খোলা দরজার কারাগার
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সকালে রান্নাঘর থেকে পেঁয়াজ ভাজার গন্ধ আসে। উঠানে কাপড় শুকায়। পাশের ঘরে টেলিভিশনে খবর চলে। কারও ঘুম ভাঙে মসজিদের আজানে, কারও আবার প্রেসার কুকারের বাঁশিতে।
বাড়িটাকে বাইরে থেকে দেখলে একেবারে স্বাভাবিক মনে হয়। একসঙ্গে অনেক মানুষ। একই রান্নাঘর। একই উঠান। ঈদের সকালে এক টেবিলে বসে খাওয়া। অসুখ হলে সবাই ছুটে আসে। বিপদে একজন আরেকজনের পাশে দাঁড়ায়।
তবু সেই বাড়ির ভেতরেই কেউ কেউ দিনের পর দিন এমনভাবে বেঁচে থাকে, যেন নিজের জীবনের চাবিটা অন্য কারও হাতে। কারাগারের দরজা সেখানে লোহার নয়। দরজাটা খোলা থাকে। শুধু বেরিয়ে যাওয়ার সাহসটা থাকে না।
যৌথ পরিবার নিজে কোনো সমস্যা নয়। বরং ভালো একটি যৌথ পরিবার মানুষের জন্য আশ্রয় হতে পারে। বয়স্ক বাবা-মা একা থাকেন না, শিশুরা একাধিক মানুষের স্নেহ পায়, বিপদের দিনে একজন আরেকজনকে ধরে রাখে। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন একসঙ্গে থাকা ধীরে ধীরে একে অন্যের জীবনের ওপর অধিকার হয়ে দাঁড়ায়।
আর সেই অধিকারের সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি অনেক সময় ভালোবাসা নয়—অর্থনৈতিক ক্ষমতা।
বাড়ির দলিল কার কাছে?
বিদ্যুতের বিল কার নামে?
বাজারের টাকা কে দেন?
কার আয় দিয়ে মাসের শেষে চাল-ডাল কেনা হয়?
কে সিদ্ধান্ত নেন, কোন ঘরটা কার হবে?
কে বলতে পারেন, “এই বাড়ি ছেড়ে কোথায় যাবে?”
প্রশ্নগুলো শুনতে খুব সাধারণ। কিন্তু একটি পরিবারের ভেতরের ক্ষমতার মানচিত্র অনেক সময় এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই লুকিয়ে থাকে। যার হাতে বাড়ির কাগজ, তার কথার ওজন একটু বেশি। যে সংসারের বেশির ভাগ খরচ চালায়, তার আপত্তির দামও বেশি। আর যে মানুষটি নিজের আয় থাকা সত্ত্বেও পরিবারের কাছে অর্থনৈতিকভাবে দায়বদ্ধ, তার নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গাটাও ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসে।
একটা ছেলের কথা ধরা যাক। বয়স ত্রিশের ওপরে। চাকরি করে। বিয়ে করেছে। স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা একটা ছোট বাসায় থাকতে চায়। খুব বড় কিছু নয়—দুজনের জন্য দুটো ঘর, একটা বারান্দা, সন্ধ্যায় দরজা বন্ধ করে নিজেদের মতো করে বসা।
কিন্তু সে কথাটা বাবাকে বলতে পারে না।
কারণ সে জানে, কথাটা উঠলেই কেউ হয়তো বলবে না, “যেও না।” তার বদলে বলা হবে, “তোর ইচ্ছা হলে যেতে পারিস। কিন্তু তোর মা?”
পরদিন সকালে নাশতার টেবিলে ছেলের প্লেটে ডিম তুলে দিয়ে মা হয়তো শুধু বলবেন, “তোর জন্যই তো এত কিছু করেছি।”
কেউ তাকে আটকে রাখল না। কেউ দরজায় তালা দিল না। কেউ বলল না, “এই বাড়ি থেকে বের হতে পারবে না।” তবু ছেলেটা সেদিনও গেল না।
কারণ কখনো কখনো মানুষকে আটকে রাখার জন্য শিকল লাগে না। একজন মায়ের নীরবতা, একজন বাবার দীর্ঘশ্বাস, কিংবা পরিবারের বহু বছরের ত্যাগের হিসাবই যথেষ্ট।
এই জায়গাটাতেই যৌথ পরিবারের সবচেয়ে সূক্ষ্ম ক্ষমতাটা কাজ করে। আপনি যদি আলাদা হতে চান, আপনাকে স্বার্থপর বলা হবে। নিজের মতো করে বাঁচতে চাইলে বলা হবে, “সংসার করতে শেখোনি।” নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করতে চাইলে মনে করিয়ে দেওয়া হবে, “এই বাড়িতে সবাই সবার।”
কিন্তু “সবাই সবার”—এই কথাটার ভেতরেই একটা বিপজ্জনক প্রশ্ন লুকিয়ে থাকে।
তাহলে আমি কোথায়?
