আমরা সবাই কি ভিতরে ভিতরে রোমান্টিক
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
নিবন্ধ। এপ্রিল ০৩, ২০২৬
আপনি যতই নিজেকে বাস্তববাদী ভাবুন, একটা প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন—আপনার ভেতরে কি কোথাও একটু রোমান্টিক নেই?
রোমান্টিকতা বলতে এখানে প্রেম বোঝাচ্ছি না। বরং বোঝাচ্ছি বাস্তবের ফাঁকফোকরে অর্থ খোঁজার প্রবণতা। এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে জিনিস শুধু “যা আছে” হিসেবে থাকে না—তার সঙ্গে কিছু যোগ হয়, যা পুরোপুরি যুক্তির মধ্যে পড়ে না, কিন্তু অযৌক্তিকও নয়।
এই জায়গাটা খুব সূক্ষ্ম। বাইরে থেকে যে মানুষটিকে হিসেবি, নিয়ন্ত্রিত, প্রায় অনাবেগী মনে হয়—তার ভেতরেও এই প্রবণতা কাজ করে। খুব সাধারণভাবে। কোনো ঘোষণা ছাড়া।
ধরা যাক, একটি গাছ। একজন দেখল—গাছ। অন্যজন একটু থামল। ভাবল, এই জায়গাটার ভেতরে কত সময় জমে আছে, কত মানুষ এসে গেছে, চলে গেছে। এই দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ। এটি কোনো “ভুল” দেখা নয়, বরং একই বাস্তবকে অন্যভাবে পড়া।
সমস্যাটা শুরু হয় অন্য জায়গায়। আমরা এখন প্রায় সবকিছু ফলাফল দিয়ে মাপতে অভ্যস্ত। কার্যকারিতা, প্রমাণ, নিয়ন্ত্রণ—এসবের বাইরে কিছু থাকলে সেটাকে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। ফলে এই অনুভবের জায়গাটা আমরা সরিয়ে রাখি। পুরোপুরি না—বরং আড়ালে।
কিন্তু আড়াল মানেই অনুপস্থিতি নয়।
এই অংশটা অন্যভাবে ফিরে আসে।
কেউ প্রকাশ্যে খুব সংযত। কিন্তু রাতের বেলা একই গান বারবার শোনে।
কেউ সম্পর্কের ক্ষেত্রে খুব হিসেবি। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট মানুষকে ঘিরে সেই হিসেব কাজ করে না।
কেউ বলে—সে অতীতে থাকে না। তবু পুরোনো বার্তা মুছে ফেলতে পারে না।
এই ছোট ভাঙনগুলো আসলে ইঙ্গিত দেয়—মানুষ শুধু যুক্তির কাঠামো না। তার ভেতরে স্মৃতি আছে, অপূর্ণতা আছে, আর সবচেয়ে বড় কথা—অর্থ খোঁজার এক ধরনের তাড়না আছে।
এখানেই একটি পার্থক্য জরুরি। সব কল্পনা রোমান্টিকতা নয়। বাস্তব থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য যে কল্পনা, সেটি ভিন্ন। কিন্তু বাস্তবকে মেনেও তার ভেতরে অতিরিক্ত অর্থ খুঁজে নেওয়া—সেটাই রোমান্টিকতা।
তাহলে কি সবাই রোমান্টিক?
সম্ভবত না। কিন্তু প্রত্যেক মানুষের ভেতরে রোমান্টিক হওয়ার উপাদান থাকে। কেউ সেটাকে স্বীকার করে, কেউ করে না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা “আমরা কী”—এটা নয়।
প্রশ্নটা হলো, আমরা নিজের ভেতরের এই অংশটাকে কতটা জায়গা দিই।
কারণ বাস্তববাদ আমাদের টিকিয়ে রাখে।
কিন্তু রোমান্টিকতাই আমাদের ভেতরে কিছু জাগিয়ে রাখে।
আর সত্যি বলতে—
রাত দুটায় যে গানটা আমরা চুপচাপ রিপিটে শুনি,
সেটাই আমাদের সবচেয়ে নির্ভুল পরিচয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।