কারণ চুপ থাকলে এই কান্না আরও নীরব হয়ে যাবে।
তারা করুণা চায় না, সম্মান চায়। একটু নিরাপত্তা, একটু স্বস্তি, একটু নিজের মতো বাঁচার সুযোগ। কারণ মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষগুলোই সমাজকে ভারসাম্য দেয়। তারা না থাকলে ধনী আর দরিদ্রের মাঝখানে যে সেতু আছে, সেটা ভেঙে যাবে—নির্মমভাবে। আর সেতু ভাঙলে পড়ে যাবে সবাই, এমনকি যারা ভাবে তারা নিরাপদ।
#নীরবকান্না #মধ্যবিত্তেরসংগ্রাম #শহুরেজীবন #অদৃশ্যশ্রেণী #সমাজব্যবস্থা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।