শুধুই শূন্যতা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী কলম | মার্চ ০১,২০২৬
সকাল আটটা। গুলশানের ছোট ক্যাফের জানালার ধারে দাঁড়িয়ে, ল্যাপটপ খুলেছি। রোদ খেলার মতো ঢুকে পড়ছে, কিন্তু ফ্ল্যাটের ভিতরে আমার শরীর—ঢাকার বাতাসে, সিডনির দুপুরে। হাতে কফি—হালকা পোড়া, তেতো। ধোঁয়া নাকে লাগে। পাশের টেবিলে মেয়েটি বসে কাগজে লিখছে, কলমের আওয়াজ স্পষ্ট, বয়স আনুমানিক ২৩–২৪, চুল আঁচড়া। কোণায় ছেলে ফোনে কথা বলছে, মাঝে মাঝে হেসে থেমে যাচ্ছে।
“আজ কত?” স্ত্রীর চোখে কৌতূহল, হালকা সবুজ, চোখের নিচে কালো ছায়া। আমি মাথা নাড়ি। কথার অবকাশ নেই। শব্দ আছে, কিন্তু ব্যাখ্যা নেই। সব শব্দ, সব বার্তা—সিডনির মেইলবক্সে, ডেডলাইনে।
ফ্ল্যাশব্যাক। গতকাল বিকেল। আমি ছেলের গাড়ি তুলে দিয়েছিলাম। লাল, প্লাস্টিকের। সে চেয়ে থাকল—“বাবা, এটা কোথায়?” আমার হাত কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল, কোনোটা ভুল হয়ে যাচ্ছে। সে খেলছে, আমি স্ক্রিনে। আমাদের সময় মিললেও সংযোগ নেই।
মেল ওপেন করি। লাল লেবেল—“জরুরি।” বুক ধড়ফড় করছে, হাত অস্থির। মনে হচ্ছিল, হৃদয়টা ধীরে ধীরে পেছনে সরছে। চারপাশে রোদের আলো, রাস্তার হর্ন, কফি মেশিনের আওয়াজ। কিন্তু আমি নেই। শুধু হাত, চোখ, মন—সব স্ক্রিনের মধ্যে আটকা।
“ড্রাফট শেষ করেছ?” ক্লায়েন্ট মেসেজ পাঠাচ্ছে। চোখ নড়ছে, মাথা ব্যথা করছে। দাঁড়ানো জায়গায় হালকা ঘাম। শরীর বলে—এবিষয়টা সহজ নয়। তবে মনের কিছু অংশ এখনও উন্মুক্ত। পাশের মেয়েটির কলম থেমে গেছে। সে হয়তো চিঠি লিখছে, হয়তো কবিতা। আমি জানি না, চোখ বন্ধ করি।
দুপুর। রাস্তায় গাড়ি, মানুষ। তারা একই সময়ে খায়, ঘুমায়। আমি দেখছি, কিন্তু নিজেকে পাই না। ক্যাফের কাঁচে প্রতিফলিত আমার মুখ—অদ্ভুত, ফাঁকা। হাতের ত্বক ঠান্ডা, চোখ অর্ধ খোলা। বুক ধড়ফড় করছে। মনে হচ্ছে, সময় আমার নয়।
ফ্ল্যাশব্যাক। গতকাল রাত। ছেলেকে গোসল করিয়েছি। সে হেসেছে, বলেছে—“বাবা, তুমি আছো।” আমি মৃদু হেসেছি, স্ক্রিনে ডেডলাইন। তার চোখে আনন্দ, আমার চোখে নিঃসঙ্গতা। স্ত্রীর চোখে প্রশ্ন—“আজ কত?”—হলুদ রঙের আলো ছুঁয়ে যাচ্ছে, কালো ছায়া আরও গভীর।
বিকেল। ফ্ল্যাটে ফিরি। ক্লায়েন্ট মেসেজ: “এডিট করা হয়েছে?” বুক কেঁপে ওঠে। ফ্ল্যাটের নিঃশব্দে শুধু টাইপের আওয়াজ। ছেলে পাশে খেলছে, বাবা স্ক্রিনে, মা রান্নাঘরে ব্যস্ত। কথা নেই। সেল ফোন স্ক্রিনে ড্রপডাউন মেনু খোলা। কাজ থেমে নেই, থেমে থাকা মাত্র।
শূন্যতা এখানে। শারীরিকভাবে আছি, মন অন্যত্র। ঘরে বসে বিশ্বজয়, কিন্তু নিজেকে পাই না। পুরনো শ্রমিকরা একসাথে ধর্মঘট করত, অভিযোগ করত। আমি একা। প্রতিযোগী ইন্দোনেশিয়ায়, ক্লায়েন্ট অস্ট্রেলিয়ায়। শ্রম বিক্রি, স্বীকৃতি নেই।
রাত। ল্যাপটপ নিঃশব্দ নয়, নীল আলো জ্বলছে। বুক ধড়ফড় করছে। হাত ঠান্ডা। পিঠ ব্যথা করছে। ঘুম আসে না। ছেলে গভীর নিদ্রায়। স্ত্রীর চোখে সেই প্রশ্ন—“আজ কত?”—আমার উত্তর নেই। সব কথোপকথন, মেসেজ, ডেডলাইন—নিজের জন্য কিছু নেই।
ফ্ল্যাশব্যাক। সকাল। আমি ক্যাফেতে দাঁড়িয়ে। পাশের মেয়েটি কলম ঘোরাচ্ছে। টেবিলের কোণায় পুরনো খবরের কাগজ। রোদ খেলার মতো। শহর বদলায়, দেশ বদলায়, কিন্তু ফাঁকা ঘর, অসম্পূর্ণ সংলাপ, ভাঙা সময়।
চোখ বন্ধ করি। মনে পড়ে—গতকাল, সকালে, বিকেলে, রাতে—মুহূর্তগুলোকে ধরে রাখতে পারিনি। ছেলের গাড়ি, স্ত্রীর চোখ, কফির শেষ ফোঁটা, কলমের শব্দ—সব মিলিয়ে শুধু এক অভাব। অর্ধেক সিডনির জন্য, অর্ধেক ঢাকার জন্য, নিজের জন্য কিছু নেই।
শূন্যতা। একটি স্থান যেখানে আছি, কিন্তু বাস করি না। সময় যা আমাদের, কিন্তু আমাদের নয়। শ্রম বিক্রি হয়, স্বীকৃতি মেলে না। চোখ খুললে নতুন সকাল, “জরুরি” মেইল, আবার রোদ, আবার কুয়াশা। কিন্তু ভেতরে—শুধুই শূন্যতা।
#শুধুইশূন্যতা #অর্ধেকঢাকা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।