বিশেষ করে একজন বউয়ের ক্ষেত্রে প্রশ্নটা আরও কঠিন। তার নিজের ঘর আছে, কিন্তু দরজায় কড়া নাড়ার নিয়ম নেই। তার নিজের আয় আছে, কিন্তু মাসের শেষে সেই টাকা কোথায় যাবে, সে সিদ্ধান্ত সবসময় তার নয়।
সে রান্না করে, কাপড় ধোয়, অসুস্থ শ্বশুর-শাশুড়ির ওষুধ মনে রাখে, সন্তানকে স্কুলে পাঠায়। অথচ দিনের শেষে কেউ তাকে জিজ্ঞেস করে না—আজ তুমি কেমন আছ?
তার ক্লান্তির কোনো হিসাব থাকে না।
কারণ যৌথ পরিবারে দায়িত্ব অনেক সময় ভাগ হয়, কিন্তু কর্তৃত্ব সমানভাবে ভাগ হয় না। একই ছাদের নিচে থাকা আর একই অধিকার নিয়ে থাকা—দুটো এক জিনিস নয়।
আর এখানেই প্রজন্মের ফারাকটা এসে ধাক্কা খায়। যে বাবা সারাজীবন ভেবেছেন, সন্তান মানেই পাশে থাকবে, তাঁর কাছে আলাদা থাকা হয়তো দূরে সরে যাওয়া। যে সন্তান নিজের সংসার, নিজের সময়, নিজের গোপনীয়তাকে স্বাভাবিক অধিকার মনে করে, তার কাছে একই বাড়িতে থেকেও প্রতিটি সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে থাকা অসহ্য।
দুজনের কেউই হয়তো খারাপ মানুষ নয়। সমস্যাটা তৈরি হয় যখন ভালোবাসা আর অধিকারের সীমারেখাটা মুছে যায়।
তখন ঘর আশ্রয় থাকে না।
ঘর হয়ে ওঠে এমন এক জায়গা, যেখানে আপনি থাকতে পারেন—কিন্তু নিজের মতো থাকতে পারেন না।
সবচেয়ে ভয়ংকর শিকলটা অবশ্য শেষ পর্যন্ত বাইরে থাকে না। ভেতরে তৈরি হয়।
একদিন মানুষ নিজেই নিজের ইচ্ছাকে থামিয়ে দেয়। কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে যায়। কোথাও যেতে চেয়েও ভাবে, “এতে মা কষ্ট পাবেন।” নিজের জন্য কিছু কিনতে গিয়েও ভাবে, “এ টাকাটা বাড়িতে দিলে ভালো হতো।”
তারপর একসময় সে আর বুঝতে পারে না—সে কি সত্যিই থাকতে চায়, নাকি শুধু চলে গেলে সবাই কষ্ট পাবে বলে থেকে গেছে।
সেখানেই খোলা দরজার কারাগার সবচেয়ে শক্ত হয়ে যায়।
কারণ লোহার দরজা ভাঙতে মানুষ সাহস পায়। কিন্তু নিজের ভেতরে তৈরি হওয়া অপরাধবোধের দেয়াল ভাঙা অনেক কঠিন।
একটি পরিবার মানুষের মাথার ওপর ছাদ দিতে পারে। আবার সেই ছাদের নিচেই তার আকাশটুকুও ছোট করে দিতে পারে।
পরিবারের অর্থ একসঙ্গে থাকা নয়। পরিবারের অর্থ এমন একটি জায়গা, যেখান থেকে মানুষ প্রয়োজন হলে বেরিয়ে যেতে পারে—তবু ফিরে আসার পথটা খোলা থাকে।
যে ঘরে থাকার জন্য ভালোবাসা লাগে না, শুধু ভয় লাগে—সেটা যত বড়ই হোক, সেখানে কোথাও না কোথাও একটি কারাগার তৈরি হয়ে গেছে।
আর সেই কারাগারের সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো—দরজাটা খোলাই ছিল। শুধু মানুষটি বেরোতে পারেনি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।